বিশ্বকাপের ৩৪ দিন বাকি

কিংবদন্তিদের সারিতে: জাবুলানি বলের জাদুকর ফোরলান

সাব্বির হোসেন
সাব্বির হোসেন

থিয়েরি অঁরি, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, কাকা, লিওনেল মেসি, ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো কিংবা ওয়েইন রুনি— ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের আগে গোল্ডেন বল জেতার সম্ভাব্য দাবিদারদের তালিকায় এমন অনেক বড় তারকারই নাম ছিল। তাদের ভিড়ে উরুগুয়ের একজন অভিজ্ঞ স্ট্রাইকারের নাম ছিল আলোচনার একেবারে বাইরে। অথচ সোনালী চুলের সেই দিয়েগো ফোরলানই অবাধ্য জাবুলানি বলকে পোষ মানিয়ে আফ্রিকা মহাদেশের মাটিতে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতে নেন। গোল আর অ্যাসিস্টের পসরা মেলে ধরে, জাদুকরী পারফরম্যান্স দেখিয়ে তিনি পৌঁছে যান কিংবদন্তিদের কাতারে।

এই অভাবনীয় অর্জনের মাধ্যমে ফোরলান নিজের নাম লেখান ফিফা বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে অভিজাত এক তালিকায়। দীর্ঘ ৪০ বছর পর উরুগুয়েকে সেমিফাইনালে তোলার সুবাদে গোল্ডেন বল জিতে ইতালির পাওলো রসি (১৯৮২) ও সালভাতোরে স্কিলাচি (১৯৯০), আর্জেন্টিনার দিয়েগো ম্যারাডোনা (১৯৮৬), ব্রাজিলের রোমারিও (১৯৯৪) ও রোনালদো (১৯৯৮), জার্মানির অলিভার কান (২০০২) ও ফ্রান্সের জিনেদিন জিদানের (২০০৬) পাশে বসে পড়েন তিনি। ধারাবাহিক নৈপুণ্য দেখিয়ে সাত ম্যাচে তার পা থেকে এসেছিল পাঁচটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট।

স্প্যানিশ লা লিগায় ভিয়ারিয়াল ও অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদের হয়ে একবার করে ইউরোপের শীর্ষ গোলদাতা হিসেবে গোল্ডেন শু জেতা ফোরলান বিশ্বকাপে এসেছিলেন ক্লাব পর্যায়ের দুর্দান্ত ফর্ম নিয়ে। দক্ষিণ আফ্রিকায় পা রাখার ঠিক আগেই উয়েফা ইউরোপা লিগের ফাইনালে ইংলিশ ক্লাব ফুলহ্যামের বিপক্ষে জোড়া গোল করেছিলেন তিনি। তার কাঁধে চড়ে অ্যাতলেতিকো ১৯৬২ সালের পর প্রথম, অর্থাৎ দীর্ঘ ৪৮ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে স্বাদ পায় কোনো ইউরোপিয়ান শিরোপার।

শুধু ক্লাব পর্যায়ে নয়, জাতীয় দলের জার্সিতেও ফোরলান ছিলেন সমানভাবে ছন্দে। দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে সাতটি গোল করেছিলেন। ৩১ বছর বয়সী এই তারকার লক্ষ্য ছিল ২৩ বছরের দুই তরুণ লুইস সুয়ারেজ ও এদিনসন কাভানিকে নিয়ে উরুগুয়ের ভাগ্য বদলানোর। কারণ, ১৯৯০ বিশ্বকাপে দানিয়েল ফনসেকার হেডে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে পাওয়া ১-০ গোলের জয়ের পর ২০ বছর ধরে বিশ্বকাপে জয়হীন ছিল দলটি।

২০১০ সালের ওই বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষের চেয়েও যেন সবার কাছে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম ছিল অ্যাডিডাসের তৈরি জাবুলানি বল। এর অস্বাভাবিক গঠন— বিশেষ করে, আগের যেকোনো বলের চেয়ে কম (মাত্র আটটি) প্যানেল দিয়ে তৈরি হওয়ায় বাতাসে বাধা পাওয়ার ক্ষমতা ছিল অনেক কম। ফলে বলটি ঠিকমতো গতি কমানোর বদলে শেষ মুহূর্তে অবিশ্বাস্যভাবে দিক পরিবর্তন করত। এই অদ্ভুতুড়ে আচরণের কারণে ইতালির গোলরক্ষক বুফন একে বলেছিলেন 'পুরোপুরি অনুপযুক্ত', আর ব্রাজিলের স্ট্রাইকার লুইস ফাবিয়ানোর চোখে তা ছিল 'ভীষণ অদ্ভুত'।

