গাজায় দাফনের জায়গাও নেই!

স্টার অনলাইন ডেস্ক

গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক আগ্রাসন শুরুর পর পেরিয়ে গেছে ২ বছর ১০ মাস ১৬ দিন। কাগজে-কলমে ‘যুদ্ধবিরতি’ চালু থাকলেও প্রায় প্রতিদিনই ইসরায়েলি হামলায় হতাহত হচ্ছে নিরীহ, নিরস্ত্র গাজাবাসী।

পরিস্থিতি এখন এমন যে, মৃতদের দাফনের জায়গা খুঁজে পেতেও হিমশিম খাচ্ছেন গাজাবাসীরা।

গতকাল শনিবার কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে এই করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে।

ইসরায়েল নির্ধারিত সামরিক অঞ্চল ‘ইয়েলো লাইনের’ কাছে গুলিতে নিহত হন মোহাম্মদ (৪০)। তার ছেলে ওমর আল-সাওহি (২০) হন্যে হয়ে নিহত বাবাকে দাফনের জন্য জায়গা খুঁজে বেড়াচ্ছেন।

গত ১০ জুন গাজা সিটির জেইতুন এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ ছোট একটি রাস্তার পাশের দোকানে চা-কফি বিক্রি করছিলেন। এ সময় একটি বুলেট এসে তার ঘাড়ে আঘাত করলে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

বাবাকে দাফন করতে জেইতুন কবরস্থানে নিয়ে যান ওমর। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখেন, জমির পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে প্রতিটি কবর একে অপরের গা ঘেঁষে তৈরি করা হয়েছে।

অনেকগুলোতেই গাজায় ইসরায়েলের চলমান গণহত্যায় নিহতদের দাফন করা হয়েছে।

জায়গার সংকট এবং যুদ্ধের কারণে তৈরি কঠিন পরিস্থিতিতে অনেক কবরেই শুধু একটি পাথর ও তার সঙ্গে মৃত ব্যক্তির নাম লেখা কাগজ লাগিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আল জাজিরাকে ওমর বলেন, ‘আমি কবরস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অসংখ্য কবর দেখেছি। বালু দিয়ে পাহাড়ের মতো করে তৈরি করে তার নিচে মানুষকে কবর দেওয়া হয়েছে।’

‘কবর বলতে শুধু একটি পাথর, তাতে নিহতের নাম লেখা একটি কাগজ। যুদ্ধের আগে যেভাবে কবর তৈরি ও যথাযথভাবে প্রস্তুত করা হতো, এখন আর সেভাবে করা সম্ভব হচ্ছে না’, যোগ করেন তিনি।

এখানে বর্তমানে একটি কবর তৈরিতে প্রায় ১৬৭ ডলার (২০ হাজার ৫৪১ টাকা) খরচ হয়। এই খরচ বহন করা তার পরিবারের পক্ষে আপাতত সম্ভব নয়। তাই তাদের বিকল্প ব্যবস্থা করতে হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘নতুন কবরের জন্য কোনো জায়গাও ছিল না। তাই আমাদের দাদার কবরে তাকে দাফন করতে হয়েছে।’

মৃতদের দাফন

ইসরায়েলের গণহত্যামূলক হামলার মুখে গাজায় দাফনপ্রক্রিয়াসহ বেশিরভাগ জরুরি সেবা পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়েছে। যুদ্ধে নিহত হাজারো ফিলিস্তিনি ‘নিখোঁজ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন।

তাদের অনেককে বাগান, তাঁবু, বাস্তুচ্যুতদের শিবির, স্কুল কিংবা হাসপাতালের প্রাঙ্গণে দাফন করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর গাজায় ইসরায়েলি সহিংসতা কিছুটা হলেও কমে আসে।

এরপর গাজাবাসীরা ধ্বংস হওয়া বাড়ির ধ্বংসস্তূপ কিংবা অস্থায়ী কবরস্থান থেকে স্বজনদের মরদেহ উদ্ধার করতে শুরু করে।

যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর অন্তত ১ হাজার ২০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

তাদের প্রত্যেকেরই দাফনের জন্য জায়গা প্রয়োজন।

গাজার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হাসপাতালের প্রাঙ্গণে থাকা সাতটি গণকবর থেকে ৫২৯ ফিলিস্তিনির মরদেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে।

