যেভাবে বিদেশিদের ওপর নজরদারি চালায় চীন
সিসিটিভি ক্যামেরা, মোবাইল ফোনের লোকেশন ডেটা, মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, হাসপাতালের নথি, ভ্রমণের তথ্য, এমনকি বিল পরিশোধের রেকর্ড—বিভিন্ন উৎস থেকে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে বিদেশি নাগরিকদের ওপর নজরদারি চালায় চীনের পুলিশ। সম্প্রতি ‘ডাইনামিক কন্ট্রোল প্ল্যাটফর্ম ফর ওভারসিজ পারসোনেল’ নামে চীনা পুলিশের একটি ড্যাশবোর্ডে ৭০০ বিদেশি নাগরিকসহ প্রায় ১২ হাজার মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য খুঁজে পান এক সাইবার নিরাপত্তা গবেষক।
আজ রোববার মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে বসবাসকারী সাইবার নিরাপত্তা গবেষক ও সাংবাদিক মার্ক হোফার প্রায় প্রতিদিনই ইন্টারনেটে খোঁজ করেন, চীন কীভাবে তার নাগরিকদের ওপর নজরদারি চালায়, সে–সংক্রান্ত তথ্যের। চীনে বিদেশি সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করার সময় থেকেই বিষয়টি তাকে আকৃষ্ট করে।
চলতি বছরের শুরুতে এমনই এক অনুসন্ধানের সময় তিনি ‘ডাইনামিক কন্ট্রোল প্ল্যাটফর্ম ফর ওভারসিজ পারসোনেল’ নামে একটি অনলাইন ড্যাশবোর্ডের সন্ধান পান।
সেখানে হঠাৎ নিজের ছবি, পাসপোর্ট নম্বর ও ফোন নম্বর দেখতে পান হোফার। ছবিটি চীনের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ তাদের নথির জন্য তুলেছিল। পাশেই ছিল তার পাসপোর্ট নম্বর এবং চীনে ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নম্বর।
হোফার বলেন, ‘আমি একেবারে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। যে ব্যক্তি এসব তথ্য সেখানে যুক্ত করেছে, তার হাতে প্রকৃত সরকারি তথ্য ছিল।’
তার ভাষ্য, প্ল্যাটফর্মটি দেখতে অনেকটা স্টিভেন স্পিলবার্গের চলচ্চিত্র মাইনরিটি রিপোর্টে দেখানো ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির মতো।
তিনি জানান, উত্তর চীনের ঝাংজিয়াকৌ শহরে বসবাসকারী বিদেশিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করা হয়েছে।
ড্যাশবোর্ডের তথ্যে দেখা যায়, ঝাংজিয়াকৌতে বসবাসরত ৭০০–এর বেশি বিদেশিকে এটি পর্যবেক্ষণ করছে। তবে ডাটাবেজে মোট প্রায় ১২ হাজার মানুষের তথ্য ছিল। তাদের মধ্যে পলাতক ব্যক্তি, হংকং ও তাইওয়ানের বাসিন্দা এবং ৩০০–এর বেশি বিদেশি সাংবাদিকও ছিলেন। এদের কেউ কেউ কখনো ঝাংজিয়াকৌতেই যাননি।
হোফার আরও লক্ষ্য করেন, সম্প্রতি কারা এই প্ল্যাটফর্মে লগইন করেছেন, তার একটি তালিকাও রয়েছে। সেখানে ঝাংজিয়াকৌ এবং অন্য কয়েকটি শহরের পুলিশ স্টেশনের নাম দেখা যায়।
যেভাবে চলে নজরদারি
ক্যামেরা, মোবাইল ফোনের সিগন্যাল এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ব্যবহার করে ১৪০ কোটির বেশি নাগরিকের ওপর নজরদারি চালায় চীন।
ডাটাবেজে ব্যক্তিদের জাতীয়তা, জন্মতারিখ, লিঙ্গ, বৈবাহিক অবস্থা, ঠিকানা, পেশা এবং অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয়ও রয়েছে।
এতে আরও দেখা যায়, তারা কখন ট্রাফিক মোড়, বাজার, শপিং মল কিংবা মসজিদে গেছেন—সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সংগ্রহ করা এমন তথ্যও সংরক্ষণ করা হয়েছে।
হোফার বলেন, ‘এটি কোনো শিক্ষার্থীর পরীক্ষামূলক প্রকল্প বা কয়েকজনের খেলাচ্ছলে বানানো কিছু নয়।’
কী কী তথ্য রয়েছে
হোফার জানান, প্ল্যাটফর্মটিতে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের তথ্য ‘ফাইভ আইজ অ্যালায়েন্স’ নামে একটি শ্রেণিতে রাখা হয়েছে।
এছাড়া মিসর, ইরান, ইসরায়েল, মরক্কো, পাকিস্তান ও সুদানের নাগরিকদের ‘গুরুত্বপূর্ণ দেশের নাগরিক’ হিসেবে আলাদা শ্রেণিতে রাখা হয়েছে।
হংকং, তাইওয়ান, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, বিদেশি দম্পতি এবং ‘কি পারসন’ নামে আরও কয়েকটি আলাদা শ্রেণিও রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘কি পারসন’ শব্দটি সাধারণত পলাতক ব্যক্তি বা সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি মনে করা হয়—এমন মানুষদের বোঝাতে ব্যবহার করে চীনা কর্তৃপক্ষ।
ডাটাবেজে পাকিস্তান ও ভারতের অনেক বিদেশি শিক্ষার্থীর তথ্যও রয়েছে।
