ওপেক প্লাস কী, এই জোট কীভাবে তেলের দামে প্রভাব ফেলে?
ওপেক প্লাস জোটের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদক দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) মঙ্গলবার জানিয়েছে যে, তারা আগামী ১ মে থেকে এই তেল উৎপাদনকারী জোট থেকে বের হয়ে যাবে।
রয়টার্স বলছে, ওপেক প্লাস বলতে বোঝানো হয় অর্গানাইজেশন অব দ্য পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কানট্রিজ (ওপেক) এবং এর সহযোগী দেশগুলোকে, যার মধ্যে রাশিয়াও অন্তর্ভুক্ত।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইএ) অনুমান অনুযায়ী, গত বছর এই জোট বিশ্বের মোট তেল ও তেলজাত তরল পণ্যের প্রায় ৫০ শতাংশ উৎপাদন করেছে। আমিরাত ছিল ওপেক প্লাসের চতুর্থ বৃহত্তম উৎপাদক দেশ।
ওপেক এবং ওপেক প্লাস কী?
ওপেক প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬০ সালে ইরাকের বাগদাদে। এর প্রতিষ্ঠাতা দেশগুলো ছিল ইরাক, ইরান, কুয়েত, ভেনেজুয়েলা এবং সৌদি আরব। সংগঠনটির মূল লক্ষ্য ছিল তেল নীতিমালা সমন্বয় করা এবং বিশ্ববাজারে ন্যায্য ও স্থিতিশীল তেলের দাম নিশ্চিত করা।
বর্তমানে ওপেকের সদস্য সংখ্যা ১২টি দেশ, যাদের অধিকাংশই মধ্যপ্রাচ্যের। আমিরাত ১৯৬৭ সালে এই সংগঠনে যোগ দেয়।
গত কয়েক বছরে ওপেক থেকে কয়েকটি দেশ বের হয়ে গেছে। আমিরাত সাম্প্রতিক সময়ে এই সংগঠন ত্যাগ করা চতুর্থ দেশ এবং সবচেয়ে বড় উৎপাদক। এর আগে—অ্যাঙ্গোলা ২০০৭ সালে ওপেকে যোগ দেওয়ার পর উৎপাদন সীমা নিয়ে মতবিরোধের কারণে ২০২৪ সালের শুরুতে সংগঠন ত্যাগ করে। ইকুয়েডর ২০২০ সালে ওপেক ত্যাগ করে। কাতার ২০১৯ সালে সংগঠন থেকে বেরিয়ে যায়।
১৯৭০-এর দশকে ওপেক বিশ্ব তেলের ৫০ শতাংশের বেশি উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করত, যা পরে উত্তর সাগরসহ ওপেক-বহির্ভূত উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে কমে যায়।
পরবর্তী দশকগুলোতে ওপেকের বাজার অংশীদারিত্ব ৩০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করে। তবে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী উৎপাদনকারীদের রেকর্ড উৎপাদন এই অংশীদারিত্ব ধীরে ধীরে কমিয়ে দেয়।
২০১৬ সালে ওপেক আবার প্রভাব পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে রাশিয়াসহ ১০টি অ-সদস্য দেশকে নিয়ে একটি জোট গঠন করে, যার নাম দেওয়া হয় ওপেক প্লাস।
এর ফলে ২০২৫ সালে এই জোটের বাজার অংশীদারিত্ব বেড়ে প্রতিদিন প্রায় ৫১ দশমিক ১৫ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছে যায়, যা বৈশ্বিক তেল ও তেলজাত উৎপাদনের প্রায় ৫০ শতাংশ। তবে ২০২৫ সালের মার্চে, ইরান যুদ্ধ শুরুর এক মাস পর, এই অংশীদারিত্ব কমে প্রায় ৪৪ শতাংশে নেমে আসে।
যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধ এবং আমিরাতের উৎপাদন পরিস্থিতি
যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে আমিরাত প্রতিদিন ৩ দশমিক ৩ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করত। তাদের সক্ষমতা ছিল ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ মিলিয়ন ব্যারেল পর্যন্ত।
ওপেকে আমিরাতের গুরুত্ব ছিল অনেক, কারণ সৌদি আরবের সঙ্গে মিলিয়ে তাদের অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা ছিল, যা প্রয়োজন হলে বাজারে সরবরাহ বাড়াতে ব্যবহার করা যেত।
