নাক সিঁটকানো থেকে বিশ্বজয়: মেকং থেকে যেভাবে বাঙালির পাতে পাঙ্গাস

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি ঢাকার কারওয়ান বাজারে। মাছের পাইকারি গলিতে বরফগলা পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, চারপাশের তীব্র আঁশটে গন্ধ আর মানুষের ব্যস্ততার মধ্যে এক কোণে চোখ আটকে যায়। সেখানে স্তূপ করে রাখা হাজারো মাছ। নীল প্লাস্টিকের ড্রাম ও ত্রিপলের ওপর রাখা চকচকে রুপালি-স্লেট রঙের মোটা পেটওয়ালা মাছগুলো দ্রুত তুলে দেওয়া হচ্ছে দাঁড়িপাল্লায়।

এখানে ইলিশের মতো মাছের চোখ দেখে দরদাম করার সময় নেই। বড় কথা হলো কাজের গতি আর ওজন। অল্প সময়ের মধ্যেই এসব মাছ চলে যাবে পুরান ঢাকার মেসে, তেজগাঁও বা সাভারের পোশাক কারখানার আশপাশের বাজারে, কিংবা নির্মাণশ্রমিকদের অস্থায়ী ডেরার পাশের দোকানে।

এটি পাঙ্গাস। এমন এক মাছ, যার নাম শুনে শহুরে বিত্তবান অনেকেই নাক সিঁটকান। অথচ দেশের কোটি সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের খাবারে প্রাণিজ আমিষের জোগানে এই মাছের ভূমিকা বিশাল।

বিত্তবানদের তাচ্ছিল্য, সাধারণ মানুষের আমিষ

পাঙ্গাসকে ঘিরে বাংলাদেশের সমাজে এক ধরনের অদ্ভুত বৈপরীত্য আছে। বিত্তবানদের খাবারের টেবিলে এই মাছ নিয়ে প্রায়ই তাচ্ছিল্যের সুর শোনা যায়। অনেকে বলেন, এতে আঁশটে গন্ধ, চর্বিও বেশি। রান্নার সময় তেল গলে ঝোল ভেসে যায়, মাংসও নাকি পানসে।

কেউ কেউ আবার মনে করেন, নোংরা পানিতে পচা খাবার খেয়েই এই মাছ বড় হয়।

কিন্তু এই ধারণার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে বড় এক অর্থনৈতিক ও পুষ্টিগত বাস্তবতা। গত তিন দশকে বাংলাদেশের খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তায় যে পরিবর্তন এসেছে, তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে পাঙ্গাস।

শুধু বাংলাদেশেই নয়, মেকং অববাহিকা থেকে আসা এই মাছ একসময় যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা পর্যন্ত আলোড়ন তুলেছিল। জন্ম দিয়েছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের দীর্ঘ ও তিক্ত এক লড়াইয়ের।

হারিয়ে যেতে বসা দেশি পাঙ্গাস

পাঙ্গাসের গল্প শুরু করতে হলে ফিরে যেতে হয় বাংলার নদীগুলোতে।

মৎস্য অধিদপ্তরের ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার গভীর পানিতে একসময় প্রচুর দেশি পাঙ্গাস পাওয়া যেত। এর বৈজ্ঞানিক নাম প্যাঙ্গাসিয়াস প্যাঙ্গাসিয়াস।

নদীমাতৃক বাংলায় দেশি পাঙ্গাস ছিল অসাধারণ এক মাছ। নদীর প্রবল স্রোতে বিচরণ করা ২০ থেকে ৪০ কেজি ওজনের বিশাল এই প্রাণি ছিল অনেকটা বিলাসী খাবারের অংশ। এর মাংসে ছিল নদীর পানির স্বাভাবিক সোঁদা স্বাদ, আর শরীরে থাকা তেলের স্বাদও ছিল আলাদা।

কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে পরিস্থিতি বদলে যায়। নদীদূষণ, নাব্যতা কমে যাওয়া, উজানে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ এবং অতিরিক্ত পোনা আহরণের কারণে দেশি পাঙ্গাসের প্রাকৃতিক আবাসস্থল নষ্ট হতে থাকে।

ফলে উন্মুক্ত নদীতে পাওয়া দেশি পাঙ্গাস ধীরে ধীরে বিরল হয়ে যায়। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিত্তবানদের খাবারের টেবিলেও নদীর দেশি পাঙ্গাসের দেখা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

মেকং থেকে ময়মনসিংহ

ঠিক এই সময়েই দেশের মানুষের বাড়তে থাকা আমিষের চাহিদা মেটাতে নতুন পথ খুঁজতে শুরু করেন নীতিনির্ধারক ও মৎস্য গবেষকেরা।

