ডুমস্ক্রলিং থেকে সন্তানকে দূরে রাখার উপায়
এক সন্ধ্যায় রুমে ঢুকে মা দেখলেন, তার নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলে পড়ার টেবিলে বসে আছে। সামনে বই খোলা, কিন্তু চোখ মোবাইলের পর্দায়। একবার ফেসবুক, তারপর টিকটক, এরপর ইউটিউব শর্টস। এক ভিডিও থেকে আরেক ভিডিও, এক পোস্ট থেকে আরেক পোস্ট। দেখতে দেখতে দুই ঘণ্টা পার হয়ে গেল।
পরে মা জিজ্ঞেস করলেন, ‘এতক্ষণ কী দেখলে?’ ছেলেটি কিছুক্ষণ ভেবে বলল, ‘কী যে দেখলাম, ঠিক মনে নেই!’
এ দৃশ্য আজকাল অনেক পরিবারের কাছেই পরিচিত।
অনেক কিশোর-কিশোরী দিনের বড় একটা সময় মোবাইল স্ক্রল করে কাটায়। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এত সময় ব্যয় করার পরও তারা খুব একটা আনন্দ পায় না। বরং মন খারাপ, অস্থিরতা বা ক্লান্তি বেড়ে যায়। এই অভ্যাসেরই নাম ডুমস্ক্রলিং।
ডুমস্ক্রলিং কী
২০২০ সালে অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারিতে ‘ডুমস্ক্রলিং’ শব্দটি যুক্ত করা হয়। এর অর্থ হলো—মোবাইল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বারবার এমন খবর, ভিডিও বা পোস্ট দেখতে থাকা, যা উদ্বেগ, ভয় বা নেতিবাচক ভাবনা তৈরি করে।
সহজ ভাষায়, যখন কেউ একের পর এক পোস্ট বা ভিডিও দেখতে থাকে, কিন্তু আনন্দ না পেয়ে ক্লান্ত, হতাশ বা অস্বস্তি বোধ করে—তখন তাকে ডুমস্ক্রলিং বলা যায়।
তাই আপনার সন্তান যদি দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহার করে, কিন্তু তাতে আনন্দ, শেখা বা উপকারের চেয়ে বিরক্তি ও অস্থিরতাই বেশি বাড়ে, তাহলে তার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলা প্রয়োজন।
ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট অ্যাংলিয়ার শিক্ষা বিভাগের প্রভাষক ও ফলিত মনোবিজ্ঞানী ড. সাইমন পি. হ্যামন্ড। তিনি তরুণদের ওপর ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেন।
ড. সাইমন পি. হ্যামন্ড একবার বিবিসিকে বলেছিলেন, কিশোররা কেবল কোনো একটি অ্যাপের সঙ্গে লড়াই করছে না। তারা লড়াই করছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর তৈরি নানা মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের সঙ্গে।
তার ভাষায়, ‘এগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেন আমরা বেশি বেশি সময় স্ক্রিনে কাটাই।’
তবে ভালো খবর হলো, এই কৌশলগুলো সম্পর্কে জানা থাকলে আমরা নিজেদের সচেতনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।
কেন মোবাইল অ্যাপগুলো এত আকর্ষণীয়
বিষয়টি খুব সহজ।
যখন আপনার ফোনে একটি নোটিফিকেশন আসে। কৌতূহলবশত সেটি খুলে দেখেন। তারপর সেখানে নতুন কোনো ভিডিও, মন্তব্য বা বার্তা দেখতে পান। কেউ হয়তো আপনার পোস্টে লাইক দিয়েছে বা নতুন কিছু শেয়ার করেছে।
এই ছোট ছোট ঘটনাগুলো আমাদের মস্তিষ্কে ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি করে। ফলে আমরা বারবার ফোন হাতে নিতে চাই।
এভাবেই ধীরে ধীরে স্ক্রলিং একটি অভ্যাসে পরিণত হয়।
এভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনেক ফিচার আমাদের মনে এক ধরনের চাপ তৈরি করে। যেমন—২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্টোরি আপলোড, আকর্ষণীয় পোস্ট লেখার চাপ এবং বারবার নতুন আপডেট দেখার তাগিদ।
