অ্যালার্ম ছাড়া ঘুম থেকে উঠতে পারছেন না? কাজে দিতে পারে যেসব কৌশল
সকাল সাড়ে ৮টা। ঢাকার মিরপুরের বাসায় ঘুম ভাঙল রাকিবের। চোখ মেলে ফোনের দিকে তাকিয়েই বুক ধক করে উঠল তার। অফিস শুরুর সময় হয়ে গেছে। প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৬টায় যে অ্যালার্মে তার ঘুম ভাঙে, সেটি আজ কখন বেজে বন্ধ হয়েছে, কিছুই মনে নেই। তাড়াহুড়ো করে তৈরি হয়ে বের হতে গিয়ে নাশতাও করা হলো না রাকিবের। রাস্তায় বেরিয়ে যানজটে আটকে বুঝলেন, আজ অফিসে পৌঁছাতে আরও অন্তত এক ঘণ্টা লাগবে।
রাকিবের মতো অনেকের কাছেই অ্যালার্ম ঘড়ি এখন ঘুম থেকে ওঠার অপরিহার্য সঙ্গী। রাতে দেরি করে ঘুমানো, বিছানায় যাওয়ার আগে দীর্ঘসময় ফোন ব্যবহার—সব মিলিয়ে সকালে নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠা অনেকের জন্যই কঠিন হয়ে উঠেছে।
এখন প্রশ্ন হলো—অ্যালার্ম ছাড়া কি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠা যায়?
এ নিয়ে সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে, কয়েকটি সহজ অভ্যাসের মাধ্যমে শরীরের নিজস্ব ‘অ্যালার্ম ঘড়ি’কে কিভাবে সক্রিয় করা সম্ভব।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অ্যালার্ম ছাড়া স্বাভাবিকভাবে ঘুম থেকে ওঠা কঠিন মনে হতে পারে। তবে ঘুমের সময় ঠিক রাখা, পর্যাপ্ত ঘুম, সকালে আলো পাওয়া এবং রাতে ঘুমের আগে কিছু অভ্যাস মেনে চললে এটি সম্ভব।
নিজের ওপর এক সপ্তাহের পরীক্ষা চালিয়ে পুরস্কারজয়ী লেখক ও সাংবাদিক অ্যালি হির্শল্যাগ তুলে ধরেছেন তার অভিজ্ঞতার কথা।
তিনি জানান, জীবনের বিভিন্ন সময়ে অ্যালার্মের ওপর তার নির্ভরতা বদলেছে। কিশোর বয়সে স্কুলে যাওয়ার দিনগুলোতে প্রায়ই অ্যালার্ম বাজার আগেই তার ঘুম ভেঙে যেত। নির্দিষ্ট রুটিনের কারণে সে সময় তার শরীরের নিজস্ব ‘অ্যালার্ম ঘড়ি’ বেশ ভালোভাবেই কাজ করত।
কিন্তু কলেজে গিয়ে অনিয়মিত সময়সূচির কারণে সেই অভ্যাস নষ্ট হয়ে যায়। তখন অ্যালার্মের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যায়। পরে চাকরিজীবনে আবার নিয়মিত ঘুমের সময়সূচিতে ফিরলে অ্যালার্ম ছাড়াই সহজে ঘুম থেকে উঠতে শুরু করেন।
তবে ৩০ এর মাঝামাঝি বয়সে এসে আবার অ্যালার্মের ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকে। ৪০ পেরোনোর পর রাতে সহজে ঘুম আসত না, আর সকালে ঘুম ঘুম ভাব কাটাতে নিয়মিত ক্যাফেইনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছিল।
এ অবস্থায় ঘুম বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে বেশ কিছু পরামর্শ নেন অ্যালি হির্শল্যাগ।
নিজের ঘুমের ছন্দ খুঁজে বের করুন
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগে নিজের স্বাভাবিক ঘুমের ছন্দ বা ‘স্লিপ রিদম’ খুঁজে বের করা উচিত। প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত এই অভ্যাস শরীরকে ধীরে ধীরে সেই সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে।
স্বাভাবিক ঘুমের ছন্দ বের করার আগে আপনার কতোক্ষণ ঘুম প্রয়োজন সেটা বের করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সাধারণভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন ৭-৯ ঘণ্টা ঘুমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে সবার প্রয়োজন এক নয়।
টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের স্লিপ ইনোভেশন ল্যাবসের সহযোগী পরিচালক ইতি বেন সিমন বলেন, ‘কারও ৭ ঘণ্টা ঘুমেই চলে, আবার কারও ৯ ঘণ্টা প্রয়োজন হতে পারে। বিষয়টি নিজস্ব জৈবঘড়ির ওপর নির্ভর করে।’
