শিশুদের জন্য সামাজিকমাধ্যম বন্ধ করছে যেসব দেশ
শিশু-কিশোরদের সামাজিকমাধ্যম ব্যবহার নিয়ে নতুন করে ভাবছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। গত কয়েক মাসে একের পর এক দেশ শিশুদের জন্য এসব প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ সীমিত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে অস্ট্রেলিয়া প্রথম দেশ হিসেবে কঠোর নিয়ম চালু করে। এখন সেই পথেই হাঁটার কথা ভাবছে আরও অনেক দেশ।
এসব দেশের সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, সামাজিকমাধ্যম শিশুদের জন্য কেবল বিনোদনের জায়গা নয়, ঝুঁকিও জায়গা। সাইবার বুলিং, আসক্তি, মানসিক চাপ, এমনকি অনলাইনে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তাই শিশুদের সুরক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলেই মনে করছে তারা।
তবে এই উদ্যোগ নিয়ে বিতর্কও আছে। সমালোচকদের মতে, শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। অ্যামনেস্টি টেকের মতো সংস্থাগুলো মনে করে, বাস্তবতা বুঝে সমাধান খোঁজা জরুরি। সেই পথে না হেঁটে অনেক দেশ আইন করার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
এই আলোচনার কেন্দ্রেই আছে অস্ট্রেলিয়া। দেশটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সামাজিকমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। এর আওতায় পড়েছে—ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক ইত্যাদি। তবে হোয়াটসঅ্যাপ বা ইউটিউব কিডস এই তালিকার বাইরে। সরকার বলেছে, কোম্পানিগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে, ১৬ বছরের নিচের কেউ যেন এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে না পারে। নিয়ম না মানলে বড় অঙ্কের জরিমানার মুখে পড়তে হবে।
অস্ট্রেলিয়ার পর ইউরোপেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অস্ট্রিয়া ১৪ বছরের নিচের শিশুদের জন্য নিষেধাজ্ঞা আনতে যাচ্ছে।
ডেনমার্ক ১৫ বছরের নিচের শিশুদের জন্য একই ধরনের আইন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে কার্যকর হতে পারে। তারা বয়স যাচাইয়ের জন্য বিশেষ ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর কথাও বলেছে।
ফ্রান্স ইতোমধ্যে ১৫ বছরের নিচের শিশুদের জন্য সামাজিকমাধ্যম বন্ধের একটি বিল পাস করেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ মনে করেন, এই আইন শিশুদের অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ক্ষতি থেকে রক্ষা করবে। তবে আইনটি এখনও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
অন্যদিকে জার্মানিতেও ১৬ বছরের নিচের শিশুদের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আলোচনা চলছে, যদিও সব রাজনৈতিক দল একমত নয়।
দক্ষিণ ইউরোপে গ্রিস ২০২৭ সাল থেকে ১৫ বছরের নিচের শিশুদের জন্য সামাজিকমাধ্যম বন্ধ করার পরিকল্পনা করেছে। সরকারের মতে, এতে শিশুদের উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা ও আসক্তি কমবে।
একইভাবে স্পেন ১৬ বছরের নিচের শিশুদের সামাজিকমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা আনার কথা ভাবছে, যদিও সেটি এখনো অনুমোদনের অপেক্ষায়।
এশিয়াতেও এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ইন্দোনেশিয়া ১৬ বছরের নিচের শিশুদের জন্য সামাজিকমাধ্যম ও কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করতে চায়।
মালয়েশিয়াও একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে।
অন্যদিকে তুরস্কে ১৫ বছরের নিচের শিশুদের জন্য সীমাবদ্ধতা আনার বিল ইতোমধ্যে পার্লামেন্টে পাস হয়েছে, এখন শুধু প্রেসিডেন্টের অনুমোদন বাকি।
মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোও পিছিয়ে নেই। পোল্যান্ড ও স্লোভেনিয়া ১৫ বছরের নিচের শিশুদের জন্য নতুন আইন তৈরির কাজ করছে।
এদিকে যুক্তরাজ্য এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। দেশটি ১৬ বছরের নিচের শিশুদের জন্য সামাজিকমাধ্যম নিষিদ্ধ করা উচিত কি না, তা নিয়ে অভিভাবক, তরুণ ও সমাজের বিভিন্ন অংশের মতামত নিচ্ছে।
সব মিলিয়ে বোঝা যাচ্ছে, শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা এখন বিশ্বজুড়ে বড় আলোচনার বিষয়। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ায় শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে ভাবার সময়ে এসেছে।