ব্রাজিল না আর্জেন্টিনা? এই উন্মাদনা বাংলাদেশের জন্য কেন ভালো
বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশ যেন দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এক ভাগ ব্রাজিল, আরেক ভাগ আর্জেন্টিনা। রাস্তায় রাস্তায় পতাকা উড়ে, ছাদে ছাদে ব্যানার টাঙানো হয়, ফেসবুকে তর্ক শুরু হয়, অফিসে খোঁচাখুঁচি চলে, বন্ধুদের আড্ডায় হাসি ঠাট্টা জমে ওঠে। কেউ মেসির ছবি দিয়ে প্রোফাইল সাজান, কেউ আবার নেইমার বা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের পোস্টারে ভরিয়ে ফেলেন নিজের টাইমলাইন।
অনেকেই এই বিষয়টিকে গুরুত্বহীন মনে করেন। কেউ কেউ আবার বিরক্তও হন। তাদের প্রশ্ন, বাংলাদেশের সঙ্গে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার সম্পর্ক কী? এত আবেগ কেন? এত সময় নষ্ট কেন?
কিন্তু বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখারও সুযোগ আছে। বরং বলা যায়, এই উন্মাদনা বাংলাদেশের মতো একটি সমাজের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই ইতিবাচক।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন প্রতিদিনের খবরের বড় অংশজুড়ে থাকে হতাশা, সহিংসতা আর উদ্বেগ। সংবাদ খুললেই কোথাও খুন, কোথাও ধর্ষণ, কোথাও দুর্নীতি, কোথাও প্রতারণা। শিশু থেকে বৃদ্ধ, কেউই যেন অনিরাপত্তার অনুভূতি থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও একই অবস্থা। রাজনৈতিক বিভাজন, ঘৃণা, ব্যক্তিগত আক্রমণ আর নেতিবাচকতা প্রায় প্রতিদিনের ঘটনা।
এই বাস্তবতায় মানুষ একটু আনন্দ খুঁজবে না?
ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার সমর্থকদের এই বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা সেই আনন্দেরই একটি জায়গা। এখানে মানুষ নিজের পছন্দের দলকে নিয়ে গর্ব করে, প্রতিপক্ষকে খোঁচা দেয়, আবার ম্যাচ শেষে একসঙ্গেই চা খায়। এই খোঁচাখুঁচির বেশিরভাগটাই বিনোদন। এর ভেতরে রাজনৈতিক শত্রুতা নেই, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ নেই, ক্ষমতার লড়াই নেই।
বাংলাদেশের মানুষ খেলাধুলা ভালোবাসে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে আমাদের জাতীয় দলের উপস্থিতি নেই। তাই বিশ্বকাপ বা কোপা আমেরিকা এলে মানুষ নিজেদের আবেগের জন্য একটি দল বেছে নেয়। কেউ ব্রাজিল, কেউ আর্জেন্টিনা। তারপর সেই দলকে ঘিরেই তৈরি হয় গল্প, স্মৃতি, হাসি আর উত্তেজনা।
একবার ভেবে দেখুন, একটি দেশের লাখ লাখ মানুষ একই সময়ে একটি খেলা নিয়ে কথা বলছে। রিকশাচালক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, দোকানদার থেকে করপোরেট কর্মকর্তা, গ্রামের চায়ের দোকান থেকে রাজধানীর কফিশপ, সবাই একই আলোচনায় যুক্ত হচ্ছে। সমাজে এমন মিলনমেলার সুযোগ আর কত জায়গায় তৈরি হয়?
