বড় হচ্ছে বহর, ছোট হচ্ছে প্রাপ্তি
এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকারী দলের আকার ক্রমেই বড় হচ্ছে, অথচ সাফল্যের গ্রাফটা যেন উল্টো দিকেই নামছে।
২০১৪ সালের ইনচন এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ ১৬৬ সদস্যের দল পাঠিয়েছিল। সেবার তিনটি পদক নিয়ে দেশে ফিরেছিল বাংলাদেশ। একটি রুপা ও দুটি ব্রোঞ্জ। ২০২৬ সালের আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসে সেই বহর বেড়ে দাঁড়ায় ২৬০ জনে, যার মধ্যে ছিলেন ১৮৭ জন ক্রীড়াবিদ।
কিন্তু এবার প্রাপ্তি মাত্র একটি ব্রোঞ্জ। অর্থাৎ অংশগ্রহণকারী বেড়েছে ৫৬.৬ শতাংশ, অথচ পদকের সংখ্যা কমেছে দুই-তৃতীয়াংশ।
তবে হতাশাজনক এই পদকসংখ্যার চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে অন্য একটি প্রশ্ন, মহাদেশের সবচেয়ে বড় মাল্টি-স্পোর্টস আসর থেকে বাংলাদেশ আসলে কী অর্জন করতে চায়? বছরের পর বছর বড় দল পাঠানো হচ্ছে, দেওয়া হচ্ছে নানা প্রতিশ্রুতি; কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফলাফল কেন মিলছে না? কেন বারবার ব্যর্থ হচ্ছে পুরো ব্যবস্থাটি?
প্রতিটি হতাশাজনক অভিযান শেষে প্রায় একই ব্যাখ্যা সামনে আসে, প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদের অভাব, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ঘাটতি, দুর্বল পরিকল্পনা এবং প্রয়োজনের তুলনায় কম আর্থিক সহায়তা।
দলের আকার নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই আয়োজকেরা তুলে ধরেন ‘অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ’-এর যুক্তি। তাদের বক্তব্য, বড় আন্তর্জাতিক আসরে ক্রীড়াবিদদের অংশ নেওয়ার সুযোগ দিলে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক গেমসে তারা ভবিষ্যতে আরও ভালো করতে পারবে।
কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা না থাকলে শুধু অভিজ্ঞতা অর্জনের এই যুক্তিকে ব্যয়বহুল অংশগ্রহণের যৌক্তিকতা হিসেবে মেনে নেওয়া কঠিন।
বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে তাকালেও চিত্রটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
ভারত ৮৫টি পদক নিয়ে চতুর্থ হয়েছে। যেখানে রয়েছে ২১টি সোনা, ২৭টি রুপা ও ৩৭টি ব্রোঞ্জ। পাকিস্তান জিতেছে ১০টি পদক, যার মধ্যে দুটি রুপা ও আটটি ব্রোঞ্জ। শ্রীলঙ্কার ঝুলিতে এসেছে একটি করে সোনা, রুপা ও ব্রোঞ্জ। আর নেপালও ফিরেছে দুটি ব্রোঞ্জ নিয়ে।
বাংলাদেশের জন্য তাই আরেকটি এশিয়ান গেমস শেষ হয়েছে আত্মসমালোচনার আরেকটি উপলক্ষ হয়ে। তবে ব্যর্থতাটা শুধু পদকের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়; আরও গভীর সংকট লুকিয়ে আছে পুরো ব্যবস্থাপনায়।
সংশ্লিষ্ট ফেডারেশনগুলো, বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) এবং সরকার, এই তিন পক্ষই এশিয়ান গেমস, কমনওয়েলথ গেমস ও অলিম্পিককে সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি ও বাস্তবায়নে বারবার ব্যর্থ হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির জায়গা দখল করে নিয়েছে স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ। দল নির্বাচন নিয়ে কর্মকর্তারা সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে আসেন, কোচদের বাদ দেওয়া হয়, আর সাংগঠনিক নানা বিতর্ক প্রতিযোগিতার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি থেকে সবার মনোযোগ সরিয়ে নেয়। জাপানের উদ্দেশে দল রওনা হওয়ার আগেই ক্রীড়াবিদ নির্বাচন ও কর্মকর্তাদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
