হামের পুনরুত্থান: প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর দায় কার?

মো. তরিকুল ইসলাম
মো. তরিকুল ইসলাম

বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব নতুন নয়। তবে সম্প্রতি এর পুনরুত্থান গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছিলেন, টিকাদান কার্যক্রমে সামান্য শৈথিল্য এলেই হাম দ্রুত ফিরে আসতে পারে। এখন সেই আশঙ্কাই বাস্তবে পরিণত হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে দেশে হামের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়া এই সংক্রমণে ইতোমধ্যে চার শতাধিক শিশুর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়েছে।

বাস্তবতা হলো, এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ, গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকায় অনেক ক্ষেত্রেই সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় ও রিপোর্টিং হয় না।

হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। তবে এর বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ বহুদিন ধরেই আমাদের হাতে রয়েছে। সেটা হলো টিকা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, হাম প্রতিরোধে কমপক্ষে ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে না পারলে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি হয় না। বাংলাদেশ একসময় এই লক্ষ্য অর্জনে প্রশংসনীয় সাফল্য দেখালেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা যায়নি।

এই ব্যর্থতার পেছনে কয়েকটি কারণ স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়।

প্রথমত, টিকাদান কর্মসূচিতে কভারেজের ঘাটতি। কোভিড-১৯ মহামারির সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়, যার প্রভাব এখনও পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। অনেক শিশু সময়মতো টিকা পায়নি। ফলে একটি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, জনসচেতনতার অভাব ও ভ্রান্ত ধারণা। কিছু এলাকায় টিকা নিয়ে ভুল তথ্য ও অনীহা এখনও বড় বাধা। স্বাস্থ্যকর্মীরা নিয়মিত প্রচার চালালেও তা সব স্তরে কার্যকরভাবে পৌঁছাচ্ছে না।

তৃতীয়ত, সাম্প্রতিক সময়ে হামের পরীক্ষার কিট সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সময়মতো রোগ শনাক্ত করা না গেলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে যায়। এটি শুধু একটি সরবরাহ সংকট নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতারও ইঙ্গিত দেয়।

চতুর্থত, মাঠপর্যায়ে নজরদারি ও দ্রুত প্রতিক্রিয়ার ঘাটতি। সংক্রমণের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দেওয়ার পরই যদি কার্যকরভাবে কন্টেইনমেন্ট ব্যবস্থা নেওয়া যেত, তাহলে পরিস্থিতি এতটা বিস্তার লাভ করত না।

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই মৃত্যুগুলো কতটা প্রতিরোধযোগ্য ছিল?

উত্তরটি অস্বস্তিকর হলেও স্পষ্ট, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল। টিকার আওতা নিশ্চিত করা গেলে এবং সময়মতো রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা দেওয়া গেলে এত বড় ক্ষতি এড়ানো যেত।

এখানেই আসে জবাবদিহির বিষয়টি।

জনস্বাস্থ্য একটি সমন্বিত দায়িত্ব। সরকার, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ জনগণ, সবারই এখানে ভূমিকা রয়েছে। তবে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব যাদের ওপর ন্যস্ত, তাদের দায় অবশ্যই বেশি।

টিকা সরবরাহে ঘাটতি, পরীক্ষার কিটের সংকট এবং কার্যকর মনিটরিংয়ের অভাবসহ এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

শুধু দায় নির্ধারণ করাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কারও।

প্রথমত, জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। যেসব শিশু টিকার বাইরে রয়েছে, তাদের দ্রুত শনাক্ত করে কভারেজের আওতায় আনতে হবে।

দ্বিতীয়ত, পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে দ্রুত রোগ শনাক্ত করা যায়।

তৃতীয়ত, মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ ও সম্পদ বাড়াতে হবে, যাতে তারা দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে পারেন।

চতুর্থত, জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সমন্বিত ও ধারাবাহিক প্রচার চালাতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, এই সংকটকে সাময়িক ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একটি সতর্কবার্তা, যেকোনো সময় প্রতিরোধযোগ্য রোগ আবারও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, যদি আমরা দায়িত্ব পালনে সামান্যতমও ব্যর্থ হই।

বাংলাদেশ অতীতে টিকাদান কর্মসূচিতে যে সাফল্য দেখিয়েছে, তা প্রমাণ করে যে সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন থাকলে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। এখন প্রয়োজন সেই সক্ষমতাকে আবার সক্রিয় করা এবং প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

কারণ, একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, এটি জাতির ব্যর্থতা।

মো. তরিকুল ইসলাম: লেখক, কলামিস্ট, শিক্ষা পরামর্শক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
mtislam.ca@gmail.com