অবহেলায় মারা গেছে ৩ লাখ চারা, ২ দফা তদন্তে প্রমাণ মেলার পরও ব্যবস্থা নেই
চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের মীরসরাই রেঞ্জে সরকারি টাকায় সৃজিত ৮০ হেক্টর বাগানের প্রায় ৩ লাখ চারা মারা গেছে।
এক্ষেত্রে, দুই দফা তদন্তে দুর্নীতি ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ প্রমাণ হওয়ার ৮ মাস পরও দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বন বিভাগ।
বন বিভাগের নথি অনুযায়ী, সাসটেইনেবল ফরেস্ট অ্যান্ড লাইভলিহুডস (সুফল) প্রকল্পের আওতায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মীরসরাই রেঞ্জের ডোমখালী ও মঘাদিয়া বিটে ৮০ হেক্টর বাগান সৃজন করা হয়।
এর মধ্যে, ডোমখালীতে ৬০ হেক্টর জমিতে ২ লাখ ৬৬ হাজার ও মঘাদিয়ায় ২০ হেক্টর জমিতে ৮৮ হাজার চারা রোপণ করা হয়। বন সৃজন, শূন্যস্থান পূরণ ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ অন্তত ৩০ লাখ ৪০ হাজার টাকা খরচ করা হয়।
বিশ্বব্যাংকের অর্থ সহায়তায় বাস্তবায়িত এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল—বনজ সম্পদের উন্নয়ন, উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী তৈরি ও বননির্ভর জনগোষ্ঠীর বিকল্প কর্মসংস্থানের মাধ্যমে জীবনযাত্রার মান উন্নত করা।
কিন্তু, ২০২৫ সালের আগস্টে বন বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা বিভাগের জরিপ ইউনিটের প্রতিবেদনে বাগান দুটিতে চারার সংখ্যা অনেক কম বলে উল্লেখ করা হয়।
এরপর এ বিষয়ে একই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক শেখ আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
ওই বছরের অক্টোবরে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে কমিটি জানায়, ডোমখালী বিটের ৬০ হেক্টর বাগানে মাত্র ১৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ ও মঘাদিয়া বিটের ২০ হেক্টর বাগানে মাত্র ৬ শতাংশ চারা জীবিত রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় অর্থে সৃজিত বাগানে জীবিত চারার হার প্রত্যাশার তুলনায় খুব কম উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনটিতে।
বাগানের জার্নালের হিসাব অনুযায়ী, ডোমখালীতে ২ লাখ ৬৬ হাজার চারার মধ্যে প্রায় ৩৬ হাজার এবং ৮৮ হাজার চারার মধ্যে প্রায় ৫ হাজার চারা জীবিত পাওয়া যায়।
অর্থাৎ, মোট ৩ লাখ ৫৪ হাজার চারার বিপরীতে জীবিত চারার সংখ্যা ছিল মাত্র ৪১ হাজারের কিছু বেশি।
তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর মীরসরাই রেঞ্জের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রেঞ্জার আবদুল গফুর মোল্লাকে শোকজ করেন উপকূলীয় বন বিভাগ, চট্টগ্রামের তৎকালীন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) বেলায়েত হোসেন।
শোকজ নোটিশে বলা হয়, আবদুল গফুর মোল্লার দায়িত্বকালে বাগানগুলো ব্যর্থ হয়েছে। সরকারি অর্থ বরাদ্দের পরও বাগান সফল করতে না পারা দুর্নীতির পর্যায়ভুক্ত অপরাধ।
এতে আরও উল্লেখ করা হয়, আবদুল গফুর মোল্লার অবহেলা, অদক্ষতা, দুর্নীতি ও অসদাচরণের কারণে বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বর্তমান ডিএফও এম এ হাসান জানান, ৭ দিনের মধ্যে শোকজের জবাব দেওয়ার নির্দেশ থাকলেও প্রায় ৮ মাস পরও গফুর মোল্লা কোনো জবাব দেননি।
দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ২৮ ডিসেম্বর ডিএফও হাসান নতুন করে তিন সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। ডেপুটি রেঞ্জার সারোয়ার জাহানের নেতৃত্বাধীন ওই কমিটি চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই প্রতিবেদনেও বাগান দুটির চারার হার অত্যন্ত কম পাওয়া যায়।
নতুন কমিটির প্রতিবেদনে, ডোমখালী বিটের ৬০ হেক্টর বাগানে মাত্র ১৫ শতাংশ ও মঘাদিয়া বিটের ২০ হেক্টর বাগানে মাত্র ৫ শতাংশ চারা জীবিত থাকার তথ্য উঠে আসে।
দুই দফায় তদন্ত প্রতিবেদনে একই চিত্র পাওয়া গেলেও বন বিভাগ এখনো জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেয়নি।
যোগাযোগ করা হলে মীরসরাই রেঞ্জের বর্তমান রেঞ্জার শাহানশাহ নওশাদ ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘৮০ হেক্টর বাগানে এখন কার্যত কোনো গাছের অস্তিত্ব নেই। বাগানটি চরে পরিণত হয়েছে। সরকারি অর্থ অপচয়ের দায় নির্ধারণ না করলে আমরা যারা পরে দায়িত্ব নিয়েছি তাদের ওপরও দায় বর্তাবে। এ বিষয়ে আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি এবং লিখিতভাবেও ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেছি।’
বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তাদের ভাষ্য, একটি বাগান সৃজন ও রক্ষণাবেক্ষণে শুধু রেঞ্জার নয়, ডিএফও, সহকারী বনসংরক্ষক, বিট কর্মকর্তা, বনপ্রহরীসহ একাধিক স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়িত্ব পালন করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বন বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত এক উপ-বন সংরক্ষক ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘একটি বন সৃজনে রেঞ্জার ও বিট অফিসার সরাসরি জড়িত থাকেন। এছাড়া ডিএফও ও এসিএফ বন সৃজনের তদারকির দায়িত্ব থাকেন। সুতরাং সবাই দায়ী। শুধু একজন কর্মকর্তাকে শোকজ করাতে দায় নির্ধারণের প্রক্রিয়া থেমে গেছে।’
বর্তমান ডিএফও এম এ হাসান বলেন, ‘তিনি (গফুর মোল্লা) এখনো শোকজের জবাব দেননি। এর মধ্যে আমি অন্যান্য প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত ছিলাম। তবে বিষয়টি আমি সিরিয়াসলি দেখব। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হবে।’
যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো বলেন, ‘একাধিক তদন্ত প্রতিবেদনে অনিয়ম ও বাগানের ব্যর্থতার বিষয়টি উঠে এসেছে। এরপরও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, সেটি আমি খতিয়ে দেখব। আইন অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
যোগাযোগ করা হলে বর্তমানে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে কর্মরত আবদুল গফুর মোল্লা এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেছেন, ‘ডিপার্টমেন্ট এই বিষয়ে যা করার করবে।’