নামীদামী তারকারা যখন বলটির অদ্ভুত আচরণের সমালোচনায় মুখর, ফোরলান তখন নিভৃতে একে বশে আনার উপায় খুঁজছিলেন। বিশ্বকাপ শুরুর তিন মাস আগেই অ্যাডিডাসের কাছ থেকে বল চেয়ে নিয়েছিলেন তিনি। অনুশীলনের পর যখন সবাই বাড়ি ফিরত, তিনি তখন একা মাঠে পড়ে থাকতেন এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় দিয়ে জাবুলানির গতি-প্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করতেন।

ফোরলানের দূরদর্শী প্রস্তুতিতে পাওয়া সফলতার প্রথম ঝলকে পুড়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। গ্রুপ পর্বের ম্যাচটিতে ৩০ গজ দূর থেকে তিনি যখন শট নেন, বাতাসে বলের অদ্ভুত দিক পরিবর্তনের কারণে স্বাগতিকদের গোলরক্ষকের দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিল না। তার বুলেট গতির শটটি জালে জড়ালে গ্যালারিতে কান-ফাটানো ভুভুজেলার শব্দ মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়। পাশাপাশি জাবুলানির ওপর এই স্ট্রাইকারের অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ দেখে বিস্মিত ও মুগ্ধ হয় ফুটবল বিশ্ব।

সেই ম্যাচে জোড়া গোল করেছিলেন ফোরলান, দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিল উরুগুয়ে। ফ্রান্সের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ে আসর শুরু করা সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা (১৯৩০ ও ১৯৫০) গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে হারায় মেক্সিকোকে। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে নক-আউটে পৌঁছে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ১-০ গোলে জিতে তারা নাম লেখায় শেষ আটে।

ঘানার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালটি সুয়ারেজের সেই কুখ্যাত হ্যান্ডবলের কারণে বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকলেও উরুগুয়ের জয়ে ফোরলানের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। পিছিয়ে পড়া দলকে একক নৈপুণ্যে টেনে তোলেন তিনি। দ্বিতীয়ার্ধের দশম মিনিটে ডি-বক্সের বাঁ দিক থেকে নেওয়া তার নিখুঁত বাঁকানো ফ্রি-কিকটি ঘানার জালে জড়ালে ফেরে সমতা। একইসঙ্গে গোলটি ম্যাচের মোমেন্টাম ঘুরিয়ে দিয়ে উরুগুয়েকে এনে দিয়েছিল টাইব্রেকারে জেতার আত্মবিশ্বাস। রোমাঞ্চ, উত্তেজনা ও বিতর্কে ঠাসা ওই লড়াইয়ে উতরে গিয়ে ১৯৭০ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের টিকিট কেটেছিল উরুগুয়ে।

সেসময় অনেক ষড়যন্ত্র তত্ত্বও ডালপালা মেলেছিল। কেউ কেউ বলেছিল, ফোরলানের কাছে বলের বিষয়ে গোপন তথ্য আছে। এসব গুঞ্জন উড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি, 'এখানে কোনো রহস্য নেই— প্রচুর অনুশীলন, অনেক ঘাম ঝরানো এবং আরও প্রচুর অনুশীলন। আমি ভাগ্যবান ছিলাম এবং জাবুলানিও ভালো আচরণ করেছিল। আমাদের মধ্যে দারুণ সখ্যতা গড়ে উঠেছিল!'