১৯৯০ সালের দিকে প্রাকৃতিক জলাশয় কমছিল, অথচ জনসংখ্যা বাড়ছিল দ্রুত। রুই, কাতলা ও মৃগেলের মতো প্রচলিত মাছের চাষ দিয়ে বিপুল মানুষের আমিষের চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছিল।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা নথি অনুযায়ী, এ সময় বিজ্ঞানীদের নজর পড়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মেকং ও চাও ফ্রায়া নদী অববাহিকার দিকে।

থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও লাওসের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া মেকং নদীর প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে, এমন একটি মাছকে তারা উপযুক্ত মনে করেন। এটি ছিল থাই পাঙ্গাস বা ডোরাকাটা ক্যাটফিশ। এর বৈজ্ঞানিক নাম প্যাঙ্গাসিয়ানডন হাইপোফথ্যালমাস।

১৯৯০ সালে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা থাইল্যান্ড থেকে এই মাছের প্রথম চালান ময়মনসিংহে নিয়ে আসেন। এরপর গবেষণাগারের কৃত্রিম জলাধারে কয়েক বছর ধরে চলে পর্যবেক্ষণ ও প্রজনন পরীক্ষা।

অবশেষে ১৯৯৩ সালে ময়মনসিংহের স্বাদুপানি কেন্দ্রে আসে বড় সাফল্য। বিজ্ঞানীরা সফলভাবে থাই পাঙ্গাসের কৃত্রিম প্রজনন করতে সক্ষম হন।

এই সাফল্যের পর পাঙ্গাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে দেশের মাছ চাষে। ময়মনসিংহের ত্রিশাল, মুক্তাগাছা ও ভালুকার কৃষকেরা নিচু ধানি জমি কেটে পুকুর তৈরি করতে শুরু করেন। যে জমিতে বছরে একবার আমন বা বোরো ধান হতো, সেখানেই গড়ে উঠতে থাকে বাণিজ্যিক মাছের খামার।

কেন এত দ্রুত জনপ্রিয় হলো পাঙ্গাস?

পাঙ্গাসের সাফল্যের পেছনে কোনো অলৌকিক স্বাদ ছিল না। ছিল এর অসাধারণ টিকে থাকার ক্ষমতা এবং সহজ অর্থনৈতিক হিসাব।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য গবেষকদের মতে, পাঙ্গাসের শরীরে একটি অতিরিক্ত শ্বাসযন্ত্র রয়েছে। এ কারণে পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ খুব কমে গেলেও এটি সরাসরি বাতাস থেকে অক্সিজেন নিয়ে টিকে থাকতে পারে।

বদ্ধ পানি কিংবা পানির তলায় জৈব বর্জ্য জমে থাকা প্রতিকূল পরিবেশেও তাই পাঙ্গাস তুলনামূলক সহজে বেঁচে থাকে।

অন্যদিকে পানিতে অক্সিজেন কমে গেলে রুই বা কাতলার মতো অনেক মাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। পাঙ্গাস সেখানে তুলনামূলকভাবে বেশি সহনশীল।

পাঙ্গাস দ্রুত বাড়েও। মৎস্য পুষ্টিবিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী, সাধারণ দানাদার খাবার খেয়েও এই মাছ দ্রুত ওজন বাড়াতে পারে।

মাত্র ছয় থেকে আট মাসের মধ্যে একটি ছোট পোনা এক থেকে দেড় কেজি ওজনের মাছে পরিণত হতে পারে।

বিশ্বমৎস্য সংস্থার বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে বাংলাদেশে বাণিজ্যিক মাছের খাবার তৈরির কারখানার যে বিস্তার ঘটে, তার পেছনে পাঙ্গাস চাষিদের ধারাবাহিক চাহিদার বড় ভূমিকা ছিল।

‘গরিবের প্রোটিন’ হয়ে ওঠার গল্প

পাঙ্গাসের দ্রুত বৃদ্ধি এবং তুলনামূলক কম চাষ ব্যয়ই তাকে সাধারণ মানুষের মাছ বানিয়ে দেয়।

মৎস্য অধিদপ্তরের মৎস্য উৎপাদনসংক্রান্ত বার্ষিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের চাষ করা মাছের উৎপাদনে তেলাপিয়ার পাশাপাশি পাঙ্গাসের অবস্থানও শীর্ষ পর্যায়ে।

