এক ধাক্কাতেই দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে দেশের সোয়া ৬ কোটি মানুষ
বড়সড় একটি অর্থনৈতিক ধাক্কাতেই দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে দেশের প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ।
এরই মধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয় কমে যাওয়া ও জ্বালানি সংকটের বাড়তি চাপে মানুষ। এতে গত কয়েক দশকে দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হয়েছিল, তা এখন উল্টো পথে যাচ্ছে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক।
গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে এসব চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির গতি ধীর হয়ে আছে। এর প্রভাব পড়েছে মানুষের কাজের সুযোগ ও আয়ে। একই সময়ে নিত্যপণ্যের দামও বেশি থাকায় মানুষের জীবনযাত্রার মানে চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২২ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা বেড়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠতে পারে।
দেশে চরম দারিদ্র্যের হারও বেড়েছে। দিনে ৩ ডলারের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমা বিবেচনায় ২০২২ সালে চরম দারিদ্র্যের হার ছিল ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়াতে পারে।
দারিদ্র্য বাড়ার পেছনে বড় কারণ গত চার বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতি। ফলে কমেছে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট। এর কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাজের সময় কমেছে, কোনো কোনো কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে। এতে নতুন কর্মসংস্থানেরও সুযোগও তৈরি হচ্ছে না। সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে শিল্প খাত।
এই দুই চাপেই গত কয়েক দশকে দারিদ্র্য কমানোর যে অগ্রগতি হয়েছিল, তা এখন আবার হুমকির মুখে।
শুধু ২০২৬ অর্থবছরেই দেশে দারিদ্র্যের হার ১ দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে বলে ধারণা করছে বিশ্বব্যাংক। ২০২৫ অর্থবছরের পর নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে।
এর সঙ্গে থমকে গেছে কর্মসংস্থানও। কাজের সুযোগ কমায় সাম্প্রতিক সময়ে নারীরাই তুলনামূলক বেশি চাকরি হারিয়েছেন।
তবে শ্রমবাজারের পুরো চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ ২০২৫ সালের পর থেকে শ্রমশক্তি জরিপের নতুন তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে কত মানুষ কাজ হারিয়েছেন বা কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি কতটা খারাপ হয়েছে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
এ পরিস্থিতিতে এমন জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে, যাদের অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা খুবই কম।
রাজস্ব ব্যবস্থার সংকট
অর্থনীতির বর্তমান সংকটের পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতার কথাও তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির মতে, সরকারি কর ও সহায়তার ব্যবস্থা দরিদ্র মানুষকে যতটা সুরক্ষা দেওয়ার কথা, বাস্তবে তা হচ্ছে না।
বিশ্বব্যাংক বলেছে, ভর্তুকি ও বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচি দরিদ্র পরিবারগুলোকে সহায়তা করে। তবে সামগ্রিক রাজস্ব ব্যবস্থা তাদের যথেষ্ট সুরক্ষা দিতে পারছে না।
২০২২ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশ্বব্যাংক দেখেছে, প্রত্যক্ষ কর ও বিভিন্ন সহায়তা বৈষম্য ও দারিদ্র্য কমায়। এতে আয়-বৈষম্য মাপার সূচক জিনি সহগ ৫২ দশমিক ৪ থেকে কমে ৫০ দশমিক ৭ হয়। দারিদ্র্যের হারও ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে নেমে আসে ১৮ দশমিক ৮ শতাংশে।
কিন্তু পরোক্ষ করের চাপ সেই সুফল অনেকটাই কমিয়ে দেয়। এতে জিনি সহগ আবার বেড়ে ৫১ দশমিক ৪ হয়। দারিদ্র্যের হারও বেড়ে দাঁড়ায় ২০ দশমিক ৬ শতাংশে।
অর্থাৎ একদিকে সরকার দরিদ্র মানুষকে সহায়তা দিচ্ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন পরোক্ষ করের মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে সেই সহায়তার চেয়েও বেশি অর্থ তুলে নিচ্ছে। ফলে দরিদ্র পরিবারগুলো সরকারের কাছ থেকে যতটা পায়, তার চেয়ে বেশি অর্থ কর হিসেবে পরিশোধ করছে।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাবের কথাও তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংক।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আর্থিক খাত, রাজস্ব, জ্বালানি ও সরকারি বিনিয়োগে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা দেশের প্রবৃদ্ধি ও সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা কমিয়েছে।
