কল্যাণপুর পোড়াবস্তির চাঁদাবাজদের ঠেকানোর কেউ নেই

মুনতাকিম সাদ
মুনতাকিম সাদ
শাহীন মোল্লা
শাহীন মোল্লা

ঢাকার কল্যাণপুর পোড়াবস্তি এলাকায় দোকান ও বসতঘর দখল, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হামলার ঘটনায় কয়েকটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব গোষ্ঠীর সদস্যরা নিজেদের ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছে।

অনেক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা চেয়েও তারা প্রতিকার পাননি। কেউ ভয়ে এলাকা ছেড়েছেন, আবার কেউ অভিযুক্তদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন।

দ্য ডেইলি স্টার অন্তত ১৫টি এমন ঘটনার তথ্য পেয়েছে। কিছু ঘটনায় থানায় অভিযোগ করা হলেও পাল্টা হামলার আশঙ্কায় অনেকেই নীরব থেকেছেন। কয়েকজনের অভিযোগ, পুলিশ ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে ভুক্তভোগীদের অভিযুক্তদের সঙ্গে আপস করতে চাপ দিয়েছে।

৪০ বছর বয়সী ঠিকাদার মো. রাসেল অভিযোগ করেন, চলতি বছরের ১ এপ্রিল ইবনে সিনা হাসপাতালের কল্যাণপুর শাখার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ পাওয়ার পর সোহাগ নামে এক ব্যক্তি তার কাছ থেকে মাসিক ১৫ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন।

নিজেকে যুবদলের কর্মী পরিচয় দেওয়া সোহাগ আত্মীয়স্বজন ও কিশোর গ্যাং সদস্যদের সহায়তায় বস্তির একটি অংশ ও আশপাশের এলাকায় আধিপত্য গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাসেল চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে গত ১০ এপ্রিল সোহাগের নেতৃত্বে ২০-২৫ জনের একটি দল তাকে মিজান টাওয়ারের সামনে থেকে তুলে নিয়ে বস্তির ভেতরে মারধর করে। পরে স্থানীয়রা তার চিৎকার শুনে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।

রাসেল বলেন, দুদিন পর তিনি মিরপুর থানায় অভিযোগ করেন। কিন্তু পরে পুলিশ তাকে অভিযুক্তদের সঙ্গে আপস করতে বাধ্য করে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সোহাগ দোকানদারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে কম দামে ভাঙারি ও চোরাই মালামাল কিনে নেন এবং তার বাহিনী দিয়ে স্থানীয় ঠিকাদারি কাজ নিয়ন্ত্রণ করেন। তার বিরুদ্ধে ছিনতাই, হামলা, অপহরণ ও ঘরবাড়ি দখলের অভিযোগও রয়েছে।

আরেক ভুক্তভোগী নাসিমা আজাদ অভিযোগ করেন, নিজেকে ১১ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক বলে দাবি করা কমফোর্ট কামাল গত ২০ মাস ধরে দেশময় সুপার মার্কেটে তার দোকানটি একরকম দখল করে রেখেছেন। ওই দোকান থেকে নাসিমা প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে পেতেন, যা এখন কমফোর্ট কামাল আদায় করছেন। দোকানে তাকে আসতে বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং তাকে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী।

মার্কেট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করার পর তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারস্থ হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে তিনি ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর মিরপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং ২০২৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি একটি মামলা করেন। কিন্তু এখনো কোনো প্রতিকার পাননি।

নাসিমা বলেন, ২০২১ সালে স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে তিনি আর্থিক সংকটে রয়েছেন। বর্তমানে মানিকগঞ্জের সিংগাইরে বসবাস করেন এবং দোকানের ওই ভাড়ার টাকার ওপরই নির্ভরশীল। দূর থেকে দোকান পরিচালনা করাও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

একই মার্কেটের ব্যবসায়ী আব্দুর রশিদ জানান, ২০২৫ সালে পুত্রবধূর সঙ্গে বিরোধ মীমাংসার কথা বলে তাকে এক লাখ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে কামাল। 

