মেজাজ ও ঘুমে শব্দদূষণের প্রভাব কতটা জানেন?
সহনীয় মাত্রার শব্দ বিরক্তি উদ্রেক করে না। শব্দ অত্যন্ত মধুর তখনই হয়, যখন সেটি আপনাকে আনন্দ দেয়। কিন্তু উচ্চমাত্রার শব্দ, যেটিকে আমরা বলি শব্দদূষণ, তা আপনার মেজাজ, ঘুম এমনকি সম্পর্কের ওপরে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ।
শব্দদূষণের কারণ
অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, শব্দদূষণের অন্যতম প্রধান কারণ হলো অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দুর্বল নগর ব্যবস্থাপনা। সড়কে যানবাহনে অতিরিক্ত হর্ন ব্যবহার, বিশেষ করে যানজটের সময় অপ্রয়োজনীয়ভাবে বারবার হর্ন বাজানো, শব্দদূষণের একটি বড় উৎস। এর পাশাপাশি আবাসিক এলাকায় দিনে-রাতে অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ, যেমন: ড্রিলিং, পাইলিং, ভারী যন্ত্রপাতি চালানো বা টাইলস কাটার ফলে সৃষ্ট শব্দদূষণ মারাত্মক ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে আবাসিক এলাকায় শিল্পকারখানা স্থাপন কিংবা বাজার ও বাণিজ্যিক এলাকায় উচ্চ শব্দে জেনারেটর চালানোর কারণেও পরিবেশে শব্দের মাত্রা বেড়ে যায়। সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে লাউডস্পিকার ও মাইক ব্যবহার করা হয়। এসব ক্ষেত্রে আশপাশের মানুষ, বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক, অসুস্থ ব্যক্তি, শিক্ষার্থীরা ভোগান্তিতে পড়েন। ব্যক্তিগত আনন্দ বা অনুষ্ঠানের গুরুত্ব অন্যের শান্তি ও স্বস্তির চেয়ে বেশি প্রাধান্য পায়।
শব্দদূষণ বেড়ে যাওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো জনসচেতনতার অভাব। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন ও বিধিবিধান থাকলেও অনেকেই সেগুলো সম্পর্কে জানেন না। আর জানলেও এর যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
শব্দদূষণ: মেজাজ, ঘুম ও সম্পর্কের ওপর প্রভাব
শব্দদূষণের কারণে ঘুম, মেজাজ ও সম্পর্কের ওপর প্রভাব প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, শব্দদূষণ শুধু কানের জন্য ক্ষতিকর নয়; এটি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। শব্দদূষণ ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়, মেজাজ খিটখিটে করে তোলে এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
মেজাজে প্রভাব
শব্দদূষণ মানুষের মেজাজ, আবেগ ও আচরণের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। আমাদের মেজাজ ও আবেগ শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অনুভূতির ওপর নির্ভর করে না; চারপাশের পরিবেশও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেমন: অতিরিক্ত শীতে, গরমে, অতিরিক্ত ভিড়ে মানুষের মেজাজ পরিবর্তন হয়। একইভাবে দীর্ঘদিন বা দীর্ঘসময় ধরে উচ্চমাত্রার শব্দের মধ্যে থাকলে মেজাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। যেমন:
অতিরিক্ত শব্দদূষণ মস্তিষ্কে চাপ সৃষ্টি করে, স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।
শব্দদূষণের কারণে মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায় এবং এর ফলে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়।
বিরক্তি, রাগ, অস্বস্তি, আক্রমণাত্মক আচরণ বাড়তে পারে।
এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে উদ্বেগ ও বিষণ্ণতার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
একইসঙ্গে মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি, কর্মক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে আচরণগত পরিবর্তন আসতে পারে। এর ফলে অফিসে সহকর্মীদের সঙ্গে অকারণে রাগারাগি, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ, ভুল বোঝাবুঝি কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে।
