শিশুর স্ক্রিন টাইমের বিকল্প কী হতে পারে
সন্ধ্যা সাতটা। বাসায় ফিরেই মা দেখলেন, আট বছরের মেয়ে তৃষা সোফায় বসে ট্যাবে কার্টুন দেখছে। কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন, ‘আজ আর না, অনেকক্ষণ তো হলো।’
তৃষা মুখ গোমড়া করে ট্যাবটা টেবিলে রাখে। তারপর প্রশ্ন করে, ‘তাহলে এখন কী করব?’
আজকাল অনেক বাবা-মাকে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। আবার উত্তর দেওয়াটাও কঠিন হয়ে ওঠে। কারণ যতটা সহজে স্ক্রিন বন্ধ করতে বলা যায়, তার পরিবর্তে কী করবে হঠাৎ করে তা বলাটা মুশকিল হয়ে পড়ে।

শিশুদের প্রতিষ্ঠান হাতেখড়ির প্রধান তাহাজ্জুল ইসলাম ফয়সাল বলেন, কেবল স্ক্রিনের সময় কমিয়ে দিলেই হবে না। বরং শিশুর সামনে আনন্দময় বিকল্পও তৈরি করতে হবে। যেন সে নিজেই স্ক্রিন ছাড়তে আগ্রহী হয়।
খেলাই হতে পারে সেরা বিকল্প
তাহাজ্জুল ইসলাম ফয়সালের মতে, শিশু যদি দিনের বেলা বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে থাকে, তাহলে সবচেয়ে ভালো বিকল্প হলো তার সঙ্গে খেলা বা সময় দেওয়া। খেলার সময় শিশুর মস্তিষ্কে আনন্দের অনুভূতি তৈরি হয়। একই সঙ্গে কল্পনাশক্তি, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, ধৈর্য ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বাড়ে।
এছাড়া বাবা-মায়ের সঙ্গে সময় কাটালে সম্পর্ক আরও গভীর হয়।
তিনি পরামর্শ দেন, একটি লুডু, ব্লক দিয়ে ঘর বানানো, লুকোচুরি, ছবি আঁকা কিংবা একসঙ্গে রান্নার ছোট্ট কোনো কাজ—এসবই শিশুর জন্য আনন্দের হতে পারে।

অবসর মানেই স্ক্রিন নয়
অনেক সময় আমরা মনে করি, একটু অবসর পেয়েছি এই সুযোগে টিভি বা মোবাইলে কিছুটা সময় কাটাই। আর শিশুরাও এগুলো দেখে শেখে। অথচ শিশুদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো যায়, অবসর কাটানোর আরও সুন্দর বিকল্প আছে।
একসঙ্গে গল্পের বই পড়া, গান শোনা, সিনেমা দেখা, পরিবারের সঙ্গে গল্প করা কিংবা গরম পানিতে আরাম করে গোসল, এসবও মনকে শান্ত করে। পাশাপাশি পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি করে।

অপরাধবোধ নয়, ভারসাম্য জরুরি
অনেক বাবা-মা ভাবেন, সন্তানকে মোবাইল দিলে হয়তো তারা ভুল করছেন। আবার না দিলেও মনে হয়, সন্তান বঞ্চিত হচ্ছে।
তাহাজ্জুল ইসলাম ফয়সাল বলেন, এই ‘অপরাধবোধ’ অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করে। বরং মাথায় রাখতে হবে আমরা কেউ নিখুঁত নই এবং সব সিদ্ধান্ত পুরোপুরি নিখুঁত হয় না। তাই সবচেয়ে ভালো হয় ধীরে ধীরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করা, আর সন্তান লালনপালনে সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য অপরোধবোধে না ভুগে, ভারসাম্য বজার রাখার চেষ্টা করতে হবে।
আবার শিশুরা বাবা-মায়ের কাছ থেকেই শেখে। তাই কেউ যদি ধৈর্য ধরে সমস্যা সামলায়, ভুল হলে তা স্বীকার করে এবং আবার চেষ্টা করে, তাহলে শিশুদের মধ্যেও একই অভ্যাস গড়ে উঠবে।

ঘরেই তৈরি হোক আনন্দের পরিবেশ
স্ক্রিনের বাইরে শিশুদের ব্যস্ত রাখার জন্য খুব ব্যয়বহুল খেলনা বা বিশেষ আয়োজনের দরকার নেই। সামান্য পরিকল্পনাই যথেষ্ট। এজন্য নিচে কিছু পরামর্শ তুলে ধরা হলো।
এক মাসের বই পড়ার চ্যালেঞ্জ
পরিবারের প্রত্যেকে একটি চার্ট বানাতে পারেন। কে মাসে কতটি বই পড়ল, সেটি সেখানে লিখে রাখুন। মাস শেষে সবচেয়ে বেশি বই পড়া সদস্যের জন্য ছোট্ট একটি পুরস্কার রাখা যেতে পারে।
বই পড়া শেষে দুই-তিন লাইনের মতামত লিখলে পড়ার আনন্দও বাড়ে।

বোর্ড গেমের আসর
লুডু, ক্যারাম, দাবা কিংবা অন্য বোর্ড গেম কেবল বিনোদন নয়, স্মৃতিশক্তি, পরিকল্পনার ক্ষমতা, ধৈর্য ও পারিবারিক বন্ধনও শক্তিশালী করে।
সপ্তাহে অন্তত একটি সন্ধ্যা ‘ফ্যামিলি গেম নাইট’ হিসেবে নির্ধারণ করা যেতে পারে বলে জানান তাহাজ্জুল ইসলাম ফয়সাল।
মিউজিক্যাল চেয়ার
একটু গান, কয়েকটি চেয়ার ও পরিবারের সবাইকে নিয়ে শুরু হয়ে যেতে পারে দারুণ মজার একটি খেলা। এতে শিশুরা যেমন আনন্দ পায়, বড়রাও তেমন ছোটবেলার স্মৃতিতে ফিরে যেতে পারেন।

আসল বিষয় স্ক্রিন নয়, সম্পর্ক
তাহাজ্জুল ইসলাম ফয়সাল বলেন, শিশুরা সব সময় মোবাইল চায় না। তারা চায় মনোযোগ, সঙ্গ ও আনন্দ। অনেক সময় বাবা-মায়ের সঙ্গে আধা ঘণ্টা খেলাধুলা বা গল্প করার আনন্দ একটি ভিডিও দেখার আনন্দের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তাই অভিভাবকের লক্ষ্য কেবল স্ক্রিনের সময় কমানো নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত, এমন একটি পারিবারিক পরিবেশ তৈরি করা যেখানে বই, খেলা, গল্প, হাসি ও একসঙ্গে কাটানোর সুযোগ থাকবে। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই স্ক্রিনের প্রতি আকর্ষণকে অনেকটা কমে যাবে।