ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে যত হয়রানি

স্পোর্টস ডেস্ক

এবারের ফুটবল বিশ্বকাপ বেশ অনেকগুলো দিক থেকেই ব্যতিক্রম। প্রথমবারের মতো ৪৮ দলের  অংশগ্রহণ, প্রথমবারের মতো তিন দেশ মিলে বিশ্বকাপ আয়োজন— অনেক দিক থেকেই ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ অভিনব। নতুনত্ব আছে আরেকটি। এটিই কি প্রথম বিশ্বকাপ, যেখানে ফুটবলের মহাযজ্ঞ শুরুর আগের দিন পর্যন্তও মাঠের খেলার চেয়ে মাঠের বাইরের নানা শোরগোলই বেশি মনোযোগ কাড়ছে?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি নিয়ে কড়াকড়ি এখন আর নতুন কিছু নয়। তবে ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ এই কড়াকড়ির আওতামুক্ত থাকবে, এমন প্রত্যাশা ছিল সবারই। যদিও বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা, ঠিকঠাক নথিপত্র থাকার পরেও বিমানবন্দরে হয়রানি ও যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে না দিয়ে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর মতো নজিরবিহীন ঘটনা ইতোমধ্যে ঘটে গেছে। এসব নিয়ে অভিবাসন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিমালা ব্যাপকভাবে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।

বিশেষ করে, সোমালিয়ার রেফারি ওমর আরতানকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়ার ঘটনা ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। যদিও দেশে ফিরে আরতান নায়কোচিত সংবর্ধনা পেয়েছেন, কিন্তু বিশ্বকাপের মতো একটা বৈশ্বিক আসর সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র বর্ণবৈষম্যমূলক আচরণ করছে কি না, উঠছে এমন প্রশ্নও।

শুধু আরতানই নন, বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে এমন অপ্রীতিকর ঘটনার ভুক্তভোগী হয়েছেন আরও অনেকে। এক নজরে সেই ঘটনাগুলো একবার দেখে নেয়া যাক।

ইরান ফুটবল দল

ইরান আদৌ যুক্তরাষ্ট্রে এসে বিশ্বকাপ খেলতে পারবে কি না, গত সপ্তাহ পর্যন্তও এ নিয়ে ধোঁয়াশা ছিল। শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র ১০ দিন আগে ইরানি ফুটবলাররা ভিসা পেয়েছে বটে, কিন্তু সাপোর্ট স্টাফের অনেকের ভিসা আটকে দেয়া হয়েছে। আরও অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের দলটি নিজেদের গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচ খেলবে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে, অথচ তাদের বেসক্যাম্প হবে প্রতিবেশী দেশ মেক্সিকোতে! প্রতি ম্যাচের আগের দিন ইরান ফুটবল দল মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসবে, আবার ম্যাচ শেষ করেই বাধ্যতামূলকভাবে ফিরে যেতে হবে মেক্সিকোতে।

এর আগে তো এমন ঘোষণাও এসেছিল, ম্যাচের দিনই না কি কেবল ইরান দলকে যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার অনুমতি দেয়া হবে! সমালোচনার মুখে পরবর্তীতে ম্যাচের আগের দিন প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়েছে। নিজেদের ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ের হিসাব যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে খেলার ময়দানে টেনে আনছে কি না, এ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেক দর্শক-সমর্থকেরাই।

আয়মান হুসেন (ইরাক)

ইরাক জাতীয় দলের স্ট্রাইকার আয়মান হুসেনকে শিকাগোর এক বিমানবন্দরে সাত ঘণ্টা আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ ও তার ফোন তল্লাশি করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তাকে দেশটিতে ঢুকতে দেয়া হলেও বিদেশি নাগরিকদের প্রতি এত বিদ্বেষমূলক মনোভাব থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বকাপ আয়োজনের দরকার কী ছিল, এমন প্রশ্ন তুলেছেন আয়মান।

আয়মান তো তাও ঢুকতে পেরেছেন, ইরাক ফুটবল দলের সাথে থাকা ফটোগ্রাফার তালাল সালাহকে ১০ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ ও ফোন তল্লাশির পরেও ইমিগ্রেশন পার হওয়ার অনুমতি দেয়া হয়নি।