ইসরায়েলি সহিংসতার সাময়িক বিরতির সুযোগ নিয়ে মোহাম্মদের পরিবার তার মরদেহাবশেষ উদ্ধার করে একটি কবরস্থানে নিয়ে যায়, যাতে সেখানে তাকে চূড়ান্তভাবে দাফন করা যায়।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তবে শুধু বিপুলসংখ্যক নিহতের কারণে নয়, গাজায় দাফনের জায়গার সংকটের আরও বড় একটি কারণ আছে।

প্রাণহানির পাশাপাশি ইসরায়েলি হামলায় কবরস্থানসহ অসংখ্য বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে।

গাজার ধর্মীয় ও দাতব্য বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর ৪০টির বেশি কবরস্থান ধ্বংস করেছে ইসরায়েলি সেনা।

ইসরায়েলি বাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় কবরস্থানে প্রবেশের ওপরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এতে দাফনের জায়গার সংখ্যা আরও কমে গেছে।

ইসরায়েলি বোমা হামলা ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার নির্দেশের কারণে লাখো ফিলিস্তিনি বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। ফলে আগে কবরস্থানের জন্য নির্ধারিত অনেক জায়গাই এখন বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

গাজার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কবরের ফলকের মতো প্রয়োজনীয় উপকরণের সংকটের কারণে এখন একটি কবর দিতে ২৩৫ থেকে ৩৩৫ ডলার (২৮ হাজার থেকে ৪১ হাজার টাকা) পর্যন্ত খরচ হয়।

কবরের ফলক তৈরির অর্থ জোগাড় না হওয়া পর্যন্ত অনেকে ধসে পড়া ভবনের ইট-পাথর, কাদামাটি কিংবা ঢেউটিন দিয়ে অস্থায়ীভাবে কবর চিহ্নিত করছেন।

গাজার ধর্মীয় ও দাতব্য বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের গণমাধ্যমবিষয়ক কর্মকর্তা ইকরামি আল-মাদাল্লাল বলেন, ‘যুদ্ধ শুরুর সময়ই গাজার ৬০টি কবরস্থানের অনেকগুলোতে আর জায়গা ছিল না।’

তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘দাফনের জায়গার সংকটের কারণে আমাদের নতুন কবরস্থান তৈরি করতে হবে।’

মন্ত্রণালয় নতুন কবরস্থানের জন্য জায়গা খুঁজছে। পাশাপাশি অস্থায়ীভাবে দাফন করা মরদেহগুলো কবরস্থানে স্থানান্তর করাও কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘মরদেহ স্থানান্তরের কাজ এলোমেলোভাবে করা যায় না। এ জন্য ধর্মীয় ও দাতব্য বিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় করতে হয়।’

৫০ বছর বয়সী তাফেশ আবু হাতাব ১৯ বছরের বেশি সময় ধরে কবর খোঁড়ার কাজ করছেন।

তিনি বলেন, গাজায় চলমান যুদ্ধ তার কর্মজীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়।

তিনি গাজার খান ইউনিস শহরের একটি কবরস্থানে কাজ করেন। সেখানে যুদ্ধ শুরুর সময় প্রায় ৬০টি কবর ছিল। এখন একই জায়গায় ৬ হাজার মানুষের কবর হয়েছে।

যুদ্ধের এক পর্যায়ে তাফেশকে প্রতিদিন প্রায় ৩৫টি করে কবর প্রস্তুত করতে হয়েছে।

তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘এত ভয়াবহ রক্তপাত আমরা কখনো দেখিনি। এমন একটি দিনও যায় না, যেদিন অন্তত কয়েক ডজন শহীদকে কবর দিতে হচ্ছে না।’

তার হাতে আসা মৃতদের অনেকেই নারী ও শিশু। এমনকি অনেক নবজাতক শিশুর মরদেহও তার কাছে আসে। কখনো কখনো ইসরায়েলি বোমায় একটি পুরো ভবন, যানবাহন কিংবা তাঁবু ধ্বংস হওয়ার পর একটি পরিবারের সকল সদস্যের মরদেহ কবরস্থানে নিয়ে আসা হয়।

তিনি বলেন, ‘তারা আমাদের মাথার ওপরের ছাদ ধ্বংস করে। আর সেই ঘরের ধ্বংসস্তূপ দিয়েই আমরা আমাদের কবর তৈরি করি।’