আমরা কেন কখনো সাইকেল চালানো ভুলি না?
আমাদের মস্তিষ্ক দক্ষতা ও তথ্যকে একভাবে মনে রাখে না। তাই সাইকেল চালানোর মতো কিছু দক্ষতা বহু বছর অনুশীলন না করলেও সহজে হারিয়ে যায় না।
কেউ হয়তো গতকাল কী পোশাক পরেছিলেন, তা মনে করতে পারেন না। আবার আজ সন্ধ্যায় কোনো পরিকল্পনা আছে কি না, সেটিও ভুলে যান। কিন্তু সেই মানুষটিকেই যদি বহু বছর পর একটি সাইকেলে বসানো হয়, তাহলে সহজেই তিনি ভারসাম্য রেখে প্যাডেল ঘুরিয়ে চালাতে পারবেন। অবাক করার মতো হলেও এটাই ঘটে।
এ কারণেই ইংরেজিতে একটি বহুল প্রচলিত কথা আছে—It's like riding a bike. অর্থাৎ, একবার শিখলে আর ভোলা যায় না। এটি কেবল প্রবাদ নয়, এর পেছনে রয়েছে শক্ত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কেন সাইকেল চালানো এত সহজে ভুলে যাই না?
আমরা সাধারণত মনে করি, কোনো তথ্য মনে রাখা আর কোনো দক্ষতা মনে রাখা একই প্রক্রিয়া। কিন্তু বাস্তবে তা নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটির নিউরোলজির অধ্যাপক ড. অ্যান্ড্রু বাডসনের মতে, মানুষের দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতি মূলত তিন ধরনের।
প্রথমটি সেমান্টিক মেমোরি, এটি আমাদের তথ্য ও জ্ঞান সংরক্ষণ করে। যেমন—বিড়াল ও কুকুরের পার্থক্য জানা, টোস্টার বা স্ক্রু-ড্রাইভার কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, এসব তথ্য এই স্মৃতিতে জমা থাকে।
দ্বিতীয়টি এপিসোডিক মেমোরি, এটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার স্মৃতি। যেমন প্রথম স্কুলে যাওয়ার দিন, প্রথম চাকরি বা প্রথম ভালোবাসার স্মৃতি।
তৃতীয়টি প্রোসিডিউরাল মেমোরি, এখানেই জমা থাকে বিভিন্ন দক্ষতা, যেগুলো আমরা বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে প্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে করতে শিখি। যেমন সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা, গিটার বাজানো কিংবা কিবোর্ডে না তাকিয়ে টাইপ করা।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, সাইকেল চালানোর দক্ষতা মস্তিষ্কের গভীরে থাকা বেসাল গ্যাংলিয়া ও সেরিবেলামের মতো অংশে সংরক্ষিত হয়।
এই অংশগুলো মূলত শরীরের নড়াচড়া, ভারসাম্য ও অভ্যাসগত কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। তাই এগুলো সাধারণ তথ্য মনে রাখার অংশের তুলনায় অনেক বেশি স্থিতিশীল।
ফলে বহু বছর সাইকেল না চালালেও একবার প্যাডেলে পা রাখলেই শরীর যেন নিজে থেকেই মনে করে নেয়, কীভাবে ভারসাম্য রাখতে হবে, কীভাবে বাঁক নিতে হবে কিংবা কখন ব্রেক করতে হবে।
শুধু সাইকেলই নয়
আসলে বিষয়টি কেবল সাইকেলের ক্ষেত্রে নয়। একই কারণে সাঁতার কাটা, স্কেটিং করা, গিটার বাজানো, কিবোর্ডে দ্রুত টাইপ করা ইত্যাদি সহজে ভুলে যায় না।
মজার বিষয় হলো, ১৯৪০-এর দশকের আগে ইংরেজিতে It's like swimming কথাটিই বেশি প্রচলিত ছিল। পরে সাইকেলের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটি বদলে যায় It's like riding a bike।
বিজ্ঞানীরা কীভাবে এটি পরীক্ষা করেন
শুনতে অবাক লাগলেও, সাইকেল চালানোর স্মৃতি নিয়ে সরাসরি খুব বেশি গবেষণা হয়নি।
কারণ, কেউ সাইকেল চালানোর সময় তার মস্তিষ্ক স্ক্যান করা বেশ কঠিন। আবার কে কত ভালো সাইকেল চালান, সেটি ব্যক্তিগতভাবে বলার ওপর নির্ভর করলে গবেষণার ফলও নির্ভরযোগ্য নাও হতে পারে।
তাই বিজ্ঞানীরা অন্য উপায়ে প্রোসিডিউরাল মেমোরি পরীক্ষা করেন।
এর মধ্যে একটি পরিচিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের আয়নায় হাতের প্রতিচ্ছবি দেখে বিভিন্ন আকৃতি আঁকতে বলা হয়। শুরুতে কাজটি কঠিন মনে হলেও বারবার অনুশীলনের ফলে তারা দ্রুত দক্ষ হয়ে ওঠেন। এভাবেই বোঝা যায়, অনুশীলনের মাধ্যমে মস্তিষ্ক নতুন দক্ষতাকে ধীরে ধীরে স্থায়ী স্মৃতিতে পরিণত করে।
তবে একদিন সাইকেল চালালেই যে সেই দক্ষতা সারাজীবন থেকে যাবে, তা নয়। বারবার অনুশীলনের ফলে মস্তিষ্কে সংশ্লিষ্ট স্নায়ুপথগুলো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তখন সেই দক্ষতা দীর্ঘদিন সংরক্ষিত থাকে।
গবেষকদের ভাষায়, প্রোসিডিউরাল স্মৃতিও সময়ের সঙ্গে কিছুটা দুর্বল হয়। তবে ব্যক্তিগত স্মৃতির তুলনায় তা অনেক ধীরে ক্ষয় হয়। তাই বহু বছর পর আবার অনুশীলন শুরু করলে দক্ষতাটি খুব দ্রুত ফিরে আসে।
বয়স বাড়লেও শেখা থামে না
ভালো খবর হলো, মানুষের মস্তিষ্ক সারা জীবনই নতুন প্রোসিডিউরাল স্মৃতি তৈরি করতে পারে।
বয়স বাড়লেও কেউ হুইলচেয়ার ব্যবহার করা, ওয়াকার চালানো, কম্পিউটার বা ট্যাবলেট ব্যবহার শেখার মতো নতুন দক্ষতা অর্জন করতে পারেন। শুধু প্রয়োজন কিছুটা সময়, ধৈর্য ও নিয়মিত অনুশীলন।
আমাদের টিকে থাকার কৌশল
বিজ্ঞানীদের মতে, বিবর্তনের ধারায় মানুষের এই স্মৃতিব্যবস্থা গড়ে উঠেছে টিকে থাকার প্রয়োজনেই।
শিকার ধরা, বিপদ থেকে দৌড়ে পালানো কিংবা খাবার সংগ্রহের মতো কাজ প্রতিবার নতুন করে ভেবে করলে চলত না। তাই মস্তিষ্ক এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যেন গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতাগুলো একবার ভালোভাবে শিখে গেলে সেগুলো প্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে করা যায়।
তাই বহু বছর পর সাইকেলে উঠেও যখন সহজে ভারসাম্য রাখতে পারেন, তখন বুঝতে হবে, আপনার পা নয়, কাজটি মনে রেখেছে আপনার মস্তিষ্ক। আর সেই কারণেই, সাইকেল চালানো সত্যিই এমন একটি দক্ষতা, যা একবার শিখলে সহজে ভোলা যায় না।
সূত্র: পপুলার সায়েন্স