উডেন্সকি পিয়েরে (হাইতি)

উডেন্সকি পিয়েরে হাইতির বিশ্বকাপ দলের একমাত্র খেলোয়াড়, যিনি দেশটিতে বসবাস করেন। কিন্তু বাকি সতীর্থরা সবাই ভিসা পেলেও একেবারে শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে পিয়েরেকে। হাইতি দল যখন যুক্তরাষ্ট্রে অনুশীলনে ব্যস্ত, পিয়েরে তখনও বাধ্য হয়ে নিজ দেশের রাজধানীতে স্থানীয় খেলোয়াড়দের সাথে অনুশীলন করছিলেন। শেষ পর্যন্ত হাইতি-নিউজিল্যান্ড প্রীতি ম্যাচের বিরতির সময় পিয়েরে মায়ামি বিমানবন্দরে অবতরণ করতে পেরেছেন।

ব্রিল এম্বোলো (সুইজারল্যান্ড)

ইমিগ্রেশন অফিসার অনুমতি না দেয়ায় বাকি দলের সাথে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে পারেননি সুইস স্ট্রাইকার এম্বোলো। ২০১৮ সালে বাসেলে এক হাতাহাতির ঘটনায় অভিযুক্ত ছিলেন এম্বোলো। ওই সময়ে আপিল না করলেও পরবর্তীতে বার্নের মার্কিন দূতাবাসে তিনি নিজের সপক্ষে প্রমাণাদি উপস্থাপন করে অভিযোগ থেকে খালাস পান। কিন্তু সেই ঘটনার জেরে এবার যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে তাকে বেগ পেতে হয়েছে।

ওমর আরতান (সোমালিয়া)

এতসব ঘটনার মধ্যে এখন পর্যন্ত সবশেষ সংযোজন সোমালিয়ার রেফারি ওমর আরতান। সব ঠিক থাকলে ৩৪ বছর বয়সী আরতান হতেন আফ্রিকান দেশটি থেকে বিশ্বকাপ ম্যাচ পরিচালনা করা প্রথম রেফারি। কিন্তু বৈধ ভিসা ও প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র সাথে থাকার পরেও আরতানকে মায়ামি বিমানবন্দরে আটকে দেয়া হয়, এবং পরবর্তীতে দেশে ফেরত পাঠানো হয়।

এর আগে সোমালি ও সোমালি-আমেরিকানদের উদ্দেশ্য করে আপত্তিকর মন্তব্য করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমনকি তাদেরকে ‘আবর্জনা’ বলেও অভিহিত করেছিলেন তিনি। এরপর সোমালিয়ার নাগরিকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। সেই নিষেধাজ্ঞারই বলি হয়েছেন ফিফার ৫২ জন রেফারির তালিকায় নাম থাকা আরতান।

ফিফার কি কিছুই করণীয় নেই?

২০২৬ বিশ্বকাপের আয়োজক নির্ধারণের সময় সেই ২০১৭ সালেই ফিফা বলেছিল, ভিসা দেয়ার ক্ষেত্রে আয়োজক দেশ কোনো বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করতে পারবে না। যদিও সাথে এটিও উল্লেখ ছিল যে আয়োজক দেশের অভিবাসন নীতি ও নিরাপত্তা যেন বিঘ্নিত না হয় সেটিও বিবেচনা করার সুযোগ থাকবে।

আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আইনজীবী খায়রান নূর কাতারের সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, আয়োজক দেশের অবশ্যই অধিকার আছে নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়ার, তবে বিশ্বকাপের মতো এত বড় আসরে এত নিয়ম-কানুন মানলে চলে না।

এসব ঘটনায় ফিফার কিছুই করার নেই কি না, এমন প্রশ্নে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো অবশ্য হাত গুটিয়ে ফেলেছেন। তিনি সরাসরি জানিয়ে দিয়েছেন, ফিফা ‘পুরো পৃথিবীর রাজা নয়’, এবং একটি স্বাধীন, সার্বভৌম দেশের ভিসা সংক্রান্ত বিষয়ে নেয়া সিদ্ধান্ত ফিফা পরিবর্তন করার জন্য বলতে পারে না।