উরুগুয়ে দলের ভেতরেও সেবার ছিল এক শান্ত অথচ দৃঢ় আত্মবিশ্বাস, যদিও খুব বেশি মানুষ তাদেরকে নিয়ে বাজি ধরার পক্ষে ছিল না। রূপকথার যাত্রার নেপথ্যের কথা জানাতে গিয়ে ফোরলান যোগ করেছিলেন, 'আমরা সব সময় নিজেদের ওপর বিশ্বাস রাখতাম। প্রথম দিন থেকেই আমরা বলেছিলাম যে, আমাদের ধাপে ধাপে এগোতে হবে। ফ্রান্সের বিপক্ষে (বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে) ড্র করাটা আমাদের দারুণ আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল এবং আমরা সেখান থেকেই ভিত্তি গড়েছিলাম।'

সেমিফাইনালে নেদারল্যান্ডসের মুখোমুখি হয় উরুগুয়ে, ফোরলান ফের জ্বলে ওঠেন। প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার ঠিক আগে অপেক্ষাকৃত দুর্বল বাঁ পা দিয়ে করা তার দূরপাল্লার চোখ ধাঁধানো গোলটি বুঝিয়ে দিয়েছিল, বলের ওপর টুর্নামেন্টে তার চেয়ে ভালো নিয়ন্ত্রণ আর কারও ছিল না। যদিও অস্কার তাবারেজের শিষ্যরা শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি ৩-২ গোলে হেরে যায়।

জার্মানির বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচেও ঠিক ব্যবধানে হারে উরুগুয়ে, যদিও ফোরলান জাবুলানির ওপর তার আধিপত্য ঠিকই বজায় রাখেন। অ্যাক্রোবেটিক ভলিতে বলকে মাটিতে ড্রপ খাইয়ে জার্মান গোলরক্ষক হান্স-ইয়র্গ বাটকে বোকা বানিয়ে তিনি নজরকাড়া আরেকটি গোল করেন— আসরে তার পঞ্চম। টুর্নামেন্টের সেরা গোলের খেতাবও জিতে নেয় সেটি।

রানার্সআপ হওয়া নেদারল্যান্ডসের ওয়েসলি স্নাইডার (২১.৮%) এবং চ্যাম্পিয়ন হওয়া স্পেনের দাভিদ ভিয়াকে (১৬.৯%) পেছনে ফেলে ২৩.৪% ভোট পেয়ে ফোরলান জিতে নেন গোল্ডেন বল। স্কিলাচির পর তিনিই প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র খেলোয়াড় যিনি ফাইনালে না খেলেও এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার জেতেন। টুর্নামেন্টজুড়ে তার নিঃস্বার্থ পরিশ্রম, ফিনিশিংয়ের দুর্দান্ত দক্ষতা এবং জাবুলানির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কই তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে এবং সম্মাননাটি এনে দেয়।

ফোরলান স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, 'বিশ্বকাপে ব্যক্তিগত পুরস্কার জেতা কখনোই আমার লক্ষ্য ছিল না। কারণ আমি গিয়েছিলাম দেশের জন্য সেরাটা দিতে। তবে গোল্ডেন বল জেতা এমন এক অনুভূতি, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এটি আমাদের পুরো দলের এবং উরুগুইয়ান ফুটবলের সাফল্যেরই পুরস্কার। যেসব দুর্দান্ত খেলোয়াড়কে পেছনে ফেলে আমি এই পুরস্কার জিতেছি, তাদের কথা ভাবলে আমি বিশেষভাবে গর্ববোধ করি। ভিয়া, ইনিয়েস্তা, স্নাইডার, থমাস মুলার— প্রত্যেকেই যোগ্য বিজয়ী হতে পারতেন। এটি ছিল আমার জীবনের অন্যতম সুখের মুহূর্ত।'

দক্ষিণ আফ্রিকার ওই উত্তাল এক মাসে ফোরলান যা করে দেখিয়েছিলেন, তা কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা সম্ভব নয়। সমালোচিত জাবুলানি বল যেখানে অন্যদের কাছে ছিল এক অবাধ্য গোলকধাঁধা, ফোরলান সেখানে ছিলেন সেটাকে বশ মানানোর দক্ষ কারিগর। দীর্ঘ অপেক্ষার পর উরুগুয়ের মানচিত্রকে ফের ফুটবল দুনিয়ায় উজ্জ্বল করে তোলা আর বড় বড় সব তারকাকে পেছনে ফেলে গোল্ডেন বল জয়— সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের ২০১০ সালের আসরটি তাকে ইতিহাসের এমন এক উচ্চতায় বসিয়ে দিয়েছে, যেখানে কেবল সেরাদের সেরাদেরই ঠাঁই হয়।