পাল্টাপাল্টি হামলার পর ট্রাম্প বললেন— যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর রয়েছে।
তবে এর আগেই বৃহস্পতিবার গভীর রাতে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে। কোন পক্ষ প্রথম হামলা চালিয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
বিবিসির খবরে এমনটি বলা হয়েছে।
ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ড অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র একটি ইরানি তেলবাহী ট্যাঙ্কার এবং হরমুজ প্রণালির দিকে অগ্রসরমান অন্য একটি জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
সেই সঙ্গে বেশ কিছু উপকূলীয় এলাকায় যুক্তরাষ্ট্র বিমান হামলা চালিয়েছে বলেও দাবি করেছে ইরান।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌবাহিনীর গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ারের (বিধ্বংসী যুদ্ধজাহাজ) ওপর ইরানের হামলার জবাবে তারা ‘আত্মরক্ষামূলক হামলা’ চালিয়েছে।
ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান আজ ‘আমাদের সঙ্গে ধৃষ্টতা দেখিয়েছে’।
মাত্র একদিন আগেই ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল যে তারা যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া একটি প্রস্তাব বিবেচনা করছে। এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি এমন সময়েই তৈরি হলো।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম শুরুতে হরমুজ প্রণালিতে বিস্ফোরণের খবর জানিয়ে একে ‘শত্রুপক্ষের’ সঙ্গে ‘গুলি বিনিময়’ হিসেবে উল্লেখ করে।
অন্যদিকে, দেশটির স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, তেহরানেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
এর কিছুক্ষণ পরই ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ড এক বিবৃতিতে জানায়, বন্দর খামির, সিরিক এবং কেশম দ্বীপের উপকূলে বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ইরান অবিলম্বে মার্কিন সামরিক জাহাজগুলোতে হামলা চালিয়ে এর পাল্টা জবাব দিয়েছে এবং এতে ‘ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি’ হয়েছে। সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের’ দায়ে অভিযুক্ত করেছে তারা।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বলেছে, ইরান কোনো উসকানি ছাড়াই হামলা চালিয়েছে।
তারা জানায়, মার্কিন নৌবাহিনীর গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার যখন হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করছিল, তখন ইরানি বাহিনী ‘একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং ছোট নৌকা’ দিয়ে হামলা চালায়।
সেন্টকম আরও জানিয়েছে, তারা সম্ভাব্য সব হুমকি নসাৎ করেছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণকেন্দ্র, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র এবং গোয়েন্দা পর্যবেক্ষণ ও নজরদারিকেন্দ্রে হামলা চালানোর দাবিও করেছে তারা।
নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বেশ কিছু ছোট নৌকা ধ্বংস করেছে।
তিনি আরও বলেন, ইরানি হামলাকারীদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
শান্তি চুক্তির বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আবারো হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘আজ আমরা যেভাবে তাদের পর্যুদস্ত করেছি, তারা যদি দ্রুত চুক্তিতে সই না করে, তবে ভবিষ্যতে আমরা তাদের আরও অনেক কঠোর ও সহিংসভাবে শেষ করব!’
একটি ইসরায়েলি সূত্র বিবিসিকে নিশ্চিত করেছে যে, সর্বশেষ ‘এই হামলায় ইসরায়েলের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।’
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, হোয়াইট হাউস মনে করছে, তারা ইরানের সঙ্গে একটি ১৪ দফার সমঝোতা স্মারক সইয়ের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। এটি বিস্তারিত পারমাণবিক আলোচনার একটি কাঠামো তৈরি করতে পারে।
গত বুধবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রস্তাবটি তাদের বিবেচনায় রয়েছে এবং তেহরান এই বিষয়ে পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তাদের মতামত জানাবে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, তার দেশ এই যুদ্ধবিরতিকে যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তিতে রূপান্তর করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
তবে ইরানের পার্লামেন্টের একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য ওই ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকটিকে কেবল একটি ‘কল্পিত চাহিদার তালিকা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই হুমকি দিয়ে বলেছে, শান্তিচুক্তির জন্য তাদের নিজ নিজ শর্তগুলো পূরণ না হলে সহিংসতার মাত্রা আরও বাড়বে।
গত ৬ মে ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছিলেন যে, ইরান যদি চুক্তিতে রাজি না হয়, তবে ‘বোমা হামলা শুরু হবে এবং দুঃখজনকভাবে তার মাত্রা ও তীব্রতা আগের চেয়ে অনেক বেশি হবে।’
এর কিছুক্ষণ পরেই ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক কমিশনের মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি এক্স হ্যান্ডলে লেখেন, ইরান ‘ট্রিগারে আঙুল দিয়ে রেখেছে।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ‘আত্মসমর্পণ করে প্রয়োজনীয় শর্তসমূহ না মেনে নেয়’, তবে ইরান তাদের ‘কঠোর ও অনুশোচনা জাগানিয়া জবাব’ দেবে।
ট্রাম্প আগে বলেছিলেন যে, ইরানে পরিচালিত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ তখনই বন্ধ হবে, যখন ‘ইরান শর্তগুলো মেনে নেবে।’
তবে এই বক্তব্যের আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছিলেন, অভিযানটি সমাপ্ত হয়েছে এবং তাদের লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে।
ট্রাম্প আবারো দাবি করেছেন, ইরান অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার শর্তে রাজি হয়েছে।
তবে তেহরান এই দাবির কোনো সত্যতা নিশ্চিত করেনি। মূলত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিই দুই দেশের মধ্যে বিরোধের প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।