এসব কারণে অনেকের মনে হয়, ‘আমি যদি এখন ফোন না দেখি, তাহলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু মিস করে ফেলব।’
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ফেয়ার অব মিসিং আউট। এই ভয় থেকেই অনেকে বারবার ফোন চেক করে এবং আরও বেশি সময় স্ক্রিনে কাটায়।
ডুমস্ক্রলিং কেন ক্ষতিকর
অনেকে দুশ্চিন্তা কমাতে বা একঘেয়েমি কাটাতে ফোন হাতে নেয়। কিন্তু অনেক সময় উল্টো ফল হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত ডুমস্ক্রলিং উদ্বেগ, মানসিক চাপ, একাকিত্ব ও বিষণ্নতা বাড়াতে পারে। তাই যারা আগে থেকেই মানসিক চাপে থাকে, তাদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি।
এর পাশাপাশি আরও কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন—রাতে দেরি করে ঘুমানো, ঘুমের মান খারাপ হওয়া, সকালে ক্লান্ত লাগা, পড়ালেখা বা কাজে মনোযোগ কমে যাওয়া, স্মৃতিশক্তির ওপর প্রভাব পড়া।
তাই ডুমস্ক্রলিংকে কেবল সময় নষ্ট বলা যাবে না; এটি মানসিক সুস্থতার সঙ্গেও জড়িত।
সন্তানকে সাহায্য করার ৪টি উপায়
সচেতনভাবে স্ক্রল করা
সন্তানকে বলার আগে নিজেকে সচেতন হতে হবে। যখন আপনি ফোন ব্যবহার করবেন তখন বলুন, ‘আমি এখন দশ মিনিট ফেসবুক দেখব।’ শুনতে সাধারণ মনে হলেও এটি সন্তানকে এক ধরনের সচেতনতার বার্তা দেয়। সন্তানও বুঝতে শেখে যে, ফোন ব্যবহার করারও একটি সীমা থাকা উচিত।
অ্যালগরিদম নিজের পক্ষে আনুন
ফেসবুক, টিকটক বা ইউটিউব আপনি যেটা বেশি দেখেন, সেটাই দেখুন। তবে নেতিবাচক বা বিরক্তিকর কনটেন্ট দেখলে ‘Not Interested’ নির্বাচন করুন। আর যে কনটেন্ট ভালো লাগে, তা লাইক, সেভ বা শেয়ার করুন। তাহলে ধীরে ধীরে আপনার ফিড আরও ইতিবাচক হয়ে উঠবে এবং অ্যালগরিদম সেভাবেই আপনাকে নোটিফিকেশন দেবে।
প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো
ফোন বা অ্যাপের সময়সীমা নির্ধারণ করুন। প্রয়োজনে ঘুমানোর এক ঘণ্টা আগে ওয়াইফাই বন্ধ রাখুন। অনেক পরিবারে খাবারের সময় বা শোবার ঘরে ফোন ব্যবহারেরও নির্দিষ্ট নিয়ম থাকে। আপনার পরিবারের জন্যও এমন নিয়ম ঠিক করতে পারেন। আর অবশ্যই সবাইকে এটা মেনে চলতে হবে।
ভালো উদাহরণ তৈরি
সন্তানরা আমাদের কথা যতটা শোনে, তার চেয়ে বেশি দেখে। তাই আমরা যদি সারাক্ষণ ফোনে ব্যস্ত থাকি, তাহলে সন্তানকে ফোন কম ব্যবহার করতে বললে খুব একটা কার্যকর হবে না। এজন্য পরিবারে ফোন ব্যবহারের কিছু নিয়ম তৈরি করুন। যেমন—খাবারের টেবিলে ফোন নয়, ঘুমানোর আগে ফোন নয়, পরিবারের সবাই নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফোন ব্যবহার করবে। তাহলে বাকিদের দেখে সে-ও এভাবে অভ্যস্ত হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সন্তান কী দেখছে এবং অনলাইনে তার অভিজ্ঞতা কেমন সেগুলো নিয়ে নিয়মিত কথা বলা।
শেষ কথা হলো, ডুমস্ক্রলিং কেবল কিশোরদের সমস্যা নয়। বড়রাও এর শিকার হন। তাই সন্তানকে সাহায্য করার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো পুরো পরিবার মিলে স্বাস্থ্যকর ডিজিটাল অভ্যাস গড়ে তোলা।
ডুমস্ক্রলিং নিয়ন্ত্রণে মোবাইল কেড়ে নেওয়া কোনো সমাধান নয়। সন্তানকে এমনভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে শেখানো যেন প্রযুক্তি তাকে নিয়ন্ত্রণ না করে, বরং সেই প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।


