আন্দোলন ও বিদেশি অপারেটর বিতর্কে চট্টগ্রাম বন্দরে অস্থিরতার এক বছর

দ্বৈপায়ন বড়ুয়া
দ্বৈপায়ন বড়ুয়া
28 December 2025, 05:43 AM
UPDATED 28 December 2025, 15:54 PM

দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান ভরকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর বছরজুড়েই ছিল অস্থিরতার মধ্যে। নানা ইস্যুতে আন্দোলন, শুল্কবৃদ্ধি এবং বড় টার্মিনালের কার্যক্রম বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে দেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দরটি বারবার উঠে এসেছে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে।

দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশের বেশি যে বন্দরের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, শ্রমিক অসন্তোষ ও সংবেদনশীল সংস্কার সিদ্ধান্ত মিলিয়ে সারা বছরই চাপের মধ্যে কেটেছে সময়। ফলে স্বাভাবিক বাণিজ্য কার্যক্রম নির্বিঘ্নে পরিচালনার সুযোগ খুব একটা পাওয়া যায়নি।

তবু চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্দরে ৩৩ লাখ ৬৪ হাজার একক কনটেইনার ওঠানামা করেছে, যা গত বছরের ৩২ লাখ ২৭ হাজার এককের তুলনায় ২ দশমিক ৬৮ শতাংশ বেশি।

একই সময়ে কনটেইনারসহ মোট কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে ১৩ কোটি ৬৩ লাখ টন, যা আগের বছরের সর্বোচ্চ রেকর্ড ১২ কোটি ৪০ লাখ টনকে ছাড়িয়ে গেছে। ২৭ ডিসেম্বর সকাল পর্যন্ত এ হিসাব পাওয়া যায়।

এ ছাড়া চলতি বছর এখন পর্যন্ত বন্দরে নোঙর করেছে ৪ হাজার ৩৯৬টি জাহাজ, যেখানে ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৮৬৭টি।

বছরের শুরুতেই বিঘ্ন

চট্টগ্রাম বন্দরে বছরের শুরুটা ছিল টানাপোড়েনের মধ্যে। ফেব্রুয়ারির শুরুতে বন্দর নগরীর ডিসি পার্ক এলাকায় কনটেইনারবাহী প্রাইম মুভার চালক ও সহকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের জেরে বন্দর ও ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোর মধ্যে কনটেইনার পরিবহন ব্যাহত হয়। কয়েক দিন ধরে পণ্য চলাচল বন্ধ থাকায় শেষ ধাপের লজিস্টিক ব্যবস্থার ভঙ্গুর চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই মার্চে সিপিএ বন্দরে পড়ে থাকা কনটেইনারের স্টোরেজ চার্জ চার গুণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

কাস্টমস এজেন্ট ও আমদানিকারকেরা তখনই সতর্ক করেন, এই সিদ্ধান্ত জট কমানোর বদলে লজিস্টিক ব্যয় বাড়াবে এবং বন্দরের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।

বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে এসে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এপ্রিল ও মে মাসে রাজস্ব প্রশাসন পুনর্গঠন সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশের প্রতিবাদে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তাদের দেশব্যাপী ধর্মঘটে বন্দরের কাস্টমস কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে চলা এই আন্দোলনে পণ্য খালাস মারাত্মকভাবে ধীর হয়ে যায়, জাহাজগুলোকে নোঙরে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় এবং ইয়ার্ডের ধারণক্ষমতা সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছে যায়। মে মাসের শেষ দিকে ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হলেও বন্দরের জট কাটতে বেশ সময় লাগে; স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে হিমশিম খেতে হয় কর্তৃপক্ষকে।

বিদেশি অপারেটর নিয়োগ বিতর্ক

এনবিআরের আন্দোলনের মধ্যেই নতুন করে উত্তেজনা ছড়ায় বিদেশি অপারেটর নিয়োগের ইস্যুতে। চট্টগ্রাম বন্দরে বিএনপির শ্রমিক সংগঠন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের ইউনিট নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি অপারেটরের কাছে ইজারা দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি শুরু করে।

জুনের মধ্যে এই বিরোধ আরও সংগঠিত রূপ নেয়। ১৫ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি ইজারা দেওয়ার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ছয় দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল, বন্দরের সবচেয়ে বড় টার্মিনাল বিদেশিদের হাতে তুলে দিলে কৌশলগত একটি জাতীয় সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হবে এবং শ্রমিকদের চাকরি ঝুঁকিতে পড়বে।

