কোচের সঙ্গে বিবাদের গুঞ্জন: ‘জরুরি বৈঠক’ শেষে পর্তুগাল ক্যাম্প ছাড়লেন রোনালদো
ডেনমার্কের বিপক্ষে উয়েফা নেশন্স লিগের ম্যাচের ঠিক আগের দিন পর্তুগালের ট্রেনিং ক্যাম্প ছাড়ার কথা নিশ্চিত করেছেন ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো। কোচ হোর্হে জেসুসের সঙ্গে বিবাদের গুঞ্জনের মাঝেই কোপেনহেগেনে কয়েক ঘণ্টার চরম নাটকীয়তা শেষে বুধবার এমন ঘোষণা দিয়েছেন এই মহাতারকা।
পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই ফুটবলার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইন্সটাগ্রামে লিখেছেন, ‘জাতীয় দলের সংবাদ সম্মেলনের পর এবং পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতির সঙ্গে আলোচনার পর আমি জাতীয় দলের ট্রেনিং ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
মূল ঘটনার সূত্রপাত গত রবিবার রাতে। নরওয়ের বিপক্ষে ২-১ গোলে জয়ের ম্যাচে এক মিনিটের জন্যও মাঠে নামানো হয়নি ৪১ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডকে। এরপর সোমবার ও মঙ্গলবার সতীর্থদের সঙ্গে অনুশীলনেও দেখা যায়নি তাকে। পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন (এফপিএফ) তার কোনো চোট বা শারীরিক সমস্যার কথাও জানায়নি। ফলে গত জুলাইয়ে কোচের দায়িত্ব নেওয়া জেসুসের সঙ্গে রোনালদোর বিবাদে জড়িয়ে পড়ার গুঞ্জন শুরু হয়।
নরওয়ের বিপক্ষে জয়ের পর পর্তুগালের কোচ বলেছিলেন, ‘ক্রিসকে (রোনালদো) নামানোর মতো পরিস্থিতি তখন ছিল না।’ তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকটি সূত্র সংবাদমাধ্যম দ্য অ্যাথলেটিককে জানিয়েছে, এক মিনিটের জন্যও মাঠে নামতে না পেরে বেশ ক্ষুব্ধ ছিলেন রোনালদো।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বুধবার রোনালদো, জেসুস ও এফপিএফের সভাপতি পেদ্রো প্রোয়েনসাকে নিয়ে এক ‘জরুরি বৈঠক’ ডাকা হয়। কিন্তু কাজ হয়নি। বরং প্রোয়েনসার সঙ্গে আলোচনার পর এক বিবৃতিতে ক্যাম্প ছাড়ার সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেছেন রোনালদো।
তিনি আরও লিখেছেন, ‘যে জাতীয় দলের জন্য আমি সব সময় নিজেকে নিবেদিত করেছি, তা ছেড়ে যাওয়ার জন্য আমাকে কী উদ্বুদ্ধ করেছে— সময় হলে সব পর্তুগিজ নাগরিককে সেই সত্য আমি জানাব। আপাতত পর্তুগাল ও আমার সব সতীর্থকে কোনো ভেদাভেদ না রেখেই শুভকামনা জানানোর সময়।’
নেশন্স লিগের ম্যাচটিকে সামনে রেখে পর্তুগাল দল এখন ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে অবস্থান করছে। এফপিএফের এক সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য অ্যাথলেটিককে জানিয়েছে, পর্তুগালের অধিনায়ক রোনালদোকে ফিরিয়ে নিতে কোপেনহেগেনের উদ্দেশে উড়ে গেছে তার ব্যক্তিগত বিমান।
নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচটি দিয়ে পর্তুগালের জার্সিতে বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে মাত্র তৃতীয়বারের মতো পুরো সময় বেঞ্চে বসে কাটাতে হয় রোনালদোকে। এর আগে ২০০৮ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের গ্রুপ পর্বে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে (নক-আউট নিশ্চিত হওয়ার পর) এবং ২০২৪ সালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে পুরো সময় বেঞ্চে ছিলেন তিনি।
রোনালদোর ঘোষণার আগে ডেনমার্ক ম্যাচ নিয়ে বুধবারের সংবাদ সম্মেলনে জেসুস জানিয়েছিলেন, না খেলানোর ব্যাপারে তাদের মধ্যে আগে থেকেই কথা হয়েছিল। গত মৌসুমে সৌদি ক্লাব আল নাসরেও রোনালদোর কোচের দায়িত্বে থাকা এই কোচ বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, আমাদের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়েছিল। আমি ক্রিসকে (রোনালদো) বলেছিলাম যে, নরওয়ে বা ডেনমার্ক— যেকোনো এক ম্যাচে সে খেলবে না। আমি (আল নাসরে) এক বছর ধরে তার সঙ্গে কাজ করেছি। তার শারীরিক সক্ষমতা সম্পর্কে আমার পুরোপুরি ধারণা আছে। আর আমি এটা জানি, কারণ সৌদিতেও আমি একই কাজ করেছি। যখন প্রতি তিনদিন পরপর ম্যাচের সূচি থাকত, সে কদাচিৎ (উভয় ম্যাচেই) খেলত।’
তিনি যোগ করেছিলেন, ‘পর্তুগালে আমাদের প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই সে (রোনালদো) বলেছিল, “আমি শুরুর একাদশে থাকব নাকি বেঞ্চে, তা কোচের বিষয়।” সে কখনোই কোনো কিছুতে আপত্তি জানায়নি। তবে ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ীই আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আমরা একমত হয়েছিলাম যে, (নরওয়ে) ম্যাচের শেষভাগে তাকে হয়তো প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু ম্যাচের মোড় অন্যদিকে ঘুরে যাওয়ায় তাকে আমি আর নামাইনি।’
রোনালদোর সঙ্গে কোনো মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের কথাও অস্বীকার করেছিলেন পর্তুগালের কোচ, ‘এখানে কোনো সমস্যা নেই। অনেক খেলোয়াড়ের সঙ্গেই আমার মতপার্থক্য হয়েছে। কিন্তু এখানে এমন কিছু হয়নি। ব্রুনোকে (ফার্নান্দেস) নিয়েও আমাদের একই পরিকল্পনা ছিল। দলের জন্য কোনটা ভালো, সেই সিদ্ধান্ত একজন কোচকেই নিতে হয়।’
২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকে পর্তুগালের বিদায়ের পর আন্তর্জাতিক ফুটবলে রোনালদোর ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছিল তীব্র জল্পনা-কল্পনা। তা উড়িয়ে নেশন্স লিগের প্রথম চারটি ম্যাচের স্কোয়াডে ডাক পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এবার ক্যাম্প ছাড়ায় জাতীয় দলে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।