মশা কি আসলেই কিছু মানুষকে বেশি কামড়ায়?
এক সন্ধ্যায় পাঁচজন বন্ধু মিলে চায়ের দোকানে বসে বেশ জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছিল। দেখা গেল, কিছুক্ষণ পরপরই তাদের মধ্যে একজনকে বারবার মশা কামড়াচ্ছিল। বেচারা, মশার কামড়ে হাত-পা চুলকাচ্ছিল একটু পরপর। তখন এক বন্ধু হেসে বলে উঠল, ‘কীরে ভাই, তোর রক্ত মিষ্টি নাকি! আমাদের বাকি চারজনের কাউকেই তো একটা মশাও কামড় দিচ্ছে না, খালি তোকেই মশা কামড়াচ্ছে সেই তখন থেকে!’ কথাটা শুনে বন্ধুদের মধ্যে হাসির রোল পড়ে গেল।
বাস্তবে কি আসলেই কিছু কিছু মানুষের রক্ত মশার কাছে মিষ্টি মনে হয়, নাকি এর রয়েছে কোনো যৌক্তিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা? এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. রেজাউল করিম।
তিনি বলেন, ‘কোনো কোনো মানুষকে কেন মশা বেশি কামড়ায়, এই ব্যাপারে অনেকেই মনে করেন যে, রক্তের মধ্যে মশা মনে হয় মিষ্টি স্বাদ পায়। সত্যি বলতে, এই ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।’
কেন মশা কিছু মানুষকে অন্যদের তুলনায় বেশি কামড়ায়?
ডা. রেজাউল বলেন, মশা কিছু মানুষকে অন্যদের তুলনায় বেশি কামড়ানোর কারণ হিসেবে কিছু কারণ আছে।
রক্তের গ্রুপ
মশার ডিম উৎপাদনের জন্য প্রোটিন প্রয়োজন, যা সে আমাদের দেহের রক্ত থেকে সংগ্রহ করে। বিভিন্ন গবেষণার তথ্যের বরাতে ডা. রেজাউল বলেন, ‘মশা অন্যান্য ব্লাড গ্রুপের তুলনায় “ও” গ্রুপের রক্ত যাদের শরীরে রয়েছে, তাদের বেশি কামড় দিয়ে থাকে।’
‘কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এক জায়গায় “ও”, “এ” এবং “বি” ব্লাড গ্রুপের তিনজন ব্যক্তিকে রাখা হয়েছিল। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল, মশা শুধু “ও” ব্লাড গ্রুপের ব্যক্তিকেই কামড় দিচ্ছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে একই মশা ওই ব্যক্তিকে দুইবারও কামড় দিয়েছিল। অথচ সেখানে অন্য দুই ব্লাড গ্রুপের ব্যক্তিও উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তাদের একজনকেও একটি মশা কামড় দেয়নি। তবে এটি সবার ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য নয়’, বলেন এই চিকিৎসক।
তিনি জানান, কিছু কিছু মানুষের ত্বক থেকে এক ধরনের কেমিক্যাল সিগন্যাল নিঃসৃত হয়, যা মশাকে ব্লাড গ্রুপ শনাক্ত করতে সাহায্য করে। এ ধরনের ব্যক্তিদের বলা হয় ‘সিক্রেটরস’। রক্তের গ্রুপের নির্দিষ্টতা ছাড়াও মশা সাধারণত এ ধরনের মানুষদের (সিক্রেটরস) বেশি কামড় দিয়ে থাকে।
শরীরের তাপমাত্রা
মশা উষ্ণতা পছন্দ করে। তাই যাদের হাত-পা তুলনামূলকভাবে একটু গরম থাকে, তাদের মশা বেশি কামড়াতে পছন্দ করে। মশার অ্যান্টেনায় এক ধরনের বিশেষ ‘হিট সেন্সর’ থাকে। এর সাহায্যে মশা সহজেই মানুষের শরীরের তাপমাত্রা অনুভব করতে পারে।
অন্তঃসত্ত্বা নারী ও কার্বন ডাই-অক্সাইড
অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় নারীদের শরীরে রক্তের চলাচল অপেক্ষাকৃত বেশি হয়। এর ফলে শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা বেশি থাকে। এ সময় নারীরা সাধারণত বেশি পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃশ্বাসের সঙ্গে ত্যাগ করেন, যা মশাকে আকৃষ্ট করতে পারে। মশা যেখানে কার্বন ডাই-অক্সাইড বেশি নিঃসৃত হয়, সেই পরিবেশ পছন্দ করে এবং ওই ব্যক্তির কাছাকাছি যেতে চায়।
ত্বকের অনুজীব
আমাদের ত্বকে কিছু ব্যাকটেরিয়া ও অনুজীব থাকে, যেগুলো সাধারণত ‘কমেনসাল জীবাণু’ হিসেবে পরিচিত। ত্বকে কী ধরনের অনুজীব রয়েছে এবং সেগুলোর পরিমাণ কতটুকু—এর ওপর নির্ভর করে আমাদের শরীরের গন্ধের পরিবর্তন ঘটে। কিছু কিছু জীবাণু এমন এক ধরনের বিশেষ ঘ্রাণ তৈরি করে, যা মশাকে আকৃষ্ট করে। তাই যাদের শরীরে এ ধরনের গন্ধ থাকে, মশা তাদের বেশি কামড়াতে পছন্দ করে।
ঘামের উপাদান
আমাদের ঘামে কিছু রাসায়নিক উপাদান থাকে, যেমন: ল্যাকটিক অ্যাসিড, অ্যামোনিয়া ও ফ্যাটি অ্যাসিড। এসব উপাদানের একটি বিশেষ সংমিশ্রণ (কম্পোজিশন) থাকে। কিছু কিছু মানুষের শরীরে ল্যাকটিক অ্যাসিড, অ্যামোনিয়া ও ফ্যাটি অ্যাসিড মিলে এমন একটি বিশেষ গন্ধ তৈরি করে, যা মশার কাছে আকর্ষণীয়।
ডা. মো. রেজাউল করিম বলেন, পরিশেষে, কিছু কিছু মানুষের রক্ত মশার কাছে মিষ্টি মনে হয়—এমন ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক সত্যতা নেই। মূলত রক্তের গ্রুপ, শরীরের তাপমাত্রা, কার্বন ডাই-অক্সাইডের নিঃসরণ, ত্বকের অনুজীব এবং ঘামের উপাদানের মতো বিষয়গুলোই ব্যক্তিভেদে মশাকে আকৃষ্ট করে।