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্লিপ অ্যান্ড সার্কাডিয়ান রিসার্চ ল্যাবের সহপরিচালক হেলেন বার্গেস বলেন, ‘এমন সময়ে ঘুমাতে যেতে হবে, যাতে প্রয়োজনীয় সাড়ে ৮ ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ থাকে। নিয়মিত রুটিন শরীরকে ধীরে ধীরে আরাম করতে শেখায় এবং ঘুমের প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করে।’
আলো-অন্ধকারের সঙ্গে ঘুমের সমন্বয় করুন
ঘুমের সঙ্গে প্রাকৃতিক আলোর সম্পর্ক রয়েছে। আলো শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ির সঙ্গে ঘুমের সময়সূচির সমন্বয় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রিজেন্টস ইউনিভার্সিটি লন্ডনের মনোবিজ্ঞানী ও ঘুম বিশেষজ্ঞ আনা জয়েস বলেন, ‘আলো জৈবঘড়ির সবচেয়ে বড় নিয়ন্ত্রক। আলো শরীরকে জানান দেয় কখন জেগে থাকার সময় এবং কখন ঘুমের প্রস্তুতি নিতে হবে।’
বিশেষজ্ঞরা সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরপরই পর্দা খুলে প্রাকৃতিক আলো ঘরে ঢুকতে দেওয়ার পরামর্শ দেন। সকালের আলো শরীরে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে। এতে শরীর বুঝতে পারে, দিনের শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে ঘুমানোর প্রায় দুই ঘণ্টা আগে থেকে একটি নির্দিষ্ট ‘উইন্ড ডাউন রুটিন’ তৈরি করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা ঘরের আলো কমিয়ে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। এতে শরীর মেলাটোনিন তৈরি করার প্রস্তুতি নেয় এবং ঘুমের জন্য নিজেকে তৈরি করে।
ঘুম পেলে রাতের জামা পরা, দাঁত ব্রাশ করা ও ত্বকের যত্ন নেওয়ার মতো কাজগুলো আগে সেরে নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে বিছানায় যাওয়ার অভ্যাসও কাজে দিতে পারে।
শরীরের তাপমাত্রার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। রাতে শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা কমে আসে। ঘর বেশি গরম হলে ঘুমাতে বা ঘুম ধরে রাখতে সমস্যা হতে পারে। তাই রাতে ঘরের তাপমাত্রা আরামদায়ক রাখা দরকার।
ঘুমের বড় শত্রু স্মার্টফোন
ঘুমের ক্ষেত্রে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় বাধা স্মার্টফোন। বিশেষজ্ঞরা জানান, স্মার্টফোন থেকে বের হওয়া নীল আলো দিনের আলোর কাছাকাছি তরঙ্গদৈর্ঘ্যের হওয়ায় রাতে মস্তিষ্কে বিভ্রান্তিকর সংকেত পাঠাতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নীল আলো নয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘসময় ধরে স্ক্রল করার অভ্যাসও ঘুমের জন্য বড় সমস্যা। এ সমস্যা এড়াতে ফোনে অ্যাপ ব্যবহারে বাধা দেওয়ার জন্য আলাদা ডিভাইস ব্যবহার করতে পারেন। পাশাপাশি ফোনের ডিসপ্লে গ্রে-স্কেল বা সাদাকালো করে দেন, যেন ছবি ও ভিডিও কম আকর্ষণীয় মনে হয়।
এছাড়া প্রতিদিন সকালে কফি বা ক্যাফেইনের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঘুম বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে খাবার খাওয়া এবং ঘুমানোর অন্তত ৩ ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করা উচিত।
ঘুমের আগে অ্যালকোহল এড়িয়ে চলার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যালকোহল দ্রুত ঘুমিয়ে পড়তে সাহায্য করলেও পরে ঘুমের মান নষ্ট করতে পারে।
এক সপ্তাহের যে পরীক্ষা করতে পারেন
প্রথম রাত
প্রথম রাতে লক্ষ্য ঠিক করুন যে—আপনি ঠিক কখন ঘুমাতে যেতে চান।
যেমন, লেখক অ্যালি হির্শল্যাগ রাত সাড়ে ১১টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ার লক্ষ্য নেন। কিন্তু তার ঘুম আসতে আরও এক ঘণ্টা দেরি হয়।
রাতে কয়েকবার ঘুম ভাঙলেও সকালে ৮টার একটু আগে ঘুম ভেঙে যায়। তবে তিনি আরও কিছুক্ষণ বিছানায় থেকে সোয়া ৮টায় ওঠেন।
দ্বিতীয় রাত
দ্বিতীয় রাতেও একই সময়ে ঘুমাতে যান।
লেখক অ্যালি হির্শল্যাগের ওই রাতে ঘুম আসতে কিছুটা সমস্যা হয়। তিনি ফোন উল্টে রেখে গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েন। সকাল ৮টা ২০ মিনিটের অ্যালার্মের শব্দে তার ঘুম ভাঙে।