অনেক সময় বলা হয়, অনলাইনে ঝগড়া হচ্ছে। কিন্তু সব ঝগড়া এক রকম নয়। ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনাকে ঘিরে যে তর্ক হয়, তার বড় অংশই রসিকতা আর ঠাট্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। ‘তোমাদের কাপ কয়টা?’ কিংবা ‘তোমাদের শেষ ট্রফি কবে?’ এ-জাতীয় কথাগুলো শুনে মানুষ রাগের চেয়ে বেশি হাসে। পরদিন আবার সেই দুই পক্ষ একসঙ্গে ক্লাসে যায়, অফিসে কাজ করে, আড্ডা দেয়।
বরং এই ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক ক্ষেত্রে মানুষের মানসিক চাপ কমাতেও ভূমিকা রাখে। একজন মানুষ সারা দিন চাকরির চাপ, ব্যবসার চিন্তা, পারিবারিক দায়িত্ব বা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন। সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে বসে ফুটবল নিয়ে একটু হাসাহাসি করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মজার একটি পোস্ট দেওয়া বা প্রতিপক্ষকে হালকা খোঁচা দেওয়া তার জন্য এক ধরনের মানসিক মুক্তি।
আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, মানুষের জীবনে বিনোদনের প্রয়োজন কতটা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু কাজ, দায়িত্ব আর উদ্বেগ দিয়ে একটি সমাজ সুস্থ থাকতে পারে না। মানুষের হাসারও দরকার আছে। আনন্দ করারও দরকার আছে। এমন কিছু বিষয় দরকার, যা নিয়ে তর্ক হবে কিন্তু সম্পর্ক নষ্ট হবে না।
ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার সমর্থকদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেকটা পাড়ার দুই বন্ধুর দাবা খেলার মতো। একজন জিতলে আরেকজনকে খোঁচা দেবে। আবার পরদিন দুজন একসঙ্গেই বসে চা খাবে। এই সংস্কৃতির ভেতরে এক ধরনের সামাজিক উষ্ণতা আছে।
অবশ্যই সীমা থাকা জরুরি। খেলা নিয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ, অপমান বা সহিংসতা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে পুরো সংস্কৃতিকে বিচার করাও ঠিক হবে না। কারণ বাস্তবে দেখা যায়, বাংলাদেশের বেশিরভাগ ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থকই এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আনন্দের অংশ হিসেবেই দেখেন।
আসলে বিষয়টি পতাকা বা দলের চেয়েও বড়। এটি মানুষের একসঙ্গে আনন্দ করার ক্ষমতার প্রতিফলন। এমন একটি দেশে, যেখানে প্রতিদিনের বাস্তবতা প্রায়ই ক্লান্তিকর, সেখানে এক মাসের জন্য হলেও যদি মানুষ ফুটবল নিয়ে উত্তেজিত হয়, বন্ধুদের সঙ্গে তর্ক করে, বাড়ির ছাদে পতাকা ওড়ায়, রাতে খেলা দেখে এবং কিছুক্ষণ দৈনন্দিন উদ্বেগ ভুলে থাকতে পারে, তাহলে সেটিকে খারাপ চোখে দেখার কারণ নেই।
সব বিনোদন যে অর্থ উপার্জন করবে, সমাজ বদলে দেবে বা বড় কোনো উদ্দেশ্য পূরণ করবে, এমন নয়। কিছু বিনোদনের কাজ শুধু মানুষকে হাসানো। ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনাকে ঘিরে বাংলাদেশের উন্মাদনাও অনেকটা তেমন।
যে দেশে প্রতিদিন অসংখ্য নেতিবাচক খবর আমাদের মনকে ভারী করে তোলে, সেখানে ফুটবল নিয়ে এই নির্মল উন্মাদনা হয়তো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষ এখনো হাসতে পারে, মজা করতে পারে, বন্ধুত্বপূর্ণভাবে তর্ক করতে পারে। আর সেটাও কম গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়।
কখনো কখনো একটি দেশের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য বড় কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ নয়, বরং ছাদের ওপর উড়তে থাকা একটি ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার পতাকা, যার নিচে দাঁড়িয়ে কয়েকজন বন্ধু প্রাণ খুলে হাসছে। সেই হাসির মূল্যও কম নয়।
লেখক: মো. আব্বাস বর্তমানে কাজ করছেন কর্পোরেট কমিউনিকেশনে। ইমেল: abdulla180395@gmail.com