পরে পারিবারিক বিরোধের সমাধান হলেও স্ট্যাম্পটি আর ফেরত দেওয়া হয়নি। এমনকি তিনি মার্কেট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন রশিদ।

মার্কেটের আরও কয়েকজন ব্যবসায়ীও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন।

যোগাযোগ করা হলে মার্কেট কমিটির চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রাফি জানান, ২০২৪ সালের আগস্টে কামালকে মার্কেটের অফিস সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। একাধিক অভিযোগ ওঠার পর তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় ২০২৬ সালের মার্চে তাকে চাকরি থেকে বহিষ্কার করা হয়।

তিনি আরও বলেন, কামাল মার্কেটের ভেতরে গলি বন্ধ করে একটি চায়ের দোকান বসিয়েছিলেন এবং বাইরের ফুটপাতের হকারদের কাছ থেকেও চাঁদা আদায় করতেন। ভুক্তভোগীদের আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

তবে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ পাওয়া গেছে তরিকুল ইসলাম তারিকের বিরুদ্ধে, যিনি নিজেকে ১১ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের আহ্বায়ক বলে পরিচয় দেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, একসময় নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করা তারিক ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার ছবি বা ভিডিও দেখিয়ে বস্তির দোকান ও ঘরবাড়ি দখল শুরু করেন।

ভুক্তভোগীদের অনেককে সম্পত্তি বিক্রির নামে স্ট্যাম্প পেপারে স্বাক্ষর করিয়ে সামান্য টাকার বিনিময়ে উচ্ছেদ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ভুক্তভোগী রোজিনা বেগম অভিযোগ করেন, ছয় মাস আগে তারিক ও তার সহযোগীরা তার স্বামী আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ তুলে তাদের সম্পত্তি নামমাত্র দামে লিখে নিতে বাধ্য করে এবং পরে উচ্ছেদ করে দেয়।

বর্তমানে সৌদি আরবে থাকা লিটন তালুকদার ফোনে জানান, পোড়াবস্তিতে তার একটি রিকশা গ্যারেজ, মাছের ব্যবসা ও সমবায় সমিতি ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাতে তারিক ও তার সহযোগীরা তার বাড়িতে ঢুকে ৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা লুট করে এবং সম্পত্তির দখল নেয়।

স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশের কাছে গিয়েও কোনো প্রতিকার না পেয়ে তিনি গত বছর দেশ ছেড়ে সৌদি আরবে চলে যান বলে জানান।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, তারিকের লোকজন প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ১০-১১ টাকা অতিরিক্ত বিল আদায় করছে।

যোগাযোগ করা হলে কমফোর্ট কামাল নাসিমা আজাদের দোকানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কথা স্বীকার করেন। তবে তিনি দাবি করেন, ২০১৭ সালে মার্কেট নির্মাণকাজ বাবদ নাসিমার স্বামীর কাছে তার ৭৫ হাজার টাকা পাওনা ছিল। বাকি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।

তবে নাসিমা ও মার্কেট কর্তৃপক্ষ উভয়েই কামালের দাবি ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন। তাদের ভাষ্য, মার্কেট নির্মাণের সঙ্গে কামালের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।

ঢাকা উত্তরের ১১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাকিল আহমেদ স্বপন বলেন, অভিযুক্তরা বিএনপি, যুবদল বা স্বেচ্ছাসেবক দলের পরিচয় ব্যবহার করলেও বর্তমানে ওই এলাকায় এসব সংগঠনের কোনো কমিটি নেই।

তিনি বলেন, তারা আগে আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে অংশ নিত। এখন বিএনপির মিছিলে যোগ দিয়ে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে।

প্রতিবাদ করতে গেলে তিনি ও অন্যরা বাধা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলেও দাবি করেন স্বপন। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

গত সপ্তাহে মিরপুর থানা থেকে প্রত্যাহার হওয়া ওসি গোলাম আজম বলেন, কল্যাণপুর পোড়াবস্তি থেকে একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেসব অভিযোগের ভিত্তিতে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।