বিশ্বে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের যত দুর্ঘটনা

স্টার অনলাইন ডেস্ক

বিশ্বে বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে পারমাণবিক শক্তিকে দীর্ঘদিন ধরে একটি কার্যকর ও তুলনামূলক কম কার্বন নিঃসরণকারী উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু এই শক্তির ব্যবহার সম্ভাবনাময় হলেও দুর্ঘটনার ইতিহাসও রয়েছে।

কয়েকটি বড় পারমাণবিক দুর্ঘটনা শুধু সংশ্লিষ্ট দেশ নয়, বরং গোটা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এসব ঘটনার ফলে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং অপারেটরদের ভুলের বিষয়টি নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে।

পারমাণবিক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুর্ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম ঘটে, তবে যখন ঘটে তখন এর প্রভাব হয় দীর্ঘমেয়াদি। তেজস্ক্রিয় বিকিরণ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়লে তা মাটি, পানি ও বায়ুকে দূষিত করে এবং মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার প্রভাব কয়েক দশক স্থায়ী হয়।

পারমাণবিক দুর্ঘটনায় দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসার, জেনেটিক পরিবর্তন, কৃষি উৎপাদন হ্রাস এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মতো জটিল সমস্যার সৃষ্টি করে।

দুর্ঘটনার পর চেরনোবিল অঞ্চলের সমবায় খামারগুলো থেকে সরিয়ে নেওয়া মানুষরা কিয়েভের কাছে মাকারোভস্কি জেলায় নতুন করে নির্মিত একটি গ্রামের রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছেন। ছবি: রয়টার্স

ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা

১৯৮৬ সালে ইউক্রেনের চেরনোবিলে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিপর্যয় ঘটে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চলাকালে ভয়াবহ বিস্ফোরণ হয়। রিঅ্যাক্টরের নকশায় ত্রুটি এবং অপারেটরদের ভুল সিদ্ধান্ত এই দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। 
বিস্ফোরণের ফলে বিপুল পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থ বাতাসের সঙ্গে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

এই দুর্ঘটনার পর প্রায় তিন লাখের বেশি মানুষকে স্থানান্তর করা হয় এবং বিস্তীর্ণ এলাকা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে ওই এলাকায় থাইরয়েড ক্যানসারসহ নানা রোগের হার বেড়ে যায়।

জাপানের ফুকুশিমা দাইইচি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিস্ফোরণ। ছবি: রয়টার্স

আধুনিক যুগের বড় বিপর্যয়

২০১১ সালে জাপানে ভূমিকম্প ও সুনামিতে ফুকুশিমা দাইইচি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিস্ফোরণ ঘটে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের শীতলীকরণ ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। সেখানে একাধিক রিঅ্যাক্টরে পারমাণবিক জ্বালানি গলতে শুরু করে এবং তেজস্ক্রিয় পদার্থ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে।

এই দুর্ঘটনায় সরাসরি মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও প্রায় দেড় লাখ মানুষকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। আইএইএ ও জাপান সরকার জানায়, এ ঘটনায় পরিবেশ দূষণ এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল বিপুল।

যুক্তরাষ্ট্রের থ্রি মাইল আইল্যান্ড পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ছবি: সংগৃহীত

প্রযুক্তিগত ত্রুটি ও অপারেটরের ভুল

১৯৭৯ সালের থ্রি মাইল আইল্যান্ড দুর্ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করে। সেখানে একটি যান্ত্রিক ত্রুটি এবং অপারেটরদের ভুল বোঝাবুঝির কারণে রিঅ্যাক্টরে পারমাণবিক জ্বালানি আংশিকভাবে গলতে শুরু করেছিল।

সেখানে বড় ধরনের প্রাণহানি না ঘটলেও ওই ঘটনাটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সংস্কার ত্বরান্বিত করতে ভূমিকা রেখেছে বলে জানায় ইউএস নিউক্লিয়ার রেগুলেটরি কমিশন।