বিশ্বব্যাংক বলেছে, ‘মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতে এসব দুর্বলতা আরও তীব্র হয়েছে এবং অর্থনীতির ভঙ্গুরতা প্রকাশ পেয়েছে।’
যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক পণ্যের দাম, বিশেষ করে জ্বালানি ও সারের দাম বেড়েছে। এতে আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি তেল আমদানির বিল বেড়েছে ১০৭ শতাংশ। সারের আমদানি বেড়েছে ৪২ শতাংশ।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশেষ করে জ্বালানির আমদানি ব্যয় আরও বাড়তে পারে। এতে সরকারের ভর্তুকির ব্যয়ও বাড়বে এবং রাজস্বের ওপর চাপ তৈরি হবে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক।
জ্বালানি সংকটও দীর্ঘ হলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প খাতের ঘুরে দাঁড়ানো বিলম্বিত হতে পারে। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশে মূল্যস্ফীতি এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে বা তার নিচে রয়েছে।
দুর্বল সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা
অর্থনৈতিক সংকটে পরিবারগুলোকে সহায়তা দিতে বাংলাদেশ জ্বালানি ও সার ভর্তুকির পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালায়। সব মিলিয়ে এগুলোই দরিদ্র মানুষের জন্য এক ধরনের সহায়তার ব্যবস্থা তৈরি করেছে।
তবে প্রতিটি ব্যবস্থারই কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার সমস্যা এখন মোট অর্থের পরিমাণ নয়। বরং বড় সমস্যা হলো প্রশাসনিক অদক্ষতা।
২০২৬ সালে ২৫টি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ৯০টি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি পরিচালনা করছে সরকার।
বিশ্বব্যাংক বলেছে, এত বিস্তৃত কর্মসূচির কারণে সহায়তার গভীরতা কমেছে। সহায়তার পরিমাণ খুবই কম এবং সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের কাছে এর আওতা পৌঁছানোও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
ব্যবস্থাটি এখনো ‘খণ্ডিত’। আলাদা আলাদা যোগ্যতার নিয়ম, একই ব্যক্তির একাধিক তালিকায় থাকা এবং সহায়তা পৌঁছানোর জটিল প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে সবচেয়ে দরিদ্র মানুষই অনেক সময় প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের ৬২ শতাংশই সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা পাচ্ছে না। বিপরীতে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের ১৮ শতাংশ এসব সুবিধা পাচ্ছে।
বিদ্যুৎ ভর্তুকিতেও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। শহরের সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবার একাই মোট বিদ্যুৎ ভর্তুকির প্রায় অর্ধেক পায়।
জ্বালানি ও সার ভর্তুকি সরকারের জন্য শুধু ব্যয়বহুল নয়, এর কারণে অপচয়ও বাড়ে। ভর্তুকির কারণে অতিরিক্ত ব্যবহার উৎসাহিত হয় এবং জ্বালানি সাশ্রয় ও দক্ষ ব্যবহারের আগ্রহ কমে।
তবে সরকারের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচিকে একটি সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে বিশ্বব্যাংক। তাদের মতে, পরিবারভিত্তিক সহায়তার জন্য এটি একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্ম হতে পারে।
তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে কারা এই সুবিধা পাবে, সেই তালিকা কতটা সঠিকভাবে করা হচ্ছে তার ওপর। পুরোনো কর্মসূচির মতো ভুলভাবে সুবিধাভোগী বাছাই হলে ফ্যামিলি কার্ড থেকেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো দারিদ্র্যের হার প্রায় ৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমায়।
একই ধরনের সুবিধাভোগী বাছাইয়ের ভুল থাকলেও ফ্যামিলি কার্ড চালু হলে দারিদ্র্যের হার আরও শূন্য দশমিক ৯৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমতে পারে। এতে প্রায় ১৫ লাখ ৮০ হাজার মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারে।
আর ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি বয়স্ক ও বিধবা ভাতায় সুবিধাভোগী বাছাই আরও নির্ভুল করা এবং একটি সমন্বিত খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি চালু করা গেলে দারিদ্র্যের হার ১ দশমিক ৭২ শতাংশীয় পয়েন্ট কমতে পারে।
এতে প্রায় ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। এর জন্য অতিরিক্ত ব্যয় হবে জিডিপির শূন্য দশমিক ২১ শতাংশ।
বিদ্যুৎ ভর্তুকির বোঝা
সরকারের ভর্তুকির সবচেয়ে বড় চাপ এখন জ্বালানি খাতে। গত এক দশকে বিদ্যুৎ ও গ্যাসে মোট ভর্তুকি বেড়েছে কয়েক গুণ।
