কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগে দিনকে দিন নিয়ন্ত্রণহীন এলপিজির বাজার

কল্লোল মোস্তফা
কল্লোল মোস্তফা

পদ্ধতিটি বহুল ব্যবহৃত। প্রথমে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যটির সরবরাহ কমিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয় যেন ভোক্তারা বাধ্য হয়ে বেশি দামে কিনতে শুরু করেন। এরপর সরকারকে দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পণ্যটির দাম বাড়ানো হয়।

সয়াবিন থেকে শুরু করে চিনি, এলপিজিসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় ও অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের ক্ষেত্রে এভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়। এরপর দাম বাড়ানো হয়। এমন বহু ঘটনা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আমরা দেখেছি। 

মানুষ ভেবেছিলো জনগণের বিপুল ভোটে নির্বাচিত সরকারের সময়ে এমনটা ঘটবে না। সরকার নিত্যপণ্যের বাজারকে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের একচেটিয়া আধিপত্য থেকে মুক্ত করবে। কিন্তু বাস্তবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলেও একই মডেলে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এলপিজির মতো অত্যাবশ্যকীয় জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়ানোর ঘটনা ঘটল।

দেশে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে এলপিজির বাজারে অস্থিরতা চলছিল। সরকারি দরের চেয়ে ৪০০ থেকে ৯০০ টাকা বেশি দামে ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছিল। কোথাও কোথাও বেশি দাম দিয়েও ভোক্তারা এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে পারছিলেন না।

এমন পরিস্থিতিতে ৪ অক্টোবর সন্ধ্যা থেকে বেসরকারি খাতের ১২ কেজি এলপিজির দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। গাড়িতে ব্যবহৃত এলপিজি বা অটোগ্যাসের দামও প্রতি লিটার ৭৩ টাকা ৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা করা হয়েছে।

বিইআরসি এই দাম বাড়ানোর যুক্তি হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির উপাদান প্রোপেন ও বিউটেনের মূল্যবৃদ্ধি এবং জাহাজ ভাড়া বাড়ার কথা বলেছে। কিন্তু কোনো ধরনের গণশুনানি ছাড়া একতরফাভাবে এই মূল্যবৃদ্ধি আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধিকে কতটা সঠিকভাবে প্রতিফলিত করেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এলপিজির এই দাম বাড়ানো হলো এমন এক সময়ে, যখন দেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছেন। এর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে, ২১ সেপ্টেম্বর জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে নিত্যপণ্যের দামও আরও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

দেশে প্রায় এক কোটি গ্রাহক জ্বালানি হিসেবে এলপিজি ব্যবহার করেন। এর ৮০ শতাংশই ব্যবহৃত হয় রান্নার কাজে। বাকি অংশ ব্যবহার হয় শিল্প ও পরিবহন খাতে।

এলপিজির এই বড় মূল্যবৃদ্ধির ফলে একদিকে রান্নার খরচ বাড়বে, যা সরাসরি চাপ ফেলবে সাধারণ মানুষের সংসারে। অন্যদিকে এলপিজি ব্যবহারকারী পরিবহন ও শিল্প খাতের খরচও বাড়বে।

বাংলাদেশে যখন এলপিজির দাম নিয়ে অস্থিরতা চলছে, প্রতিবেশী ভারতে তখন এলপিজির বাজার বেশ স্থিতিশীল। গ্রাহকেরা সরকার নির্ধারিত দরে ঘরে বসেই সময়মতো এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে পারছেন।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ভারত এখন পর্যন্ত গৃহস্থালি এলপিজির দাম দুই দফা বাড়িয়েছে। প্রথম দফায় মার্চে ৬০ রুপি বা ৭৭ টাকা এবং দ্বিতীয় দফায় জুনে ২৯ রুপি বা ৩৭ টাকা দাম বাড়ানো হয়। অর্থাৎ যুদ্ধ শুরুর পর ভারতে দুই দফায় মোট দাম বেড়েছে ৮৯ রুপি বা ১১৪ টাকা।

এর ফলে ভারতে ১৪ দশমিক ২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম দাঁড়িয়েছে ৯৪২ রুপি বা ১ হাজার ২০৫ টাকা। জুনের পর এখন পর্যন্ত গৃহস্থালি এলপিজির দাম আর বাড়ানো হয়নি।

বাংলাদেশে এলপিজি সিলিন্ডারগুলো বেশিরভাগই ১২ কেজির। ভারতে ১২ কেজির সিলিন্ডার হলে এর দাম পড়ত ৭৯৬ রুপি বা ১ হাজার ১৫ টাকা।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর আগেই বাংলাদেশে এলপিজির সরকারি দাম এর চেয়ে বেশি ছিল। ১২ কেজির এলপিজির দাম ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা। যদিও বাস্তবে মানুষকে এর চেয়েও বেশি দামে কিনতে হতো।

যুদ্ধ শুরুর পর এপ্রিলেই বাংলাদেশে এলপিজির দাম দুই দফায় মোট ৫৯৯ টাকা বাড়ানো হয়। এরপর বেশ কয়েকবার দাম কমানো-বাড়ানোর মধ্য দিয়ে সর্বশেষ দাম দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা।

এটা সরকার নির্ধারিত দাম। যদিও বাস্তবে মানুষকে বাজার থেকে এর চেয়ে অনেক বেশি দামে এলপিজি কিনতে হচ্ছে।