এই ইস্যু দ্রুত জাতীয় বিতর্কে পরিণত হয় এবং নিয়মিত শিরোনামে উঠে আসে। এর মধ্যেই বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বারবার ব্যাহত হতে থাকে।

এই বিরোধের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল এর আদর্শিক বিস্তৃতি। বামপন্থী দল থেকে শুরু করে ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী শক্তি—ভিন্ন রাজনৈতিক ধারার দলগুলোও বিদেশি অপারেটর নিয়োগের বিরোধিতায় একই সুরে কথা বলে। সার্বভৌমত্ব, স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন সামনে আনা হয়।

সরকার ও বন্দর কর্তৃপক্ষ অবশ্য ভিন্ন অবস্থান নেয়। তাদের যুক্তি ছিল, অভিজ্ঞ বৈশ্বিক অপারেটরদের সম্পৃক্ত করা ছাড়া বন্দরের আধুনিকায়ন, জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম কমানো এবং ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যের চাপ সামাল দেওয়া কঠিন।

তারা ভারত, শ্রীলঙ্কা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বন্দরের সঙ্গে প্রতিযোগিতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে সতর্ক করেন—দ্রুত সংস্কার না হলে চট্টগ্রাম বন্দর আঞ্চলিক প্রতিযোগীদের কাছে কার্গো হারাতে পারে।

জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরজুড়ে এই ইস্যুতে রাজনৈতিক অস্বস্তি বজায় থাকে। বিএনপি ও জামায়াতের নেতারা প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলেন, একটি অন্তর্বর্তী সরকারের কৌশলগত অবকাঠামো নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করার সাংবিধানিক বা নৈতিক ম্যান্ডেট আছে কি না।

উচ্চ শুল্ক, টার্মিনাল চুক্তি ও প্রতিবাদ

অক্টোবর ছিল পুরো বছরের সবচেয়ে অস্থির সময়। মাসের মাঝামাঝি সিপিএ প্রায় চার দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো বন্দরের শুল্ক কাঠামোয় বড় ধরনের সংশোধনের ঘোষণা দেয়। কনটেইনার হ্যান্ডলিং ও স্টোরেজ সংক্রান্ত বিভিন্ন খাতে গড়ে প্রায় ৪১ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বাড়ানো হয়।

এতে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। তাদের মতে, বাড়তি এই ব্যয় রপ্তানিযোগ্য পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমাবে, বিশেষ করে বৈশ্বিক চাহিদার চাপে থাকা তৈরি পোশাক খাতের জন্য এটি বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াবে।

শুল্কবৃদ্ধির অংশ হিসেবে ভারী যানবাহনের গেট পাস ফি ৫৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৩০ টাকা করা হয়, যা চার গুণেরও বেশি। এর প্রতিবাদে ১৫ অক্টোবর থেকে চট্টগ্রাম প্রাইম মুভার মালিক সমিতি কনটেইনার পরিবহন বন্ধ করে দেয়। এতে ডেলিভারি প্রায় ৪৫ শতাংশ কমে যায় এবং বন্দরে দ্রুত জট সৃষ্টি হয়।

বছরের শেষ দিকে এসে সরকার আরও দৃঢ় অবস্থান নেয়। নভেম্বরের মাঝামাঝি ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস এবং সুইজারল্যান্ডভিত্তিক মেডলগ এসএর সঙ্গে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনা এবং পানগাঁও ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

এর পরপরই চট্টগ্রামে শুরু হয় রাজপথের আন্দোলন। মিছিল, অনশন ও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে বিদেশি অপারেটরের সঙ্গে চুক্তি বাতিল এবং শুল্কবৃদ্ধি প্রত্যাহারের দাবি ওঠে।

আইনি লড়াইও গড়ায় আদালতে। ৯ নভেম্বর হাইকোর্ট এক মাসের জন্য শুল্কবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত স্থগিত করেন, যা বন্দর ব্যবহারকারীদের জন্য সাময়িক স্বস্তি এনে দেয়। পরে নভেম্বরে একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনালের বিদেশি অপারেটরের সঙ্গে চুক্তি সংক্রান্ত সব কার্যক্রম স্থগিতের নির্দেশ দেন আদালত।

তবে এনসিটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিতই থেকে যায়। ৪ ডিসেম্বর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এই চুক্তি চ্যালেঞ্জ করা রিটে ভিন্নমত জানিয়ে রায় দেন। ফলে বিষয়টি প্রধান বিচারপতির কাছে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকে। এটি কার্যত নিশ্চিত করে—চট্টগ্রাম বন্দরের এই বিতর্ক ২০২৬ সালেও গড়াবে।