উগ্রবাদ নিয়ে প্রতিবেদন করতে হবে, তবে মহিমান্বিত বা বিমানবিকীকরণ নয়: ডন সম্পাদক

ঢাকায় দ্য ডেইলি স্টারের অনুষ্ঠানে জাফর আব্বাস বলেন, ‘জনস্বার্থই সবার আগে’।
স্টার অনলাইন রিপোর্ট

পাকিস্তানের সংবাদপত্র ডন-এর সম্পাদক জাফর আব্বাস বলেছেন, সাংবাদিকদের উচিত জনসাধারণকে তথ্য জানানো এবং সরকার পছন্দ করুক বা না করুক, জনস্বার্থে প্রতিবেদন করে যাওয়া।

বৃহস্পতিবার ঢাকায় দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে আয়োজিত ‘জার্নালিস্টস অ্যাট আ ক্রসরোডস: কনভারসেশন উইথ জাফর আব্বাস’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল্যবোধ খুবই স্পষ্ট। যদি কোনো কিছু গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে যায়, আমরা তার বিরোধিতা করব। বেসামরিক সরকার হোক কিংবা সামরিক সরকার, যদি তারা মানবাধিকার কর্মীদের বিরুদ্ধে যায়, আমরা বিরোধিতা করব।’

তিনি বলেন, ‘জাতীয় স্বার্থ নিয়ে সরকারের ভাষ্য ও আমাদের উপলব্ধির মধ্যে বিরোধ তৈরি হলে আমরা জনস্বার্থকে প্রাধান্য দেবো এবং জনস্বার্থের পক্ষেই থাকব।’

জাফর বলেন, সাংবাদিকদের এ ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী থাকতে হবে যে তাদের লক্ষ্য হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা এবং সমাজ, সরকার ও কর্তৃপক্ষের কোনো সমস্যা থাকলে, সেটা মানুষকে জানানো।

তিনি বলেন, ‘যখন আমরা উদারনৈতিক মূল্যবোধের কথা বলি, তখন ধর্মবিরোধী কোনো কিছুর কথা বলি না। আমরা বোঝাতে চাই যে একটি সভ্য সমাজ কেমন হওয়া উচিত।’

জাফর বলেন, ডন প্রকাশ্যেই নারীদের সমঅধিকার ও নারীর অধিকার নিশ্চিতে ইতিবাচক উদ্যোগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং অন্যান্য মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রেও তাদের অবস্থান একই।

তিনি বলেন, ‘মানুষের অধিকার কেড়ে নিলে আমরা তার বিরুদ্ধে অবশ্যই লিখব।’

উগ্রবাদ ও চরমপন্থা নিয়ে সংবাদ পরিবেশনের প্রসঙ্গে জাফর বলেন, সাংবাদিকতায় ভুল হতেই পারে। তবে সংবাদপত্রকে সেই ভুল স্বীকার করতে হবে, সংশোধন করতে হবে এবং সামনে এগিয়ে যেতে হবে।

উগ্রবাদ নিয়ে সংবাদ প্রকাশে মহিমান্বিত করা নয়, বিমানবিকীকরণও নয়: ডন সম্পাদক
ছবি: পলাশ খান/স্টার

তিনি বলেন, সাংবাদিকদের সহিংসতা, সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে যেতে হবে। কিন্তু, সন্ত্রাসবাদ বা জঙ্গিগোষ্ঠীকে মহিমান্বিত করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আমাদের সহকর্মীদের যেটা বোঝানোর চেষ্টা করেছি তা হলো, সহিংসতা, সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদের ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে যান। কিন্তু, খেয়াল রাখতে হবে যেন আমরা সন্ত্রাসবাদ বা জঙ্গিগোষ্ঠীকে মহিমান্বিত না করি। একইসঙ্গে উগ্রবাদের অভিযোগে অভিযুক্তদের বিমানবিকীকরণ থেকেও বিরত থাকতে হবে।’

পাকিস্তানে সামরিক শাসনের ইতিহাস কীভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে প্রভাবিত করেছে, সে বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে জাফর বলেন, সামরিক শাসন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ‘একসঙ্গে চলে না’।

তিনি বলেন, ‘যখন সামরিক শাসন থাকে, তখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা কীভাবে বলা যায়?’

তিনি বলেন, সামরিক শাসনের সময় ‘সম্পূর্ণ সেন্সরশিপ’ ছিল এবং মানুষের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।

তার মতে, সামরিক বাহিনী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে রয়েছে।

জাফর বলেন, বছরের পর বছর ধরে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম চলেছে। এই সংগ্রামে সাংবাদিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর নিশ্চিতভাবেই কিছু অর্জন রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন অর্ডার বাতিল, যা ১৯৬০-এর দশকে আইয়ুব খান প্রবর্তিত ‘দমনমূলক আইন’।

সম্পাদকীয় স্বাধীনতার প্রসঙ্গে ২০১০ সাল থেকে ডন-এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জাফর বলেন, সম্পাদকীয় বিষয়ে সাধারণত ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ‘হস্তক্ষেপ থাকে শূন্য’।

তিনি বলেন, কোনো প্রতিবেদন প্রকাশের পর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা করতে পারে বা দ্বিমত পোষণ করতে পারে। কিন্তু, প্রতিবেদন প্রকাশের আগে সেটা করা যাবে না।

ডন-এর ওপর চাপের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গত কয়েক দশক ধরেই এ ধরনের চাপ ছিল এবং মূলত জনস্বার্থভিত্তিক সাংবাদিকতার নীতি অনুসরণ করার কারণেই সেটা অব্যাহত রয়েছে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে জাফরকে স্বাগত জানান দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম। এ সময় তিনি ডনকে ‘আলোর দিশারি’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

তিনি বলেন, পাকিস্তানের মতো দেশ, গণতন্ত্র যে দেশের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য না, সেখানে স্বাধীন সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠা করা সত্যিই অসাধারণ কাজ।

তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ও অন্যান্য স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী জাফর ও ডনের ওপর কতটা চাপ প্রয়োগ করে, সেটা তিনি জানেন।

অনুষ্ঠানে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।