২০১৪ অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও গ্যাসে সরকারের ভর্তুকি ছিল ৮ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। ২০২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ৮৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এই অর্থ জিডিপির ১ দশমিক ৫ শতাংশের সমান। এর ৭০ থেকে ৯০ শতাংশই যায় বিদ্যুৎ খাতে।
বর্তমানে গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় দাম ১০ টাকা ৬৩ পয়সা। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের ভর্তুকিও হিসাব করলে প্রকৃত খরচ দাঁড়ায় ১৫ টাকা ১৬ পয়সা।
অর্থাৎ প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে ৪ টাকা ৫৩ পয়সা ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি মেটাতে সরকারের যে সহায়তা দিতে হয়, তা জিডিপির প্রায় ১ দশমিক ১ শতাংশের সমান।
তবে এই ভর্তুকির বড় অংশের সুবিধাভোগী তুলনামূলক ধনী পরিবারগুলো। আবাসিক গ্রাহকেরাই বিদ্যুৎ ভর্তুকির প্রায় ৭২ শতাংশ সুবিধা পায়। এর মধ্যে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবার পায় ৩৩ শতাংশ। আর সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবার পায় মাত্র ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ।
অর্থাৎ দরিদ্রদের তুলনায় ধনী পরিবারগুলো বিদ্যুৎ ভর্তুকির সুবিধা দ্বিগুণের বেশি পায়। সবচেয়ে দরিদ্র ৪০ শতাংশ মানুষ মিলে পায় মাত্র ৩০ শতাংশ।
তবে দরিদ্র পরিবারের আয়ের তুলনায় এই সুবিধার গুরুত্ব অনেক বেশি। বিদ্যুতের কম দামের সরাসরি সুবিধা এবং ভর্তুকি পাওয়া বিদ্যুৎ ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্যের কম দামের পরোক্ষ সুবিধা মিলিয়ে সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের ক্ষেত্রে এই সুবিধা তাদের কর-পূর্ব আয়ের ১৮ দশমিক ১ শতাংশের সমান। সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের ক্ষেত্রে তা মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, কোনো বিকল্প সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা না করে বিদ্যুৎ ভর্তুকি পুরোপুরি তুলে দিলে দারিদ্র্যের হার ২ দশমিক ৮ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে যাবে।
এর ফলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ৪৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে। একইসঙ্গে পরিবারের বিদ্যুৎ বিল ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় জিনি সহগ ১ দশমিক ৬ পয়েন্ট বাড়বে।
বিদ্যুতের দাম নিয়ে দ্বিধা
শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি সক্ষমতা, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং বড় পরিসরে কর্মসংস্থানের জন্য নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গত কয়েক বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও খাতটির ভিত্তি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়েছে। এর পেছনে দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও ধারাবাহিক নীতিগত ব্যর্থতা কাজ করেছে।
দীর্ঘদিন দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল দেশীয় গ্যাস। কিন্তু পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মজুত কমে আসায় উৎপাদনও কমেছে। একই সময়ে নতুন গ্যাসের অনুসন্ধানও চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে হয়নি।
২০১৭ সালেও বাংলাদেশ প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় পুরোপুরি নিজস্ব উৎপাদন দিয়ে মেটাতে পারত। এখন মোট গ্যাসের চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ মেটাতে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতাও দ্রুত বেড়েছে। বর্তমানে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪৩ শতাংশ আসে বেসরকারি খাত থেকে।
তবে জ্বালানি সরবরাহের সংকট এবং সঞ্চালন ব্যবস্থার বড় সীমাবদ্ধতার কারণে বিদ্যুৎ খাত এখনো চাপে রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করা এবং খাতটির ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন উন্নত করা।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়বে। এতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর কিছুটা চাপ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বড় ধরনের বিদ্যুৎ ভর্তুকি বাদ দিলে সরকারের আর্থিক সাশ্রয় হবে। এর পরিমাণ জিডিপির ১ দশমিক ৯ শতাংশের সমান।
বর্তমানে এই ভর্তুকির এক-তৃতীয়াংশেরও কম সবচেয়ে দরিদ্র ৪০ শতাংশ মানুষের কাছে যায়।
তাই ভর্তুকি তুলে নেওয়ার কারণে সবচেয়ে দরিদ্র ৪০ শতাংশ মানুষের যে অতিরিক্ত ব্যয় হবে, তা পুরোপুরি পুষিয়ে দিয়েও সরকার জিডিপির প্রায় শূন্য দশমিক ৬ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করতে পারবে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।