যখন খাসি বা গরুর মাংস অনেক খেটে খাওয়া মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়, কিংবা এক কেজি ইলিশ বা বড় রুইয়ের দাম একজন দিনমজুরের দৈনিক আয়ের কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তখন পাঙ্গাস তুলনামূলক কম দামে বাজারে পাওয়া যায়।

ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া নিম্ন-মধ্যবিত্ত তরুণের মেসের খাবার, পোশাক কারখানার শ্রমিকের টিফিন কিংবা প্রান্তিক পরিবারের খাবারের তালিকায় পাঙ্গাস গুরুত্বপূর্ণ আমিষের উৎস হয়ে ওঠে।

শহুরে মধ্যবিত্তের চোখে যতই কম মর্যাদার হোক, সাধারণ মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির বাস্তবতায় পাঙ্গাসের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই।

মেকং থেকে বিশ্ববাজার, ভিয়েতনামের নতুন কৌশল

বাংলাদেশে পাঙ্গাস যখন মূলত সস্তা মাছ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠছিল, তখন মেকং নদীর অন্য প্রান্তে ভিয়েতনাম এই মাছকে দেখছিল ভিন্ন চোখে। তাদের লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক বাজার।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমা দেশের ভোক্তারা কাঁটাসহ পুরো মাছ কিনে রান্না করার চেয়ে কাঁটাবিহীন, চামড়াহীন ও সাদা মাংসের মাছ বেশি পছন্দ করেন।

ভিয়েতনাম সেই চাহিদা বুঝে মেকং অববাহিকার পাঙ্গাসকে বড় আকারে প্রক্রিয়াজাত করতে শুরু করে। মাছের চামড়া ছাড়িয়ে ও অতিরিক্ত চর্বি বাদ দিয়ে তৈরি করা হয় সাদা মাংসের কাঁটাবিহীন টুকরো।

আন্তর্জাতিক বাজারে এই মাছ ‘বাসা’ ও ‘সোয়াই’ নামে পরিচিতি পায়।

এই মাছের আরেকটি সুবিধা ছিল, এর মাংসে তীব্র নিজস্ব গন্ধ নেই। ফলে পশ্চিমা রান্নায় ব্যবহৃত বিভিন্ন সস ও মসলা সহজেই এর মাংসে মিশে যায়।

ভিয়েতনামের সামুদ্রিক খাদ্য রপ্তানিকারকদের তথ্য অনুযায়ী, দেশটি বর্তমানে বিশ্বের ১৪০টিরও বেশি দেশে হিমায়িত পাঙ্গাসের মাংস রপ্তানি করে। এর বার্ষিক বাজারমূল্য দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি।

ব্রিটেনে জনপ্রিয় মাছ ও আলুর ভাজা খাবারে দামি কড মাছের বিকল্প হিসেবেও এই মাছ জায়গা করে নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন দ্রুত খাবারের দোকানেও ভাজা মাছ তৈরিতে এর ব্যবহার বেড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হলো ‘ক্যাটফিশ যুদ্ধ’

বিশ্ববাজারে ভিয়েতনামের সস্তা পাঙ্গাসের এই সাফল্য অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় মাছ চাষিরা সহজে মেনে নেননি।

২০০০ সালের শুরুর দিকে মেকংয়ের এই মাছ মার্কিন বাজারে ঢুকতে শুরু করলে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের মাছ চাষিরা চাপে পড়ে যান।

মার্কিন কৃষি বিভাগ ও কংগ্রেসের নথি অনুযায়ী, মিসিসিপি, আলাবামা, আরকানসাস ও লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের বহু প্রজন্মের খামারি স্থানীয় ক্যাটফিশ চাষের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। এই শিল্প ছিল ওই অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

কিন্তু ভিয়েতনামের সস্তা পাঙ্গাস বাজারে আসার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। স্থানীয় মাছের তুলনায় প্রায় অর্ধেক দামে সুপারমার্কেটে পাওয়া যেতে থাকে মেকংয়ের মাছ।

ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে মার্কিন মাছ চাষিদের শক্তিশালী সংগঠন আমেরিকান ফিশারিজ সোসাইটি চাপ সৃষ্টি করে কংগ্রেসে। শুরু হয় দীর্ঘ বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক লড়াই, যা পরে ‘গ্রেট ক্যাটফিশ যুদ্ধ’ নামে পরিচিতি পায়।

২০০২ সালের কৃষি আইনে এমন একটি ধারা যুক্ত করা হয়, যাতে উত্তর আমেরিকার নিজস্ব ইকতালুরিদাই পরিবারের মাছ ছাড়া অন্য দেশের মাছের গায়ে ‘ক্যাটফিশ’ নাম ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়।