একসময় অলিম্পিক, এশিয়ান গেমস কিংবা কমনওয়েলথ গেমসে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে ‘নামমাত্র অংশগ্রহণ’ বলে অভিহিত করা হতো। সংখ্যার বিচারে হয়তো এখন সেই তকমাটি আর পুরোপুরি খাটে না। কিন্তু মূল সমস্যাটি বদলায়নি। দলের আকার বাড়ছে, ব্যয় বাড়ছে, অথচ প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সক্ষমতায় তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো উন্নতি দেখা যাচ্ছে না।
বাস্তবে কোন কোন খেলায় বাংলাদেশের পদকের সম্ভাবনা রয়েছে, তা নিয়ে খুব বেশি রহস্য নেই। অ্যাথলেটিকস, সাঁতার, শুটিং, আর্চারি, ফেন্সিং, জিমন্যাস্টিকস ও ভারোত্তোলনের মতো ব্যক্তিগত ইভেন্টে সময়, স্কোর ও বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের মাধ্যমে পারফরম্যান্সের মান সহজেই পরিমাপ করা যায়। দলীয় খেলায়ও ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক ফলাফল সম্ভাব্য পদকের একটি পরিষ্কার ধারণা দিতে পারে।
তারপরও বাংলাদেশ বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ না করেই সীমিত সম্পদ ছড়িয়ে দিচ্ছে বিপুলসংখ্যক ডিসিপ্লিনে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ক্রীড়াবিদদের পর্যাপ্ত সময় দিয়ে প্রস্তুত করার বিষয়টিও নিশ্চিত করা হচ্ছে না।
দীর্ঘদিন ধরেই শুটিং ও আর্চারিকে বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় পদকের খেলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বিশ্বকাপসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বারবার হতাশাজনক পারফরম্যান্স সেই প্রত্যাশা আর বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধানটিই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
এখন সময় এসেছে, এ ধরনের বড় মাল্টি স্পোর্টস আসর থেকে বাংলাদেশ আসলে কী অর্জন করতে চায়, সেটি নতুন করে ভাবার। বড় বহর হয়তো দেশের বড় ক্রীড়া-আকাঙ্ক্ষার ছবি তুলে ধরতে পারে, কিন্তু শুধু সংখ্যাকে অগ্রগতির মাপকাঠি বলা যায় না।
যথাযথ প্রস্তুতি, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং বাস্তবসম্মত পদকের লক্ষ্য ছাড়া শত শত ক্রীড়াবিদ ও কর্মকর্তাকে বিদেশে পাঠানো শেষ পর্যন্ত এশিয়ান গেমসকে একটি ব্যয়বহুল ‘বিনোদন ভ্রমণ’-এ পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি করে। পার্থক্য শুধু একটাই, প্রতিবার সেই ভ্রমণের বহরটা আরও বড় হয়।
আইচি-নাগোয়ার ২২টি ডিসিপ্লিনে বাংলাদেশের হয়ে একমাত্র জিন্নাত আক্তারই দেশকে খালি হাতে ফিরতে দেননি। নারীদের ৫২ কেজি ওজন শ্রেণির উশু সান্দা ইভেন্টে তার ব্রোঞ্জ পদক বাংলাদেশকে দিয়েছে ৪০ বছরের অপেক্ষার অবসান। এটি এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ব্যক্তিগত পদক।
জিন্নাত দেশে ফিরেছেন বাংলাদেশের একমাত্র পদকটি নিয়ে। আর বাকিদের জন্য আইচি-নাগোয়া আবারও সামনে এনেছে সেই পুরোনো প্রশ্নগুলো, বড় বহর নয়, বাংলাদেশ কবে বড় সাফল্যের জন্য প্রস্তুত হবে?