ব্যাটারিচালিত রিকশার দৌরাত্ম্য: নগর শৃঙ্খলায় বড় চ্যালেঞ্জ
ঢাকার সড়ক ব্যবস্থা বহুদিন ধরেই যানজট, অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাহীনতার এক জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে চলছে। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ যোগ হচ্ছে নগর পরিবহনে। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে অন্যতম হয়ে উঠেছে ব্যাটারিচালিত রিকশা।
একসময় অলিগলি ও আবাসিক এলাকার পরিবহন হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে ব্যাটারিচালিত রিকশা রাজধানীর প্রায় প্রতিটি সড়কে দাপটের সঙ্গে চলাচল করছে। প্রধান সড়ক, গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়ক, এমনকি বিভিন্ন ভিআইপি সড়কেও এসব যানবাহনের উপস্থিতি এখন নিয়মিত দৃশ্য।
কাগজে-কলমে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল নতুন কোনো বিতর্কের বিষয় নয়। ২০১৫ সালে সরকারের এক সিদ্ধান্তে ঢাকার প্রধান সড়ক এবং দেশের ২৩টি মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সময়ে হাইকোর্টও এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা ও নিয়ন্ত্রণমূলক নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
আদালতের নির্দেশনা ও সরকারি সিদ্ধান্ত থাকা সত্ত্বেও রাজধানীর সড়ক এবং বিভিন্ন মহাসড়কে এসব যানবাহনের অবাধ চলাচল বন্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। ফলে সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—যে আইন বাস্তবে প্রয়োগই করা যায় না, সেই আইন থাকার অর্থ কী?
ব্যাটারিচালিত রিকশা নিঃসন্দেহে নগরবাসীর জন্য একটি সহজলভ্য ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী পরিবহন ব্যবস্থা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে এটি লাখো মানুষের জীবিকার উৎস। কিন্তু একটি পরিবহন ব্যবস্থা তখনই গ্রহণযোগ্য হয়, যখন তা জননিরাপত্তা, ট্রাফিক শৃঙ্খলা এবং নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। দুঃখজনকভাবে রাজধানীতে চলাচলকারী অধিকাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশার ক্ষেত্রে সেই সামঞ্জস্য আজ অনুপস্থিত।
কিন্তু এই সমস্যার মূল জায়গা হলো নিয়ন্ত্রণহীনতা। বর্তমানে রাজধানীতে চলাচলকারী অধিকাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশার কোনো সুনির্দিষ্ট নিবন্ধন নেই, চালকদের অধিকাংশের নেই প্রশিক্ষণ, আর যানবাহনের নিরাপত্তা মান নিয়েও রয়েছে বড় ধরনের প্রশ্ন।
এসব রিকশা সাধারণত স্থানীয়ভাবে তৈরি হয় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আধুনিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করা হয় না। ব্রেকিং সিস্টেম দুর্বল, কাঠামোগত স্থায়িত্ব সীমিত এবং গতি নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা অনুপস্থিত।
অথচ অনেক চালক এসব যানবাহন উচ্চগতিতে চালান, যা যাত্রী ও পথচারী উভয়ের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ব্যাটারিচালিত রিকশার কারণে প্রতিনিয়ত বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা, প্রাণহানি ও আহত হওয়ার সংখ্যা।
আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো রাজধানীর যানজট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল।
শুধু অলিগলি নয়, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড়, বাজার এলাকা ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রের সামনেও সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় এসব যানবাহন। অনেক ক্ষেত্রে রাস্তার একটি বড় অংশ কার্যত দখল করে রাখায় সড়কের কার্যকর প্রস্থ কমে যায় এবং যান চলাচলের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
এর পাশাপাশি যাত্রী ওঠানামার জন্য হঠাৎ থেমে যাওয়া, মোড়ের কাছে যত্রতত্র অবস্থান নেওয়া এবং অনিয়ন্ত্রিত পার্কিংয়ের কারণে অন্যান্য যানবাহনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়। ফলে যানবাহনের দীর্ঘ সারি সৃষ্টি হয়ে যানজট আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
প্রতিদিন কোটি মানুষের চলাচলের এ নগরীতে সড়ক ব্যবস্থাপনা ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন বাস্তবতায় রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে ব্যাটারিচালিত রিকশার অবাধ চলাচল নগর পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও অকার্যকর ও বিশৃঙ্খল করে তুলছে।
বিষয়টির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিদ্যুৎ ব্যবহার। বিভিন্ন গবেষণা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যয় হচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জ দেওয়ার কাজে।