ঘুমে প্রভাব
ঘুমের সময় আশপাশে উচ্চমাত্রার শব্দ থাকলে তা স্বাভাবিক ঘুমের ছন্দ নষ্ট করে। যেমন: বিয়ের অনুষ্ঠান, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উচ্চস্বরে মাইক বা লাউডস্পিকার ব্যবহার, গভীর রাতে জোরে গান বাজানো, নির্মাণকাজের শব্দ ঘুমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যেমন:
শব্দদূষণের কারণে ঘুম আসতে দেরি হয়, বারবার ঘুম ভেঙে যায়।
গভীর ঘুমের পরিমাণ কমে যায়।
সকালে ক্লান্তি নিয়ে ঘুম ভাঙে, দিনের বেলা ঝিমুনি, অবসাদ, কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়।
দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যার কারণে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে উদ্বেগ, বিষণ্ণতা ও অন্যান্য মানসিক সমস্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
শব্দদূষণে অন্তঃসত্ত্বা নারীর ঘুমে ব্যাঘাত ঘটলে তা মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে গর্ভস্থ শিশুর বিকাশও ব্যাহত হতে পারে।
সম্পর্কে প্রভাব
শব্দদূষণের কারণে মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায়, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, রাগ বেড়ে যায়, সহনশীলতা কমে যায়। এর ফলে ব্যক্তির আচরণে পরিবর্তন আসে, যা সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অফিসে সহকর্মীদের সঙ্গে ঝগড়া, ভুল বোঝাবুঝি, দ্বন্দ্ব বাড়তে পারে।
দাম্পত্য সম্পর্কে উত্তেজনা, বিরক্তি ও সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হতে পারে।
মানসিক চাপের কারণে বাবা-মায়ের ধৈর্য কমে যায়। ফলে শিশুদের অকারণে বকা, ধমক দেওয়া, আঘাত করতে পারেন।
শব্দদূষণের কারণে শিশুর পড়ার ব্যাঘাত ঘটে, মনোযোগ নষ্ট হয়। এতে শিশুরও বিরক্তি বাড়তে পারে এবং বাবা-মায়ের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়তে পারে।
শব্দদূষণের কারণে শারীরিক ও মানসিকভাবে শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্করা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকে। এছাড়া অন্তঃসত্ত্বা নারীরাও ঝুঁকিতে রয়েছেন।
করণীয়
অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র—সবার সমন্বিত উদ্যোগ ও সচেতনতা জরুরি। অপ্রয়োজনীয়ভাবে গাড়ির হর্ন বাজানো থেকে বিরত থাকতে হবে এবং চালকদের এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে। কমিউনিটিতে এমন আচরণের চর্চা করতে হবে যাতে আপনার আনন্দ কিংবা অনুষ্ঠান আয়োজন কারো ব্যাঘাত না ঘটায়। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সময় শব্দের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে, বিশেষ করে রাতে। প্রয়োজনে বাড়িতে শব্দরোধী জানালা, দরজা বা পর্দা ব্যবহার করা যেতে পারে। একইভাবে অনুষ্ঠানস্থলও শব্দনিয়ন্ত্রণে উপযোগী উপকরণ ব্যবহার করা যেতে পারে।
পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করতে হবে, শব্দদূষণের কারণে মানসিক চাপ, উদ্বেগ বেড়ে গেলে প্রয়োজনে কাউন্সেলিং বা সাইকোথেরাপি নিতে হবে চিকিৎসকের পরামর্শে।
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে যে আইন আছে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে হবে। কোনো এলাকায় অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ, অপ্রয়োজনীয় হর্ন, লাউডস্পিকার বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, কমিউনিটি নেতাদের সাহসী ও সচেষ্ট হতে হবে। এলাকাভেদে শব্দদূষণের মাত্রা পরীক্ষা করে দেখতে হবে মাত্রা অতিক্রম করছে কি না। শব্দের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে।


