সম্পাদকীয়

শৈশব যেন স্ক্রিনবন্দি না হয়ে যায়

শিশুদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থ রাখতে সচেতন হন এখনই

ঢাকার শিশুদের স্ক্রিন টাইম ও এর প্রভাবে তাদের স্বাস্থ্য ও সামগ্রিক সুস্থতা নিয়ে আইসিডিডিআর,বির সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফল বেশ উদ্বেগজনক। ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে এ গবেষণা পরিচালনা করা হয়। 

গবেষণার ফল অনুযায়ী, জরিপে অংশ নেওয়া শিশুদের মধ্যে ৮৩ শতাংশই প্রতিদিন ২ ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিনের সামনে কাটায়, যা খুবই আশঙ্কাজন। কারণ এটি স্ক্রিন টাইমের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সীমার চেয়ে বেশি।

রাজধানীর ছয়টি স্কুলের ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৪২০ জন শিশুর ওপর এই জরিপ চালানো হয়। এটি ভয়াবহ এক সামাজিক সমস্যার কথা প্রকাশ করল, যা আমাদের শিশুদের মানসিক ও শারীরিকভাবে সক্রিয় রাখতে আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতা।

গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুলগামী এই শিশুরা স্মার্টফোন, ট্যাবলেট, গেমিং ডিভাইস, টেলিভিশন ইত্যাদির স্ক্রিনে প্রতিদিন গড়ে ৪ দশমিক ৬ ঘণ্টা সময় কাটাচ্ছে। এত দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকায় তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং এর কারণে স্থূলতা, চোখের সমস্যা, মাথাব্যথা ও অনিদ্রার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

যে শিশুরা দৈনিক গড়ে ২ ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিনের সামনে কাটাচ্ছে, তারা রাতে মাত্র ৭ দশমিক ৩ ঘণ্টার মতো ঘুমাচ্ছে, যা এই বয়সী শিশুদের জন্য কম। চিকিৎসকরা শিশুদের ৮-১০ ঘণ্টা ঘুমানোর পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত কম ঘুমানোর ফলে শিশুদের স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ ও শেখার ক্ষমতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, শারীরিক বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক মানসিক স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হতে পারে। এ কারণেই হয়তো জরিপে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩১ শতাংশের অন্তত একটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা—যেমন, নির্দিষ্ট কোনো ভীতি, দুশ্চিন্তা, বিষণ্ণতা, ইচ্ছা করে নিজের ক্ষতি করা এবং অতি-চঞ্চলতা বা হাইপারঅ্যাক্টিভিটি থাকার তথ্য মোটেও আশ্চর্যজনক নয়। এছাড়া, শিশুদের প্রতি ৩ জনে একজন চোখের সমস্যায় ভুগছে এবং ৮০ শতাংশ শিশু মাথাব্যথার কথা জানিয়েছে।

ঢাকার বেশিরভাগ শিশুর এই গতিহীন জীবনযাপন এবং স্ক্রিনের প্রতি আসক্তি পুরোপুরি তাদের নিজেদের ইচ্ছায় তৈরি হয়নি। প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ মানুষের এই মহানগরে ৩০০টি খেলার মাঠও নেই। পাড়া-মহল্লার পার্ক বা মাঠ তো দূরে থাক, অনেক স্কুলেই নেই কোনো খেলার মাঠ কিংবা কোনো আঙিনা। এর সঙ্গে আরও আছে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমাদের ব্যর্থতা। শিশুদের ওপর যে হারে সহিংসতার কথা শোনা যায়, সে কারণে কোনো খোলা জায়গায় কিংবা খোলা রাস্তায় শিশুদের একা ছাড়ার ভরসা পান না অভিভাবকরা। একক পরিবারে বাবা-মা দুজনেই কর্মজীবী হলে, তাদের জন্য শিশুদের চোখে চোখে রেখে খেলার সময় বের করা আরও কঠিন।

দুঃখজনকভাবে, আমাদের সরকার ও নীতিনির্ধারকরা শুধু মেগাপ্রজেক্ট ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকেই মনোযোগ দিয়ে যাচ্ছেন। নিরাপদ খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান তৈরি করে শিশুদের সুস্থতার কথা খুব কমই ভাবা হয়েছে।

আইসিডিডিআর,বির এই গবেষণার ফল প্রকাশের পর সবার সচেতন হওয়া উচিত। এই মেগাসিটিকে শিশুবান্ধব করতে একটি বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য আমরা সরকার ও সিটি করপোরেশনের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।

এছাড়া, শিশুদের স্ক্রিন টাইম সীমিত করতে এবং ডিভাইসকে দূরে রেখে পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে নিবিড় ও আন্তরিক সময় কাটাতে উৎসাহিত করতে অন্যান্য দেশ যে ধরনের নীতিমালা তৈরি করছে, আমাদের সরকারও সেই পথ অনুসরণ করতে পারে। আমাদের শিশুদের ভার্চুয়াল জগত থেকে বাস্তব পরিবেশে ফিরিয়ে আনতে আমাদের সব ধরনের প্রচেষ্টা চালাতে হবে।