সিনেমার বাইরে আরডি বর্মণের আরেক জীবন
আশির দশকের গোড়ায় কলকাতার রেকর্ড দোকানে একটা নির্দিষ্ট মাস ছিল যার জন্য সারা বছর অপেক্ষা করত মানুষ। আশ্বিনের শুরু, পুজোর ঠিক আগে। শাটার খুলত ভোরবেলা, আর ভেতরে স্তূপ হয়ে থাকত নতুন রেকর্ড। হিন্দি সিনেমার গান নয়, বাংলা সিনেমার গানও নয়—স্রেফ একটা গান, কখনো দুটো। পেছনে কোনো গল্প নেই, নায়ক নেই, নায়িকা নেই। তিন-চার মিনিটের একটা কণ্ঠ, একটা সুর, আর তার সঙ্গে একটা গোটা শহরের সারা রাতের অপেক্ষা।
বাঙালি এই ফরম্যাটটাকে ডাকত পুজোর গান বলে। রাহুল দেব বর্মণ এখানে এমন কিছু কাজ করে গেছেন, যা আজ তার হিন্দি ফিল্মোগ্রাফির বিশাল ছায়ার নিচে প্রায় হারিয়ে গেছে।
১৯৬৯ সালে বেরোলো তার প্রথম পুজোর গান। শচীন ভৌমিকের কথা, নিজের সুর। নাম ‘মনে পড়ে রুবি রায়’। সেই বছরই বেরোয় ‘ফিরে এসো অনুরাধা’। দুটোই হিট। তারপর প্রায় প্রতি বছর এই কাজ চলতে থাকে—একটা না হলে দুটো, কোনো বছর তারও বেশি। আশা ভোঁসলের সঙ্গে একক বা দ্বৈত কণ্ঠে গাওয়া তার পুজোর গানের সংখ্যা শেষ অবধি দাঁড়ায় ৮৭টায়। প্রায় তিন দশক ধরে চলা একটা সমান্তরাল জীবন, যার হিসেব হিন্দি ফিল্মোগ্রাফির খাতায় ওঠে না কখনো।
ফিল্ম স্কোরে সুরকারের হাত বাঁধা থাকে নায়কের চরিত্রে, দৃশ্যের প্রয়োজনে, পরিচালকের চোখে। গান তখন গল্পের একটা অংশ মাত্র। পর্দায় একটা মুখ আছে, তার এক্সপ্রেশন আছে, সুরকে তার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হয় বাধ্য হয়ে। পুজোর গানে এই ব্যাপারটি নেই। তিন-চার মিনিটে নিজের একটা গোটা জগৎ বানানো, শুরু আর শেষ নিজের হাতে। আরডির জন্য এই জায়গাটা ছিল একরকম দম নেওয়ার সুযোগ।
‘মনে পড়ে রুবি রায়’ এই দম নেওয়ার প্রথম প্রমাণ। ট্র্যাজিক একটা প্রেমের গল্প, কিন্তু কোনো পর্দা নেই যেখানে গল্পটা ঘটছে। শ্রোতার নিজের কল্পনাই সেই পর্দা। তখনকার তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে গানটা যেভাবে বসে গিয়েছিল, তার পেছনে এই খোলা জায়গাটার ভূমিকা বড়। প্রতিটা শ্রোতা নিজের একটা রুবি রায় বসিয়ে নিতে পারত গানের ভেতর। ফিল্ম সং এই সুযোগ দেয় না; পর্দায় একটা মুখ আগে থেকেই বসানো থাকে।
‘ফিরে এসো অনুরাধা’-তে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথায় আরডি এমন একটা সুর বাঁধেন যা প্রায় প্রার্থনার মতো শোনায়। বিরহের গান, কিন্তু কোথাও বাড়াবাড়ি নেই। হিন্দি কাজে এই সংযম কমই মেলে, যেখানে অর্কেস্ট্রার জোর বেশি থাকে প্রায় সবসময়। এখানে বাজনা সরিয়ে রেখে গলার কাজটাই বড় করে তোলেন তিনি।