তৃতীয় রাত
তৃতীয় রাতে ১১টার দিকে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন এবং সকাল ৭টা ১০ মিনিটে স্বাভাবিকভাবেই ঘুম ভাঙে তার। এরপর
আর ঘুমানোর প্রয়োজন বোধ করেননি তিনি। তারপরও কিছুক্ষণ বিছানায় শুয়ে থেকে দেখেন—ফের ঘুম পাচ্ছে কি না।
চতুর্থ রাত
চতুর্থ দিন মধ্যরাতের আগেই ঘুমিয়ে পড়েন হির্শল্যাগ। সকাল ৬টা ৪৫ মিনিটে দরজায় ঘণ্টার শব্দে ঘুম ভাঙে তার। পরে আরও এক ঘণ্টা ঘুমান তিনি।
পঞ্চম রাত
পঞ্চম রাতে রাত সাড়ে ১১টায় ঘুমিয়ে সকাল ৮টা ১২ মিনিটে ঘুম ভাঙে হির্শল্যাগের।
ষষ্ঠ রাত
ষষ্ঠ রাতে সাড়ে ১২টায় ঘুমাতে যান হির্শল্যাগ। সেদিন তার জন্মদিন ছিল। ঘুম ভাঙে সকাল ৯টায়।
সপ্তম রাত
সপ্তম রাতে সাড়ে ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে সহজেই ঘুমিয়ে পড়েন হির্শল্যাগ। পরদিন সকাল ৮টা ৫ মিনিটে স্বাভাবিকভাবে ঘুম ভাঙে তার।
এক সপ্তাহের এই পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরদিন সকাল ৮টার কয়েক মিনিট পর স্বাভাবিকভাবে ঘুম ভাঙে হির্শল্যাগের। পরের সপ্তাহে খুব বেশি চেষ্টা করতে হয়নি তাকে। প্রায় একই সময়ে ঘুম থেকে উঠেন তিনি।
পরবর্তী সময়ে তিনি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত খাবারের সময় এবং ঘুমের আগে কম ফোন ব্যবহারের অভ্যাস ধরে রাখেন।
তিনি দেখেন যে, অন্তত ৮ ঘণ্টা ঘুম হলে অ্যালার্ম ব্যবহার ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে ঘুম ভাঙে তার।
কী শিখলেন?
পরীক্ষার শেষে লেখক বলেন, তার শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি পুরোপুরি নিখুঁত হয়ে যায়নি। তবে ফলাফল মোটের ওপর সফল ছিল।
তার মতে, সবচেয়ে বেশি কাজে দিয়েছে নিয়মিত ঘুমানোর সময় এবং ঘুমের আগে স্ক্রিন ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘুম বিশেষজ্ঞ বার্গেস বলেন, ‘জৈব ঘড়ির ছন্দ দ্রুত পরিবর্তন করা যায় না। তাই প্রতিদিন ঘুমানোর ও ওঠার সময় প্রায় আধা ঘণ্টা করে এগিয়ে এনে ধীরে ধীরে কাঙ্ক্ষিত সময়ে পৌঁছানোর চেষ্টা করা ভালো।’
অ্যালার্ম ছাড়া ঘুম থেকে উঠতে যা করতে পারেন
* প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যান।
* নিজের শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী ৭–৯ ঘণ্টা ঘুমের সুযোগ রাখুন।
* সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রাকৃতিক আলোতে যান।
* ঘুমানোর আগে অন্তত এক থেকে দুই ঘণ্টা আলো কমিয়ে দিন।
* ঘুমের আগে একটি শান্ত পরিবেশের রুটিন তৈরি করুন।
* রাতে স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার কমান।
* প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে খাবার খান।
* ঘুমানোর অন্তত তিন ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করার চেষ্টা করুন।
* ঘর ঠান্ডা রাখুন।
* অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন।
* নিজের শরীরের স্বাভাবিক ঘুমের ছন্দ বুঝতে সময় দিন।
জীবনে নানা ধরনের ব্যস্ততা, মানসিক চাপ ও অনিয়মের কারণে নিয়মিত ও গভীর ঘুম পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তবে ঘুমের সময়সূচিতে ছোট ছোট পরিবর্তনও এর মান উন্নত করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমকে ‘অন-অফ’ সুইচের মতো ভাবা ঠিক নয়। নিজের শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ বুঝতে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা বদলাতে সময় লাগে। তাই অ্যালার্ম ছাড়া ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করতে চাইলে ধৈর্য ধরে কিছুদিন নিয়মিত রুটিন মেনে চলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।