আসছে সুপার এল নিনো: ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলে বাড়বে ‘সাগর দানবের’ হানা
বিজ্ঞানী ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা একমত হয়েছেন, অল্প সময়ের মধ্যে সক্রিয় হবে এল নিনো। শুধু তাই নয়, এ বছর হতে যাচ্ছে ‘সুপার এল নিনো’।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এল নিনো সক্রিয় হলে ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ওই সময় সমুদ্রস্নানের ব্যাপারে তারা সতর্ক থাকার পরামর্শও দিয়েছেন।
তাদের মতে, ‘সুপার এল নিনো’ কেবল আবহাওয়াকে অস্থির এবং পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় ঘূর্ণিঝড় মৌসুমকে ত্বরান্বিত করবে না—এর প্রভাবে প্রাকৃতিক পরিবর্তন মানুষের জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে।
এল নিনো হলো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ধরন, যা প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উষ্ণ করে তোলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে এই গ্রীষ্মে বিভিন্ন প্রজাতির হাঙর পশ্চিম উপকূলের আরও কাছে এবং আরও উত্তরে চলে আসতে পারে।
লং বিচের ক্যাল স্টেটের সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক ও বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেস বিভাগের শার্ক ল্যাবের পরিচালক ক্রিস লো বলেন, ‘আমার মনে হয়, এবারের গ্রীষ্মে ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলে হাঙরের ঝাঁক দেখা যাবে।’
সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি উষ্ণ হয়ে ওঠায় হাঙরগুলো দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া ছাড়িয়ে আরও উত্তরে চলে যেতে পারে। সাধারণত এই প্রজাতির হাঙর বাজা ক্যালিফোর্নিয়ার উষ্ণ পানিতে অবস্থান করে।
গ্রেট হোয়াইট, মাকো ও থ্রেশার শার্ক সাধারণত তাদের বাচ্চাদের বেড়ে ওঠার সময় দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলকে আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহার করে।
ক্রিস বলেন, শক্তিশালী এল নিনো সক্রিয় থাকলে গভীর সাগরের পানি উপরে উঠতে পারে না। এতে সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায় বলে এসব প্রজাতি উপকূল ধরে আরও উত্তরে সরে যায়। সাধারণত ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলে আসে না, (বুল শার্ক ও টাইগার শার্ক) এমন প্রজাতির হাঙরও উষ্ণ পানিতে চলে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
‘এ ধরনের অস্বাভাবিক আবহাওয়ার সময় সাগর সৈকতে সাধারণত যেসব প্রাণী দেখা যায় না, সেগুলোর দিকে বিশেষ নজর রাখতে আমরা সবাইকে পরামর্শ দেই,’ বলেন তিনি।
হাঙরের কোন প্রজাতি পানির কোন স্তরে থাকবে তা নির্ভর করে পানির নির্দিষ্ট তাপমাত্রার ওপর।
‘তাই ধারণা করছি, বাজা অঞ্চলের যেসব স্থানে বড় গ্রেট হোয়াইট শার্কের শাবক বেড়ে ওঠে, সেখানকার হাঙরগুলো দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে আসতে পারে। আর পানি অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার কিছু হাঙর মধ্য ক্যালিফোর্নিয়ার দিকে সরে যেতে পারে,’ বলেন ক্রিস।
সাধারণত বসন্তে হোয়াইট শার্কের শাবক দেখা যায়। কিন্তু এ বছর ফেব্রুয়ারিতেই দেখা গেছে। ক্রিস বলেন, গবেষকেরা এই পরিবর্তনের জন্য রেকর্ড তাপপ্রবাহকে দায়ী করছেন।
উষ্ণ পানি হোয়াইট শার্ককে কেবল উত্তরে যেতে উৎসাহিতই করছে না, সেখানে তাদের দীর্ঘ সময় অবস্থানের সুযোগও তৈরি করছে।
ক্যালিফোর্নিয়ায় সাধারণত জুলাই ও আগস্টে হোয়াইট শার্ক সর্বোচ্চ সক্রিয় থাকে। এই অধ্যাপকের আশঙ্কা, আগামী শরৎ পর্যন্ত এই প্রজাতির হাঙর সক্রিয় থাকতে পারে।
তার মতে, একই কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলেও এল নিনোর প্রভাবে ফ্লোরিডায় বসবাসকারী হাঙর আরও উত্তরে চলে যেতে পারে।
আরও যা জানা দরকার
হাঙরের উপস্থিতি বাড়তে পারে বলেই সৈকতে যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে—এমন নয়। ক্যালিফোর্নিয়ায় হোয়াইট শার্ক দেখা যাওয়া নিয়মিত ঘটনা, আর আক্রমণও অত্যন্ত বিরল।
বেশিরভাগ মানুষ প্রার্থনা করেন যেন সাগরের এই ‘দানবের’ মুখোমুখি না হন, তবে গ্রেট হোয়াইট শার্ক মানুষকে শিকার হিসেবে বিবেচনা করে না।
ক্যালিফোর্নিয়া ডিপার্টমেন্ট অব ফিশ অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফের তথ্য অনুযায়ী—১৯৫০ সাল থেকে ক্যালিফোর্নিয়ায় বিভিন্ন প্রজাতির হাঙরের আক্রমণের ঘটনা ২৫০টিরও কম ঘটেছে। অধিকাংশ আক্রমণই ছিল হোয়াইট শার্ক সংশ্লিষ্ট।
তবে হাঙরের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি কমানোর নানা উপায় রয়েছে।
ক্রিস বলেন, আশেপাশের এলাকাগুলোর দিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। যেমন, মাছের ঝাঁক বা পানিতে ডুব দিয়ে শিকার ধরা সামুদ্রিক পাখির মতো বন্যপ্রাণীর আচরণ।
তিনি আরও বলেন, সাঁতারুদের ঘোলা পানি এড়িয়ে চলা উচিত। দলবদ্ধভাবে থাকা নিরাপদ, তবে সৈকতে দায়িত্বরত লাইফগার্ডদের পাশে রাখতে হবে।