‘আমার মালতীলতা কী আবেশে দোলে’ গানে লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠ আর পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা মিলে তৈরি হয় একটা হালকা দোলা। লতা-পাতা-হাওয়ার চিত্রকল্প, প্রকৃতির ভাষায় বলা প্রেমের কথা। সুরের ভেতরের সেই দোলাটা অবশ্য চেনা বাংলা গানের চলন থেকে একটু আলগা—পশ্চিমা একটা ছোঁয়া এখানেও মিশে আছে, কিন্তু সেটা মেলোডির পেছনে লুকিয়ে, কখনো সামনে এসে দাঁড়ায় না। বাবার ঐতিহ্যের কাছাকাছি থেকেও আরডি এখানে নিজের একটা ছোট স্বাক্ষর রেখে যান, খুব নিঃশব্দে।
‘আকাশ কেন ডাকে’ গানে কিশোর কুমারের গলা অন্য একটা মেজাজ নিয়ে আসে। আকাশ, মেঘ, পথ—গৌরীপ্রসন্নর এই প্রতীকগুলো ঘিরে একটা অস্থির গান। কিশোরের গলায় যে নির্দিষ্ট ছটফটানিটা সবসময় থাকে, আরডি সেটাকেই টেনে নেন গানের কেন্দ্রে। শুনতে শুনতে মনে হয় গায়ক নিজেই পথ হারিয়েছে কোথাও। ‘একদিন পাখি উড়ে যাবে যে আকাশে’ গানটাও কিশোরের গলায়, মুকুল দত্তের লেখা, বিচ্ছেদের থিম এখানে আরও খোলাখুলি। পাখি আর আকাশ বাংলা গানে পুরোনো চিত্রকল্প, কিন্তু আরডি সুরে একটা উড়ে যাওয়ার ভঙ্গি জুড়ে দেন, যা শুধু কথা অনুসরণ করে না—নিজে থেকেও একটা দূরত্ব বানিয়ে ফেলে।
‘মাছের কাঁটা খোঁপার কাঁটা’ গানে আশা ভোঁসলে আর গৌরীপ্রসন্নর হাতে পুরো অন্য একটা রঙ। চপলতা, খুনসুটি, একটা চোখ-টেপা রসিকতা। বিষয় হালকা, সুরে একটা চটুল লাফ আছে, যা প্যান্ডেলে বাজার জন্যই যেন তৈরি। এই গানটাই দেখিয়ে দেয় পুজোর গান শুধু বিরহের জায়গা ছিল না কখনো। হাসির গান, রোমান্স, ছোট ছোট গল্পের গান—সবকিছুর জন্যই জায়গা ছিল এখানে।
আশির দশকে আরডি-আশার জুটি একটা বাঁক নেয় ‘তুমি কত যে দূরে গানে’। এর আগে পর্যন্ত পুজোর গানে যে পশ্চিমা ছোঁয়া ছিল, সেটা মেলোডির সঙ্গে মিলিয়ে চলত, ছায়ার মতো। এই গানে সেই ছায়াটাই সামনে চলে আসে। কম্পোজিশনটা শুনলে আজও অবাক লাগে, সময়ের তুলনায় কতটা এগিয়ে ছিল। আগের পুজোর গানগুলোর ধীর, মেলোডি-প্রধান চলন থেকে এখানে একটা স্পষ্ট সরে আসা। ছন্দে একটা তীক্ষ্ণ কোণ, বিন্যাসে একটা চাপা টেনশন—যে টেক্সচারটা আশির দশকের শুরুতে বিরল ছিল, পরের দশকগুলোর বাংলা আধুনিক গানে যা সাধারণ হয়ে যাবে।
বাজনার বিন্যাসে এখানে একটা শহুরে চটক আছে, তালের মাঝে ছোট ছোট থেমে যাওয়া আছে, যা শ্রোতাকে এক মুহূর্তের জন্য ধাঁধায় ফেলে দেয়, তারপর সুর আবার ফিরে আসে আরও জোরে। আশা আর আরডির কণ্ঠ-যুগলবন্দি এখানে নিজেদের পুরোনো ফর্মুলা থেকে সরে গিয়ে নতুন একটা জমিনে দাঁড়ায়, যেখানে রোমান্টিক ডুয়েটের চেনা ছকটাই বদলে যায় খানিকটা। পুজোর গান নিজের সীমার ভেতরেই একটা নতুন ভাষা পেয়ে যায় এই গানে, যেন ফিল্ম স্কোরের নিয়ম আর পুজোর গানের মেলোডি-নির্ভরতার মাঝখানে একটা তিন নম্বর রাস্তা খুলে যায় কিছুক্ষণের জন্য।
