উচ্চশিক্ষায় নেতৃত্ব নির্বাচন, নাকি আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্ব
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনিক প্রভাব, একাডেমিক সংকট ও শাসন কাঠামোর দুর্বলতার মধ্যে দিয়ে এগোচ্ছে। এ বাস্তবতায় উপাচার্য নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও কাঠামোবদ্ধ করার লক্ষ্যে সরকার যে ছয় সদস্যবিশিষ্ট সার্চ কমিটি পুনর্গঠন করেছে, তা আপাত দৃষ্টিতে ইতিবাচক উদ্যোগ বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই কমিটি আসলে একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ক্রমশ আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে।
অথচ বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক নয়। এটি শিক্ষার স্বায়ত্তশাসন, মান ও বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
পরিপত্রে উল্লেখিত সার্চ কমিটিতে সরকার কর্তৃক পদোন্নতিপ্রাপ্ত একজন সচিবকে সভাপতি করে সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত ইউজিসি সদস্য, রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্য ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত অধ্যাপকদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই কাঠামোতে প্রশাসনিক প্রতিনিধিত্বই প্রধান হয়ে উঠেছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের ওপর হস্তক্ষেপ ও সরাসরি সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখা যেতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় কোনো সাধারণ সরকারি দপ্তর নয়। এটি জ্ঞানচর্চার স্বাধীন ক্ষেত্র, যেখানে নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে একাডেমিক যোগ্যতা, গবেষণায় অবদান ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের বিষয়গুলোই প্রধান বিবেচ্য হওয়া উচিত। সেখানে একজন আমলাকে প্রধান করে সার্চ কমিটি গঠন কার্যত প্রশাসনিক কর্তৃত্বকে একাডেমিক মূল্যবোধের ওপর প্রাধান্য দেওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।
এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি দীর্ঘদিনের নীতিগত প্রবণতার ধারাবাহিকতা, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও পেশাগত স্বাতন্ত্র্য ক্রমাগতভাবে সংকুচিত হয়েছে।
এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ হলো জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫। এই বেতন কাঠামো প্রণয়নের সময় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অবস্থান কার্যত নিম্নমুখী করা হয়। একসময় অধ্যাপকরা সচিবদের সমমানের মর্যাদা ভোগ করলেও, নতুন স্কেলে সেই সমতা ভেঙে যায়। এর ফলে প্রশাসনিক ক্যাডার ও একাডেমিক পেশার মধ্যে স্পষ্ট স্তরবিন্যাস তৈরি হয়, যা শুধু আর্থিক বৈষম্যই নয়, বরং প্রতীকী মর্যাদারও অবমূল্যায়ন নির্দেশ করে।
একই ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় সার্বজনীন পেনশন স্কিম চালুর সময়। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বিদ্যমান পেনশন ব্যবস্থাকে উপেক্ষা করে তাদের একটি একক কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়। এটি ছিল নীতিগতভাবে ‘একীভূতকরণ’-এর প্রচেষ্টা। কিন্তু বাস্তবে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বতন্ত্র সেবার শর্তকে অস্বীকার করার শামিল।
শিক্ষকরা যুক্তি দেন, তাদের পেশাগত বৈশিষ্ট্য, গবেষণার অনিশ্চয়তা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে একটি পৃথক কাঠামো প্রয়োজন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেখানে প্রাধান্য পায় তাদের প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গি।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো প্রবর্তনের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অনীহা। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা বহু বছর ধরে আলাদা পে-স্কেলের দাবি জানিয়ে আসছেন, যা তাদের গবেষণা ও মেধা ধরে রাখার জন্য অপরিহার্য। কিন্তু এই দাবি বারবার প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর আপত্তির কারণে এটি বাস্তবায়নে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। ফলে একাডেমিক পেশাকে স্বতন্ত্র ক্ষেত্র হিসেবে না দেখে, বরং সাধারণ সরকারি চাকরির সম্প্রসারণ হিসেবে দেখার প্রবণতা আরও জোরদার হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে উপাচার্য নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠনকে একটি বৃহত্তর ‘কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ’ কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ মতামত—যেমন: সিনেট, একাডেমিক কাউন্সিল বা শিক্ষক-সমাজের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ—এখানে অনুপস্থিত। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়াটি এক ধরনের টপ-ডাউন মডেলে রূপ নিচ্ছে। এখানে সিদ্ধান্ত কেন্দ্র থেকে আরোপিত হয়, কিন্তু তার দায়ভার বহন করতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়কেই।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে এই ধরনের আমলাতান্ত্রিক প্রভাবের আরও কিছু দৃষ্টান্ত রয়েছে। বাজেট অনুমোদন, নতুন বিভাগ খোলা, শিক্ষক নিয়োগের মতো ক্ষেত্রেও প্রায়ই কেন্দ্রীয় অনুমোদনের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ধীর হয়ে পড়ে এবং তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সবচেয়ে বড় কথা, এতে এক ধরনের ‘নির্ভরশীলতা সংস্কৃতি’ তৈরি হয়, যা স্বায়ত্তশাসনের পরিপন্থী।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে: বিশ্ববিদ্যালয় কি রাষ্ট্রের একটি প্রশাসনিক ইউনিট, নাকি স্বায়ত্তশাসিত বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠান?
