মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিপদে পড়লে যেভাবে সুরক্ষা দেয় সিক্রেট সার্ভিস
ওয়াশিংটন হিলটন হোটেলের বলরুম তখন উৎসবের আমেজে মাতোয়ারা। হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের ঐতিহ্যবাহী নৈশভোজে উপস্থিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু গত শনিবারের সেই হাস্যেজ্জ্বল পরিবেশে হঠাৎই নেমে আসে আতঙ্কের কালো ছায়া।
অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা বলয় ভেঙে এক সশস্ত্র ব্যক্তি ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করেন। মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় পরিচিত দৃশ্যপট। সাধারণ অতিথিরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাৎক্ষণিক তৎপরতায় নেমে পড়েন সিক্রেট সার্ভিসের এজেন্টরা।
তারা তড়িঘড়ি করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পকে ঘিরে ধরেন। এরপর তাদের অনুষ্ঠানস্থল থেকে সরিয়ে নিয়ে যান নিরাপদ আশ্রয়ে।

ওই নৈশভোজে দায়িত্ব পালনকালে সিক্রেট সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে সিএনএনকে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট তিনজন ব্যক্তি।
গুলিটি ওই কর্মকর্তার সুরক্ষাকবচে (বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট) আঘাত করে; তাকে দ্রুত স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, ওই কর্মকর্তার প্রাণহানির কোনো শঙ্কা নেই।
সিএনএনের সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট এবং সাবেক এফবিআই এজেন্ট জশ ক্যাম্পবেল জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট যখন আকস্মিক ঝুঁকির মুখে পড়েন, তখন সিক্রেট সার্ভিসের নিরাপত্তা দল ঠিক সেভাবেই কাজ করে যেভাবে তারা প্রশিক্ষিত।
সিএনএনের লাইভ কভারেজে ক্যাম্পবেল বলেন, প্রেসিডেন্ট বা তাদের সুরক্ষায় থাকা কোনো ব্যক্তির ওপর সম্ভাব্য কোনো হুমকি এলে তারা তাৎক্ষণিক পাল্টা ব্যবস্থার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকে। মনে হচ্ছে, এই ঘটনার ক্ষেত্রে তারা ঠিক সেই কাজটিই করেছে।

এজেন্টরা বিপদের বিষয়টি বুঝতে পারামাত্রই একটি ‘কাউন্টার অ্যাসল্ট টিম’ (ক্যাট টিম) প্রেসিডেন্টকে মঞ্চ থেকে দ্রুত সরিয়ে নেয়।
ক্যাম্পবেল বলেন, ‘প্রেসিডেন্টকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পর তাদের প্রধান কাজ হলো সেখানে অন্য কোনো সম্ভাব্য হুমকি রয়ে গেছে কি না, তা মোকাবিলা করা।’
এরপর তারা সিদ্ধান্ত নেয় কীভাবে তাকে আরও নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া হবে—গাড়িতে করে নাকি অন্য কোনো সুরক্ষিত কক্ষে।
ক্যাম্পবেল ব্যাখ্যা করেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যেখানেই যান না কেন, প্রতিটি ভেন্যুতে একটি নির্দিষ্ট ‘হোল্ড রুম’ বা নিরাপদ কক্ষ থাকে। বিপদের সময় প্রেসিডেন্টকে দ্রুত সেই নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, ঘটনার সূত্রপাত এবং প্রেসিডেন্টের গাড়িবহর (মোটরকেড) চলতে শুরু করার মাঝখানে যে সময়ের ব্যবধান ছিল, তা দেখে স্পষ্ট বোঝা যায়—প্রেসিডেন্টকে প্রথমে ওই হোল্ড রুমেই নেওয়া হয়েছিল।
ক্যাম্পবেলের মতে, প্রেসিডেন্ট যেখানেই যান না কেন, সেই স্থানটি প্রথাগতভাবেই একটি ‘হার্ডেনড টার্গেট’ বা অত্যন্ত সুরক্ষিত এলাকায় পরিণত হয়। কিন্তু নিরাপত্তা বেষ্টনী বা ধাতব বস্তু শনাক্তকরণ যন্ত্রের (ম্যাগনেটোমিটার) সীমানার বাইরে থাকা এলাকাগুলো মূলত সবসময়ই কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ বা ‘সফট টার্গেট’ হিসেবে থেকে যায়।
সিক্রেট সার্ভিস এখন তাদের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এই ঘটনার তদন্ত শুরু করবে। এর মধ্যে থাকবে হামলাকারীকে শনাক্ত করা, তার লক্ষ্য ও সম্ভাব্য উদ্দেশ্য খুঁজে বের করা এবং সে কীভাবে অনুষ্ঠানের এত ভেতরে প্রবেশ করতে সক্ষম হলো তা পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করা।

ক্যাম্পবেল শেষে বলেন, ‘সিক্রেট সার্ভিস প্রতিদিন এই ধরনের পরিস্থিতির জন্যই প্রস্তুতি নেয়।’
অনুষ্ঠানস্থল থেকে সরিয়ে নেওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পর প্রেসিডেন্ট তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ জানান যে, ওই বন্দুকধারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, সন্দেহভাজন হামলাকারীর কাছে ‘একাধিক অস্ত্র’ ছিল।
তিনি সিক্রেট সার্ভিসের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, তাদের কয়েকজন সাহসী সদস্য অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সন্দেহভাজন হামলাকারীকে ধরাশায়ী করেছেন।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সন্দেহভাজন হামলাকারী ক্যালিফোর্নিয়ার ৩১ বছর বয়সী একজন তরুণ। তদন্ত সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।