আজ পর্দা উঠছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপের

স্পোর্টস ডেস্ক

চার বছর পর আবারও এসে গেছে সেই সময়। যে সময় ঘুমের হিসাব বদলে যায়, রাত জাগা হয়ে ওঠে স্বাভাবিক, আর পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ একই সঙ্গে তাকিয়ে থাকে একটি বলের দিকে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজ শুরু হচ্ছে ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের সবচেয়ে বড় উৎসব, সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতা।

মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা জুড়ে পর্দা উঠছে এমন এক বিশ্বকাপের, যা আকার, পরিসর এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষা সব দিক থেকেই আগের সব আয়োজনকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বকাপের ২৩তম আসরটি ইতিহাসে জায়গা করে নিতে যাচ্ছে সবচেয়ে বড় সংস্করণ হিসেবে।

এবারই প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দল। এতদিন ৩২ দলের বিশ্বকাপ দেখে অভ্যস্ত ফুটবল বিশ্ব। নতুন এই সম্প্রসারণের ফলে বিশ্বের আরও অনেক দেশ প্রথমবারের মতো ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজেদের তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছে।

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এই সম্প্রসারণকে ফুটবলের বৈশ্বিক বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তার মতে, আরও বেশি দেশকে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে বিশ্বকাপ আরও প্রতিনিধিত্বশীল হয়ে উঠেছে। তবে সমালোচকদের একটি অংশের আশঙ্কা, দল ও ম্যাচ সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বকাপের ঐতিহ্যগত উচ্চ-চাপের নাটকীয়তা কিছুটা কমে যেতে পারে।

১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত ৩৯ দিনের এই মহাযজ্ঞে অনুষ্ঠিত হবে রেকর্ড ১০৪টি ম্যাচ। বিশ্বকাপের শতবর্ষের ইতিহাসে এত দীর্ঘ ও বিস্তৃত আয়োজন আগে কখনো দেখা যায়নি।

টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে এস্তাদিও অ্যাজটেকাতে। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম কিংবদন্তি এই স্টেডিয়ামে স্বাগতিক মেক্সিকো মুখোমুখি হবে দক্ষিণ আফ্রিকার। ম্যাচের আগে থাকবে বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। পারফর্ম করবেন জে বালভিন ও মানাসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনের একাধিক তারকা। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাতেও অনুষ্ঠিত হবে বিশেষ উদযাপন।

মাঠের লড়াইয়ের বাইরে এবারের বিশ্বকাপকে ঘিরে বিতর্কও কম নয়। টিকিটের উচ্চমূল্য নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছে ফিফা। সমর্থক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, ক্রমবর্ধমান খরচের কারণে বিশ্বকাপ সাধারণ দর্শকদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

এ ছাড়া রাজনৈতিক নানা ইস্যুও আলোচনায় রয়েছে। বিশেষ করে ভিসা জটিলতা, সীমান্ত ও অভিবাসন নীতি, কয়েকটি দেশের কর্মকর্তা ও সমর্থকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশসংক্রান্ত সমস্যাগুলো টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

তবে অর্থনৈতিক দিক থেকে এটিকে বিশাল সফল আয়োজন হিসেবে দেখছে ফিফা। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বকাপ ২০২৬ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রায় ৪১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রভাব ফেলতে পারে। পর্যটন, পরিবহন, হোটেল, রেস্তোরাঁ, খুচরা বাণিজ্য এবং ক্রীড়া-সংশ্লিষ্ট অসংখ্য খাত এই টুর্নামেন্টকে ঘিরে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুফল পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ফুটবলপ্রেমীদের আবেগের আরেকটি বড় কারণ হলো, এটি সম্ভবত শেষ বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে দুই মহাতারকা লিওনেল মেসি ও ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব ফুটবলকে শাসন করা এই দুই কিংবদন্তিকে হয়তো শেষবারের মতো দেখা যাবে বিশ্বকাপের আলোয়।

তবে একটি যুগের সম্ভাব্য বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হচ্ছে নতুন যুগের গল্পও। নতুন নক্ষত্রের উত্থান ঘটবে, নতুন নায়ক জন্ম নেবে, তৈরি হবে নতুন কিংবদন্তি। আগামী কয়েক সপ্তাহে বিশ্ব দেখবে নতুন বিস্ময়, নতুন নাটকীয়তা, নতুন আনন্দ আর নতুন হৃদয়ভাঙার গল্প।

শেষ পর্যন্ত ৪৮ দলের এই মহারণ থেকে টিকে থাকবে মাত্র একটি দল। ১৯ জুলাইয়ের রাতে সেই দলই উঁচিয়ে ধরবে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ট্রফি।

বাংলাদেশ এবারও বিশ্বকাপের অংশ নয়। কিন্তু আবেগের দিক থেকে দেশের কোটি কোটি সমর্থক বরাবরের মতোই এই উৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন। প্রিয় দল, প্রিয় তারকা আর প্রিয় খেলাকে ঘিরে আবারও প্রাণ ফিরে পাবে অলিগলি, চায়ের দোকান, ছাদ, ড্রয়িংরুম আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।