হোফারের তথ্য অনুযায়ী, এসব বিদেশি শিক্ষার্থীর বেশির ভাগই ঝাংজিয়াকৌর হেবেই নর্থ ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করছিলেন। তাদের ধর্ম, বৈবাহিক অবস্থা, পড়াশোনার বিষয় এবং কখন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করছেন—এসব তথ্যও সেখানে রয়েছে।
প্ল্যাটফর্মে একজন ব্যক্তির সামাজিক সম্পর্কের নেটওয়ার্কও দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে, তিন পাকিস্তানি যুবক একসঙ্গে ক্যামেরায় ধরা পড়ার পর তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের তথ্যও দেখানো হয়েছে।
এছাড়া যাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তাদের তথ্যও রয়েছে ওই প্ল্যাটফর্মে।
হোফারের দেওয়া নথি অনুযায়ী, ঝাংজিয়াকৌ পুলিশের কর্মকর্তা ঝাং জিংলং এসব তথ্য প্ল্যাটফর্মটিতে যুক্ত করেছিলেন।
কারা চালাচ্ছে
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের অনুসন্ধানে জানা যায়, প্ল্যাটফর্মটির সঙ্গে বেইজিংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অরিজিন ডাইনামিকের সম্পর্ক রয়েছে।
সরকারি দরপত্রের নথি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি পুলিশকে রোবট, নজরদারি প্রযুক্তি এবং বিভিন্ন সরঞ্জাম সরবরাহ করে।
২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি চীনের নাগরিক নন—এমন ব্যক্তিদের তথ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি পেটেন্ট আবেদন করে। এর নকশা ও কার্যপ্রণালি ঝাংজিয়াকৌর এই প্ল্যাটফর্মটির সঙ্গে প্রায় পুরোপুরি মিলে যায়।
হোফারের ধারণা, প্ল্যাটফর্মটি ঝাংজিয়াকৌ পাবলিক সিকিউরিটি ব্যুরো বা স্থানীয় পুলিশের জন্যই তৈরি করা হয়েছিল। কারণ এতে এমন তথ্য ছিল, যা কেবল চীনা কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকার কথা।
পুলিশ কীভাবে এই ডাটাবেজ ব্যবহার করছে, তা স্পষ্ট নয়।
তবে এতে দেখা যায়, নজরদারি ক্যামেরা, চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি, বিল পরিশোধের তথ্য, মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন উৎস থেকে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করে বিদেশি নাগরিকদের আচরণ ও চলাফেরা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
একজন ব্যক্তি কোথায় নিয়মিত যান, কখন হাসপাতালে যান, কখন বিল পরিশোধ করেন, কোন ট্রেন বা বিমানে ভ্রমণ করেন—এমনকি তার আসন নম্বর পর্যন্ত ওই ডাটাবেজে সংরক্ষিত রয়েছে।
চীনে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষা
প্রতিবেদনে বলা হয়, জননিরাপত্তার নামে বিগ ডাটা ব্যবহার করে ভিন্নমত দমন এবং সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলা প্রতিরোধে উদ্যোগ নিয়েছে চীন সরকার।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়াবিষয়ক উপপরিচালক মায়া ওয়াং *দ্য নিউইয়র্ক টাইমস*-কে বলেন, ‘অন্য দেশেও এ ধরনের নজরদারি ব্যবস্থা রয়েছে। তবে চীনে পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘এভাবে বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে একত্র করার নজির সত্যিই বিরল। এটি চীনে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার অভাবই তুলে ধরে।’
প্ল্যাটফর্মটির নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন
হোফার জানান, তিনি যখন প্রথম প্ল্যাটফর্মটির লগইন পেজে যান, তখন সেখানে ব্যবহারকারীর নাম ও পাসওয়ার্ড আগেই পূরণ করা ছিল।
এর অর্থ, সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্যসমৃদ্ধ এই সিস্টেমটি ইন্টারনেটে খুঁজে পেলেই যে কেউ দেখতে পারতেন।
কানাডার সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান সেকডেভ গ্রুপের জ্যেষ্ঠ গবেষক গ্রেগ ওয়ালটন বলেন, ‘এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। চীনের ক্রমবর্ধমান নজরদারি ব্যবস্থারই একটি পরিণতি।’
তার মতে, প্রতিটি নতুন প্ল্যাটফর্মই সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য ভুলভাবে সংরক্ষণ, অনুলিপি হয়ে যাওয়া বা অনলাইনে উন্মুক্ত হয়ে পড়ার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।