গ্রিনপিসের কর্মীরা টেচা নদী থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করছেন, যা রাশিয়ার সবচেয়ে প্রাণঘাতী পারমাণবিক বর্জ্য ফেলার স্থানগুলোর একটি। ছবি: রয়টার্স

অন্যান্য উল্লেখযোগ্য দুর্ঘটনা

১৯৫৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের কিশতিম বিপর্যয় ছিল একটি বড় ধরনের পারমাণবিক বর্জ্য বিস্ফোরণের ঘটনা, যা বহু বছর গোপন রাখা হয়েছিল। একই বছর যুক্তরাজ্যের উইন্ডস্কেল ফায়ারের ঘটনায় রিঅ্যাক্টরে আগুন লাগে এবং তেজস্ক্রিয় পদার্থ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে।

এ ছাড়া, ১৯৯৯ সালে জাপানের টোকাইমুরাতেও একটি পারমাণবিক দুর্ঘটনা ঘটেছিল। সেখানে একটি শিল্পকারখানায় ভুল পদ্ধতির কারণে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ছড়িয়ে পড়ে এবং কয়েকজন কর্মী প্রাণ হারান।

এসব ঘটনা দেখায় যে, শুধু বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, পারমাণবিক প্রযুক্তির যেকোনো পর্যায়েই ঝুঁকি থাকতে পারে।

উইন্ডস্কেল ফায়ার, যা এখন সেলাফিল্ড নামে পরিচিত—সেখানে ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ড যুক্তরাজ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের পুনর্বিবেচনার সূচনা করেছিল। ছবি: পিএ

দুর্ঘটনার কারণ: একটি বিশ্লেষণ

পারমাণবিক দুর্ঘটনার পেছনে সাধারণত একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করে। প্রযুক্তিগত ত্রুটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি মানবিক ভুলও বড় ভূমিকা রাখে। চেরনোবিল দুর্ঘটনায় রিঅ্যাক্টরের নকশাগত দুর্বলতা এবং অপারেশনাল ভুল একসঙ্গে কাজ করেছিল। 
অন্যদিকে ফুকুশিমা দুর্ঘটনা দেখিয়েছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব কতটা ভয়াবহ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং ঝুঁকি মূল্যায়নে ঘাটতি থাকলে দুর্ঘটনার শঙ্কা বেড়ে যায়।

জাপানের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র টোকাই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ছবি: সংগৃহীত

ঝুঁকি মূল্যায়ন: আইএনইএস স্কেল

পারমাণবিক দুর্ঘটনার মাত্রা নির্ধারণে ব্যবহৃত হয় আন্তর্জাতিক পারমাণবিক এবং রেডিওলজিক্যাল ইভেন্ট স্কেল। এই স্কেলে ০ থেকে ৭ পর্যন্ত ধাপ রয়েছে। লেভেল ৭ সবচেয়ে ভয়াবহ, যেখানে চেরনোবিল ও ফুকুশিমা অন্তর্ভুক্ত। থ্রি মাইল আইল্যান্ডকে লেভেল ৫ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এই স্কেল আন্তর্জাতিকভাবে দুর্ঘটনার মাত্রা বোঝাতে সহায়তা করে।

বিশ্ব কী শিখেছে?

এই দুর্ঘটনাগুলো বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। বর্তমানে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উন্নত নিরাপত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। নতুন প্রজন্মের রিঅ্যাক্টরগুলোতে স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে, যা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম।

এ ছাড়া, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো হয়েছে এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে তথ্য বিনিময় জোরদার করা হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতিও অনেক উন্নত হয়েছে।

বিশ্বে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন আজও একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎস। তবে এর সঙ্গে জড়িত ঝুঁকিও বাস্তব এবং তা ইতিহাসে বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। চেরনোবিল থেকে ফুকুশিমা—প্রতিটি দুর্ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন যতই হোক, নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব নয়।

তবুও উন্নত প্রযুক্তি, কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। ভবিষ্যতে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার আরও বাড়লে নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতাই হবে এর টেকসই ব্যবহারের মূল ভিত্তি।