যদি প্রথমটি সত্য হয়, তাহলে এই ধরনের সার্চ কমিটি যৌক্তিক। কিন্তু যদি দ্বিতীয়টি সত্য হয়—যা আধুনিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি—তাহলে এই কাঠামো পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।
সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হতে পারে যে, একটি প্রাতিষ্ঠানিক সার্চ কমিটি রাজনৈতিক প্রভাব কমাতে সাহায্য করবে এবং নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যদি সেই কমিটির গঠনই প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং এর কার্যক্রম স্বচ্ছ না হয়, তবে এটি নতুন ধরনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে।
স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও অংশগ্রহণ—এই তিনটি উপাদান ছাড়া কোনো সার্চ কমিটিই গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারে না। উপাচার্য নির্বাচনে গবেষণা, প্রকাশনা, একাডেমিক নেতৃত্ব, আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এ ক্ষেত্রে ইউজিসির বর্তমান চেয়ারম্যান বা অবসরপ্রাপ্ত কোনো সফল উপাচার্য বা একাডেমিক ব্যক্তিত্বই এই সূচকগুলো বিচার করতে বেশি সক্ষম, যা একটি মানসম্পন্ন উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন নিশ্চিত করতে সহায়ক।
অতএব, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কিছু মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন।
প্রথমত, সার্চ কমিটি গঠনে একাডেমিক প্রতিনিধিত্বকে প্রাধান্য দিয়ে সভাপতি পদে একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদকে অথবা ইউজিসি চেয়ারম্যানকে পদাধিকার বলে নিয়োগ করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সার্চ কমিটির সদস্য হিসেবে থাকা উপাচার্যরা কোনো আমলা বা সচিবের অধীনে কাজ করে যেমন সম্মানিত বোধ করবেন না, তেমনি এই কমিটিতে থেকে সমমর্যাদার উপাচার্য নিয়োগে কাউকে সুপারিশ করলে ওই সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকের জন্যও বিষয়টি সম্মানজনক হতে পারে না। তাই উপাচার্যদের পরিবর্তে দুজন জ্যেষ্ঠ, দক্ষ ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদকে এ কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। অন্যথায় শিক্ষামন্ত্রীকে প্রধান করে ৭৩ অধ্যাদেশে যে চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, সেই চারজন উপাচার্যকে এ কমিটিতে সদস্য হিসেবে রেখে সার্চ কমিটি পুনর্গঠন করা সমীচীন হতে পারে।
তৃতীয়ত, উপাচার্য নির্বাচন ও মূল্যায়নের মানদণ্ড জনসম্মুখে প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যেতে পারে, যাতে এই প্রক্রিয়াটি সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক হয়।
চতুর্থত, ইউজিসির তত্ত্বাবধানে একটি গুগল ফর্ম তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে উপাচার্য পদে আগ্রহী শিক্ষকরা সার্চ কমিটির নির্ধারিত মানদণ্ড বজায় রেখে এবং প্রয়োজনীয় নথি জমা দিয়ে আবেদন করতে পারেন।
সবশেষে বলা যায়, উপাচার্য নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠন নিজেই কোনো সমস্যার সমাধান নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর কাঠামোর অংশ। সেই কাঠামো যদি আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণকে শক্তিশালী করে এবং একাডেমিক স্বাধীনতাকে দুর্বল করে, তাহলে এর ফলাফল দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকরই হবে।
এখন সময় এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়কে তার প্রাপ্য মর্যাদা ও স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়ার। অন্যথায় জ্ঞানচর্চার এই প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল প্রশাসনিক যন্ত্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
অধ্যাপক ড. মাহতাব উ. আহাম্মদ, গণিত বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়