ফলে ভিয়েতনামের পাঙ্গাস যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ‘ক্যাটফিশ’ নামে বিক্রি করতে না পেরে ‘বাসা’ বা ‘ত্রা’ নামে বাজারজাত করতে বাধ্য হয়।

শুল্ক, কড়াকড়ি, তবু থামেনি পাঙ্গাস

নাম পরিবর্তন করেও যখন ভিয়েতনামের মাছের বিক্রি থামানো গেল না, তখন যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামি মাছের ওপর উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ করে।

পরে মাছ আমদানির নিরাপত্তা তদারকিতেও কড়াকড়ি বাড়ানো হয়। মাছ আমদানির পরিদর্শন ব্যবস্থার দায়িত্বও কঠোর নিয়মের আওতায় আনা হয়।

তবু সাশ্রয়ী দামের কারণে সাধারণ ভোক্তাদের কাছে পাঙ্গাসের চাহিদা কমানো যায়নি।

অর্থাৎ, আইন, শুল্ক ও বাণিজ্যিক বাধা দিয়েও একটি সস্তা ও সহজলভ্য মাছকে বিশ্ববাজার থেকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশের বড় উৎপাদন, কিন্তু রপ্তানিতে পিছিয়ে

পাঙ্গাসের বিশ্ববাজারের দিকে তাকালে বাংলাদেশের সাফল্যের পাশাপাশি একটি বড় আক্ষেপও সামনে আসে।

যে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ, সেই মাছকে প্রক্রিয়াজাত করে ভিয়েতনাম যেখানে শত শত কোটি ডলারের রপ্তানি বাজার তৈরি করেছে, বাংলাদেশ সেখানে এখনো মূলত স্থানীয় বাজারে পুরো মাছ বিক্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

বিশ্বমৎস্য সংস্থা ও স্থানীয় মৎস্য গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের পাঙ্গাস চাষিরা এখন নানা সংকটের মুখে।

আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন ও মাছের গুঁড়ার দাম বেড়ে যাওয়ায় মাছের খাবারের উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের সীমিত ক্রয়ক্ষমতার কারণে সেই অনুপাতে খামারিরা মাছের দাম পাচ্ছেন না।

ফলে অনেক চাষিই লোকসানে পড়ে খামার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

অন্যদিকে নিবিড় মাছ চাষে অপরিকল্পিতভাবে জীবাণুনাশক ওষুধের ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রজননকেন্দ্রের সনদ না থাকায় বাংলাদেশের পাঙ্গাস বিশ্ববাজারে রপ্তানির ক্ষেত্রেও বাধার মুখে পড়ছে।

সম্ভাবনা কি এখনো আছে?

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ যদি ভিয়েতনামের মতো পাঙ্গাসকে প্রক্রিয়াজাত করে হিমায়িত কাঁটাবিহীন মাংসে রূপান্তর করতে পারে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বড় বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এতে দেশের মৎস্য খাতে নতুন রপ্তানি সম্ভাবনা তৈরি হবে এবং নীল অর্থনীতিরও নতুন একটি ক্ষেত্র উন্মুক্ত হতে পারে।

কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা। এসব ক্ষেত্রে এখনো ঘাটতি রয়েছে।

শেষ পর্যন্ত পাঙ্গাস আসলে কী?

সব অর্থনৈতিক হিসাব, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লড়াই আর সামাজিক তাচ্ছিল্য এক পাশে রাখলে পাঙ্গাস শুধু একটি মাছ নয়, টিকে থাকার এক অসাধারণ গল্প।

এটি ইলিশের মতো আভিজাত্যের প্রতীক নয়। গভীর নদীর কোনো রূপকথার মাছও নয়।

মেকং অববাহিকা থেকে বাংলাদেশে আসা এই মাছ ময়মনসিংহের কাদামাটির পুকুরে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। গত তিন দশকে এটি কোটি মানুষের খাবারের টেবিলে তুলনামূলক সস্তায় প্রাণিজ আমিষ পৌঁছে দিয়েছে।

শহুরে খাবারের টেবিলে পাঙ্গাস নিয়ে যতই নাক সিঁটকানো হোক, সাধারণ মানুষের ক্ষুধা ও পুষ্টির সঙ্গে লড়াইয়ের ইতিহাসে এই মাছের অবদান উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

আর বিশ্ববাজারের দিকে তাকালে গল্পটি আরও বড়। একসময় যে মাছকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আইন বদলাতে হয়েছিল, সেই মাছই আজ আন্তর্জাতিক খাদ্যবাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পণ্য।