তবে ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট নজিরবিহীন বাজার অস্থিরতা এবং কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এই পরিস্থিতি বদলে যায়।
এই সংকটের কারণে মার্চ মাসে উপসাগরীয় ওপেক প্লাস দেশগুলোর তেল উৎপাদন ফেব্রুয়ারির তুলনায় প্রতিদিন প্রায় ৮ মিলিয়ন ব্যারেল কমে যায় বলে জানায় ওপেক।
এই উৎপাদন হ্রাসের কারণ ছিল রপ্তানি সীমাবদ্ধতা। যদিও সৌদি আরব ও আমিরাতের বিকল্প রপ্তানি ব্যবস্থা রয়েছে।
সৌদি আরবের প্রতিদিন ৭ মিলিয়ন ব্যারেল ক্ষমতাসম্পন্ন একটি পাইপলাইন রয়েছে, যা রেড সি পর্যন্ত তেল পরিবহন করতে পারে। অন্যদিকে আমিরাত ফুজাইরাহ বন্দরের মাধ্যমে প্রতিদিন ১ দশমিক ৫ থেকে ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন ব্যারেল রপ্তানি করতে সক্ষম।
ওপেক এবং বৈশ্বিক তেলের দাম
ওপেক প্লাস দাবি করে যে, তারা বাজারের ভারসাম্য রক্ষার জন্য তেল উৎপাদন বাড়ায় বা কমায়।
তবে সমালোচকরা মনে করেন, এই জোট তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করে প্রভাব বিস্তার করে, যদিও ওপেক এই অভিযোগ অস্বীকার করে।
১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময়, আরব ওপেক সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তেল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। কারণ যুক্তরাষ্ট্র তখন ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে পুনরায় সরবরাহ করছিল। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে ওই দেশগুলোতে তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়।
এই নিষেধাজ্ঞা তখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বড় চাপ সৃষ্টি করে, কারণ দেশটি তখন আমদানি করা তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল। তেলের দাম বেড়ে যায়, জ্বালানি সংকট দেখা দেয় এবং বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার ঝুঁকিতে পড়ে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওপেককে একাধিকবার সমালোচনা করে বলেছেন, তারা তেলের দাম বাড়িয়ে ‘বিশ্বকে শোষণ’ করছে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় দেশগুলোকে সামরিকভাবে রক্ষা করলেও তারা উচ্চ তেলের দাম চাপিয়ে সেই সুবিধা নেয়।
তবে ২০২০ সালের কোভিড-১৯ মহামারির সময় তেলের দাম পড়ে গেলে, যুক্তরাষ্ট্রের তেল শিল্পকে রক্ষা করতে ট্রাম্প নিজেই ওপেক প্লাসকে উৎপাদন কমাতে উৎসাহিত করেছিলেন।
২০২৫ সালে ওপেকের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপথে তেল রপ্তানির প্রায় ৪৭ শতাংশ ছিল বলে কেপলারের তথ্য জানায়। তবে মার্চে এটি কমে ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসে।
ওপেকের সদস্য দেশগুলো
বর্তমানে ওপেকের সদস্য দেশগুলো হলো: সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ইরাক, ইরান, আলজেরিয়া, লিবিয়া, নাইজেরিয়া, কঙ্গো, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি, গ্যাবন এবং ভেনেজুয়েলা।
আমিরাত জানিয়েছে, তারা ১ মে সংগঠনটি ত্যাগ করবে।
ওপেক প্লাসের অ-সদস্য সহযোগী দেশগুলো
ওপেক প্লাস জোটের অ-সদস্য দেশগুলো হলো: রাশিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্তান, বাহরাইন, ব্রুনেই, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, ওমান, দক্ষিণ সুদান, সুদান এবং ব্রাজিল, যা ২০২৫ সালের শুরুতে এই জোটে যোগ দেয়।