উদ্বেগজনক হলো, এই চার্জিংয়ের বড় একটি অংশ অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে জাতীয় গ্রিডের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। বিদ্যুৎ চুরি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, বিশেষ করে যখন দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে।
তবে বাস্তবতা হলো, শুধু নিষেধাজ্ঞা জারি করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কারণ ব্যাটারিচালিত রিকশার সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান। তাই প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও বাস্তবসম্মত নীতি।
প্রধান সড়কে এসব যানবাহনের চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ করতে হবে এবং নিবন্ধন ও ফিটনেস ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে চালকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে এবং অবৈধ চার্জিং স্টেশনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
কিন্তু ব্যাটারিচালিত রিকশার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে সেটা হিতে বিপরীত হচ্ছে । সম্প্রতি কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার নিমসার বাজার এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা জব্দকে কেন্দ্র করে হাইওয়ে পুলিশ ও স্থানীয়দের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশের গাড়ি ভাঙচুরের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয়।
ঘটনাটি শুধু বিচ্ছিন্ন কোনো উদাহরণ নয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার সময় প্রায়ই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বাধার মুখে পড়তে হয়।
সম্প্রতি রাজধানী থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা অপসারণের বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) একার পক্ষে কার্যকর সমাধান সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, এ সমস্যা মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত ও যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন।
গত মঙ্গলবার (৩০ জুন) রাজধানীর মোহাম্মদপুরের লেক রোডে এআই ক্যামেরার মাধ্যমে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের মামলা দায়ের ও যানবাহন মনিটরিং কার্যক্রমের উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন।
ডিএমপি কমিশনার জানান, ব্যাটারিচালিত রিকশার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। তবে কেবল পুলিশের একক প্রচেষ্টায় এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ চলমান রয়েছে।
ফলে অনেক ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সংঘাত ও জনদুর্ভোগ এড়ানোর স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এই সুযোগে এক শ্রেণির ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশা চালকের মধ্যে আইন অমান্যের প্রবণতা বাড়ছে এবং তাদের দৌরাত্ম্য ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।
কার্যকর ও ধারাবাহিক আইন প্রয়োগের অভাবে সড়কে এসব যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি সড়ক নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
বিশ্বের বড় বড় শহরগুলোতে পরিবহন ব্যবস্থার শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে কঠোর নীতি অনুসরণ করা হয়। ঢাকার ক্ষেত্রেও সময় এসেছে বাস্তবসম্মত, কিন্তু দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেওয়ার। নগরবাসীর নিরাপত্তা, সড়কের শৃঙ্খলা এবং টেকসই নগর ব্যবস্থাপনার স্বার্থে রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি।
ঢাকার সড়ক কারও একক সম্পত্তি নয়; এটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। তাই নগর পরিবহন ব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ করতে হলে জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই।
ঢাকাকে যদি সত্যিকার অর্থে বাসযোগ্য, নিরাপদ ও গতিশীল নগরীতে পরিণত করতে হয়, তাহলে এখনই সাহসী ও দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জনস্বার্থ, সড়ক নিরাপত্তা এবং নগর শৃঙ্খলার স্বার্থে রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশার নিয়ন্ত্রণহীন চলাচল বন্ধ করা আজ আর কোনো বিকল্প নয়; এটি সময়ের অপরিহার্য দাবি।
হুমায়ুন আহমেদ বিলাস, বর্তমানে করপোরেট কমিউনিকেশনস ও পাবলিক রিলেশন্স নিয়ে কাজ করছেন।