এই গানগুলো পাশাপাশি রাখলে একটা প্যাটার্ন ধরা পড়ে। হিন্দি কাজে যে পশ্চিমা প্রভাব, যে ইলেকট্রনিক এক্সপেরিমেন্ট, যে অপ্রচলিত শব্দ-উৎস আমরা দেখি আরডির হাতে, পুজোর গানে তার উপস্থিতি কম নয়—কিন্তু চরিত্রটা আলাদা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেই পশ্চিমা সুর বা রিদম মেলোডির সঙ্গে মিলিয়ে চলে, তাকে ছাপিয়ে যায় না, একটা সহযোগীর জায়গায় থেকে যায়। কিছু গানে অবশ্য এই নিরীক্ষা আরও খোলাখুলি হয়ে ওঠে, আর তখনই একটা বাঁকবদল ঘটে যায় পুরো ফরম্যাটে। মেলোডি সামনে, ভোকাল কেন্দ্রে, বাজনা সংযত—এই সাধারণ নিয়মটা ভাঙে না, কিন্তু তার ভেতরেও জায়গা থাকে নতুন কিছুর জন্য। এটা দুর্বলতা না। দুটো আলাদা শ্রোতার জন্য দুটো আলাদা ভাষায় কথা বলতে পারার ক্ষমতাটাই এখানে ধরা পড়ে, আর সেই ভাষার ভেতরেও থাকে নতুনত্বের জায়গা খুঁজে নেওয়ার ক্ষমতা।
পুজোর গান বাণিজ্যিকভাবে ফিল্ম স্কোরের সমান ছিল না কখনো। বক্স অফিস নেই এখানে, চার্ট নেই। ক্যাসেট আর রেকর্ডের কপি বিক্রি, আর প্যান্ডেলে কতবার বাজছে—এটাই ছিল সাফল্যের মাপকাঠি। বাবা শচীন দেব বর্মণ বাংলা গানের একটা শক্ত ভিত রেখে গিয়েছিলেন তার জন্য, এই কাজ চালিয়ে যাওয়ার পেছনে তার একটা টান অবশ্যই ছিল। কিন্তু তার চেয়েও বেশি যা মনে হয়, এই কাজে আরডি একটা সৃজনশীলতা ও আরাম খুঁজে পেতেন, যা হিন্দি ইন্ডাস্ট্রির চাপে পাওয়া কঠিন ছিল তার জন্য।
আশা ভোঁসলের সঙ্গে তার সম্পর্কের কথাটায় এখানে আসতেই হয়। দুজনের প্রথম কাজ ১৯৬৬ সালে, তিসরি মঞ্জিল ছবিতে। এরপর বছরের পর বছর পুজোর গানেও তারা জুটি বেঁধেছেন—বিয়ের আগে, বিয়ের পরেও। এই দীর্ঘ সহযোগিতার ভেতর কাজ আর আবেগ কোথায় আলাদা হয়ে যায়, বলা মুশকিল।
আজ এই গানগুলো শুনলে একটা অন্যরকম অনুভূতি হয়। ফিল্ম স্কোরের গান শুনলে সিনেমার দৃশ্য মনে পড়ে, নায়ক-নায়িকার মুখ। পুজোর গান শুনলে স্মৃতিটা অন্যরকম—শারদ সকালের আলো, রেডিওর শব্দ, প্যান্ডেলের ভিড়, একটা সারা শহরের একসঙ্গে গান শোনার মুহূর্ত। আরডি বর্মণ শুধু হিন্দি ছবির সুরকার থেকে গেলে এই জায়গাটা ফাঁকা থেকে যেত। বাংলার পুজোর এই বছরে-একবারের জার্নি তাকে বাণিজ্যিক চাপের বাইরে একটা গোটা সৃজনশীল জগৎ ধরে রাখার সুযোগ দিয়েছিল, আর সেই জগতের ভেতরেও দিয়েছিল নিজেকে নতুন করে ভাঙার একটা জায়গা।