দেখা যাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বাংলাদেশে এলপিজির দাম বেড়েছে মোট ৪৯৬ টাকা। অর্থাৎ ১ হাজার ৩৪১ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা।

যুদ্ধ একটাই। কিন্তু দুই দেশের সাধারণ মানুষের ওপর এর প্রভাব দুই রকম। একই যুদ্ধের কারণে ভারতে এলপিজির দাম বেড়েছে ১১৪ টাকা, আর বাংলাদেশে বেড়েছে ৪৯৬ টাকা। এই পার্থক্যের কারণ দুই দেশের এলপিজি বাজারের কাঠামো ও ব্যবস্থাপনার পার্থক্য।

বাংলাদেশে এলপিজি খাত পুরোপুরি বেসরকারি খাতের কয়েকটি কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল। এসব কোম্পানির ওপর সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রে তারাই সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করে। তারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করলেই সরকার এলপিজির দাম বাড়িয়ে দেয়।

এবারের এলপিজির মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও এমন অভিযোগ উঠেছে। এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি বলছে, গত ২০ সেপ্টেম্বর থেকে এলপিজি আমদানিকারক কোম্পানিগুলো বাজারে সরবরাহ কমাতে শুরু করে। শুরুতে সরবরাহ কমানো হয় ৩০ শতাংশ। এরপর ধীরে ধীরে তা ৫০ শতাংশেরও বেশি কমিয়ে দেওয়া হয়।

এর ফলেই বাজারে এলপিজির সংকট তৈরি হয়। অথচ দেশে এলপিজি আমদানি কমেনি। আগস্টে ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এলপিজি আমদানি করা হয়েছে। সেপ্টেম্বরে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন।

প্রশ্ন হলো, এলপিজির আমদানি না কমলে সরবরাহ কমল কীভাবে? এলপিজি মজুত করে না রাখলে তো বাজারে সরবরাহ কমার কথা নয়।

অন্যদিকে ভারতের এলপিজি বাজার প্রায় পুরোটাই রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে। এসব কোম্পানির মাধ্যমে ভারত সরকার এলপিজি আমদানি করে এবং নির্ধারিত দরে বিক্রি করে। কোম্পানি তিনটি হলো ইন্ডিয়ান অয়েল, ভারত পেট্রোলিয়াম ও হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম। এসব কোম্পানি নির্দিষ্ট ডিলারের মাধ্যমে নির্ধারিত মূল্যে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করে।

গ্রাহকেরা মোবাইল অ্যাপ, ফোন বা এসএমএসের মাধ্যমে এলপিজি বুকিং করেন। ডিলাররা নির্ধারিত দরের মধ্যেই সেই এলপিজি সিলিন্ডার গ্রাহকের ঠিকানায় পৌঁছে দেন। এজন্য গ্রাহককে বাড়তি কোনো খরচ করতে হয় না। এলপিজির দামের মধ্যেই সেই খরচ ধরা থাকে।

একজন গ্রাহক প্রতি মাসে ১৪ দশমিক ২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডার সরকার নির্ধারিত ৯৪২ রুপি দরে কিনতে পারেন। এর চেয়ে বেশি এলপিজির প্রয়োজন হলে তুলনামূলক বেশি দামে বাজার নির্ধারিত মূল্যে কিনতে হয়।

এক্ষেত্রে কালোবাজারে চড়া দামে বিক্রি বন্ধ করতে সরকার ডেলিভারি অথেন্টিকেশন কোড বা ডিএসি ব্যবস্থা কাজে লাগায়। কোনো গ্রাহক এলপিজি সিলিন্ডার বুক করলে তার নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে ওটিপি বা ডিএসি কোড চলে যায়।

সিলিন্ডার হাতে পাওয়ার পর গ্রাহক সেই কোড ডেলিভারি কর্মীর সঙ্গে শেয়ার করলেই কেবল ডেলিভারি সম্পন্ন দেখানো যায়। ফলে ডিলারদের পক্ষে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি অর্থ দাবি করা বা সিলিন্ডার অন্যত্র বিক্রি করা কঠিন।

বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকটের কারণে সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে রান্নার জ্বালানি সংকটে ভুগছেন। এই সংকটের একটি সমাধান হতে পারত মানুষের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে ও নিরাপদভাবে এলপিজি সরবরাহ নিশ্চিত করা। কিন্তু বেসরকারি খাতের ওপর এলপিজি বাজারের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ছেড়ে দিয়ে যে তা সম্ভব নয়, তা ইতোমধ্যেই প্রমাণিত।

এক্ষেত্রে ভারতে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির মাধ্যমে যেভাবে নির্ধারিত মূল্যে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করা হয়, বাংলাদেশও তা কাজে লাগাতে পারে।

পাশাপাশি বেসরকারি খাতের কোম্পানিগুলোর এলপিজি আমদানি, মজুত ও সরবরাহের ওপর নিয়মিত নজরদারি ও তদারকি বাড়াতে হবে। সরকার নির্ধারিত মূল্যে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করতে হবে এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ বন্ধ করতে হবে।

এলপিজির বাজারে যথাযথ তদারকি ও রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য খর্ব করতে না পারলে এলপিজির দাম নিয়ে এই অরাজকতা চলতেই থাকবে।

 

কল্লোল মোস্তফা: প্রকৌশলী ও লেখক; তিনি বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবেশ ও উন্নয়ন অর্থনীতি নিয়ে কাজ করেন।

kallol_mustafa@yahoo.com