রাকসুর সংবাদ বর্জনের ঘোষণা রাবির ৩ সাংবাদিক সংগঠনের

নিজস্ব সংবাদদাতা, রাবি

সাংবাদিকদের নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) মোস্তাকুর রহমান জাহিদের মন্তব্যের প্রতিবাদে রাকসুর সব ধরনের সংবাদ কাভারেজ বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে রাবির তিনটি সাংবাদিক সংগঠন।

সংগঠন তিনটি হলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার্স ইউনিটি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাব।

রাকসু ভিপির ওই মন্তব্যের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে পৃথক প্রতিবাদপত্র দিয়েছে ইউনিভার্সিটি টিচার্স নেটওয়ার্ক ও রাজশাহী টেলিভিশন জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (আরটিজেএ)।

রাবি ক্যাম্পাসের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের জেরে রাকসু ভিপি যাদের ‘চিহ্নিত সাংবাদিক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়ার একদিন পর আজ বুধবার এ সিদ্ধান্ত হয়।

যৌথ বিবৃতিতে তিন সাংবাদিক সংগঠন বলেছে, সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ উপস্থাপন না করেই মোস্তাকুর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন এবং তাদের নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের প্রতি পক্ষপাত দেখানোর অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন।

সংগঠনগুলো বলেছে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ‘ছাত্রলীগের প্রতি সহানুভূতি’ থাকার অভিযোগ এবং তাদের বিরুদ্ধে ‘ব্যবস্থা নেওয়ার’ হুমকিসহ তার মন্তব্য স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর আঘাত।

সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আম্মার ও অন্য নেতাদের মন্তব্যেরও সমালোচনা করেছে সংগঠনগুলো।

তারা বলেছে, কোনো প্রতিবেদন নিয়ে কারো আপত্তি থাকলে প্রতিকার চাওয়ার সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রয়েছে। তবে ‘সংবাদ প্রকাশের কারণে নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের কোনো তকমা দেওয়া ও হুমকি দেওয়া সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকি।’

সংগঠনগুলো ঘোষণা দিয়েছে, মোস্তাকুর নিঃশর্ত ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত তাদের সদস্যরা রাকসুর কোনো কর্মসূচির সংবাদ কাভার করবেন না। তারা আরও জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ক্ষমা না চাইলে সারা দেশের সাংবাদিকদের সম্পৃক্ত করে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

প্রতিবাদপত্রে ইউনিভার্সিটি টিচার্স নেটওয়ার্ক বলেছে, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

সংগঠনটির অভিযোগ, রাকসু ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা বারবার আইন নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছেন, যা ক্যাম্পাসে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।

নেটওয়ার্কটি বলেছে, বিগত সরকারের সময়কার শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের, কোনো ছাত্রসংগঠন বা রাকসুর নয়।

২৭ জুলাইয়ের ঘটনাকে ‘বলপ্রয়োগের নতুন নজির’ হিসেবে বর্ণনা করে নেটওয়ার্কটি সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে।

আরটিজেএ তাদের বিবৃতিতে বলেছে, একজন নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধির কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশিত। ‘সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়া মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও তথ্যের অধিকারের জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।’

তারা ভিপির মন্তব্য প্রত্যাহার এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

রাকসু ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, তারা ‘চিহ্নিত সাংবাদিকদের’ থেকে দূরত্ব বজায় রাখবেন এবং ‘নিরাপত্তার স্বার্থে ও কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে’ তাদের তথ্য দেবেন না।

তিনি বলেন, ‘পেশা হিসেবে সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে নয়, বরং যারা ফ্যাসিবাদী শক্তির পক্ষে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিছু সাংবাদিকের লেখায় আমরা আওয়ামী লীগপন্থী প্রবণতা দেখেছি।’

তার অভিযোগ, কিছু সংবাদমাধ্যম সাবেক ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ‘শিক্ষার্থী’ হিসেবে উল্লেখ করলেও রাকসু সদস্যদের নিয়ে প্রতিবেদনে ‘জামায়াত-শিবির নেতা’ পরিচয় ব্যবহার করেছে। এটিকে তিনি পক্ষপাতদুষ্ট বলে অভিহিত করেন।

ক্যাম্পাসের সাম্প্রতিক ঘটনায় জড়িত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া সমীচীন বলে আমরা মনে করি না। প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো সমন্বয়ের মাধ্যমে এ ধরনের বিষয় মোকাবিলা করবে।’

কোন কোন সংবাদমাধ্যমকে ‘ফ্যাসিবাদপন্থী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে জানতে চাইলে মোস্তাকুর বলেন, ‘আমরা সংবাদপত্রের একটি তালিকা তৈরি করছি। এই মুহূর্তে সেটি প্রকাশ করছি না; পরে জানানো হবে।’

এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাকসু ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে মোস্তাকুর ক্যাম্পাসের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের সমালোচনা করেন এবং কয়েকজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।