যেভাবে শহরের অংশ হয়ে ওঠে একটি লাইব্রেরি
উইনিপেগ থেকে উত্তরের পথে প্রায় সাত ঘণ্টার ড্রাইভ, তারপরই থম্পসন—কানাডার ম্যানিটোবা রাজ্যের উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তম শহর। অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণে যার পরিচিতি ‘হাব অব দ্য নর্থ’ নামে। এই পথের আরও উত্তরে চার্চিল। বিশ্বজুড়ে যার খ্যাতি শ্বেতভালুকের জন্য।
থম্পসনকে অবশ্য আরও নানা নামে ডাকা হয়—‘নিকেল সিটি’ কিংবা ‘উলফ ক্যাপিটাল অব দ্য ওয়ার্ল্ড’। শহরের জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিকেল খনি আবিষ্কারের ইতিহাস। আর শহরের চারপাশে বিস্তৃত গভীর বোরিয়াল বনাঞ্চল। নেকড়ের আবাসস্থল এই বন। যদিও শহরের ভেতরে নেকড়ের দেখা মেলে না, তবু সময়ের সঙ্গে থম্পসনের পরিচয়ে জুড়ে গেছে ‘নেকড়ের রাজধানী’ নামটিও।
এই শহরের ইতিহাসে একটি লাইব্রেরির গল্পও কম আকর্ষণীয় নয়। বরং থম্পসনের ইতিহাসের সঙ্গে এই লাইব্রেরির বেড়ে ওঠার গল্পটিও যেন সমান্তরালে এগিয়ে চলেছে।
থম্পসন শহরের ইতিহাসে প্রথম লাইব্রেরির অস্তিত্ব পাওয়া যায় ১৯৬২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। এর কয়েক বছর আগে, ১৯৫৮ সালে নিকেল খনি আবিষ্কারের পর শহরে জনসংখ্যা ও কর্মসংস্থান দুটিই বাড়তে শুরু করে। সেই পরিবর্তনের সময়েই শহরের কয়েকজন নারী এগিয়ে আসেন একটি লাইব্রেরি গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়ে।
‘থম্পসন লেডিস কমিউনিটি ক্লাব’-এর একটি প্রকল্প হিসেবে শুরু হয় লাইব্রেরির কার্যক্রম। শুরুতে নম্বর ওয়ান স্কুলের একটি ছোট ঘরেই ছিল এর ঠিকানা। সংগৃহীত অধিকাংশ বই ছিল নাগরিকদের দান করা। আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরুর সময় সংগ্রহে ছিল মাত্র ৭০০ বই।
কিন্তু একটি শহরের মানুষ যখন কোনো স্বপ্নকে নিজেদের করে নেয়, তখন তার বিস্তার ঠেকিয়ে রাখা কঠিন। সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এক বছরের কিছুটা বেশি সময়ের মধ্যেই ১৯৬৩ সালের নভেম্বরে লাইব্রেরির বইয়ের সংগ্রহ বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫০০-তে। সদস্য সংখ্যা পৌঁছে যায় ৫৩২ জনে। আর স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছিলেন ৩০ জন নিবেদিতপ্রাণ মানুষ।
নম্বর ওয়ান স্কুলের ছোট একটি ঘর থেকে শুরু হওয়া থম্পসন পাবলিক লাইব্রেরির পরিসর দ্রুত বাড়তে থাকে। ১৯৬৫ সালের ডিসেম্বরে শহরের পৌরসভা আর্থিক উন্নয়নের বরাদ্দ থেকে পাওয়া অর্থের একটি অংশ লাইব্রেরির অবকাঠামোগত সম্প্রসারণে ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়। শুরু হয় নতুন ভবন নির্মাণের কাজ।
বছরখানেকের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হয়। ১৯৬৭ সালের ২২ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় নতুন লাইব্রেরি ভবন। অনুদানে পাওয়া মাত্র ৭০০ বইয়ের সংগ্রহশালার ছোট্ট একটি কক্ষ থেকে সম্পূর্ণ নিজস্ব ভবনে স্থানান্তর নিঃসন্দেহে বড় এক বিবর্তন।
এরপরও থেমে থাকেনি অগ্রযাত্রা। শহরের মানুষের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে, বাড়তে থাকে পাঠকের সংখ্যা ও বইয়ের সংগ্রহ। একসময় নতুন ভবনেও জায়গা সংকুলান না হওয়ায় ১৯৭৬ সালের নভেম্বরে নেওয়া হয় সম্প্রসারণের উদ্যোগ।
সেই বর্তমান লাইব্রেরি ভবনে বসেই এই লেখাটি লিখেছি।
আজ থম্পসন লাইব্রেরির সংগ্রহে প্রায় ৩০ হাজার বই। বিক্রি ও দান, দুই মাধ্যমেই এই সংগ্রহ সমৃদ্ধ হয়েছে। বছরে প্রায় ৬০ হাজার বইয়ের আদান-প্রদান হয়। পাশাপাশি ডিভিডি, বিভিন্ন ধরনের কার্ড, চাবির রিং, বুকমার্কসহ অন্যান্য সামগ্রীও পাওয়া যায় লাইব্রেরির অভ্যর্থনা ডেস্কে।
বইয়ের বাইরে যে লাইব্রেরি
২০০৬ সালে নিসিচওয়েসিহক ক্রি নেশন এবং থম্পসন পাবলিক লাইব্রেরির মধ্যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল নেলসন হাউসে ‘আতোস্কিউইন প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান’ নামে একটি কেন্দ্র গড়ে তোলা।
অলাভজনক এই প্রতিষ্ঠানটি নিসিচওয়েসিহক ক্রি নেশনের বাসিন্দাদের চাকরির প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য গড়ে ওঠে। ওই সময় উইসকোয়াটিম জলবিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপনের কাজ চলছিল। আতোস্কিউইন প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকে হাতে-কলমে শিক্ষা নিয়ে আগ্রহীরা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ শুরু করেন।
এরপর থেকে আজ পর্যন্ত এই প্রশিক্ষণকেন্দ্র অন্যান্য কর্মসংস্থানের জন্যও মানুষকে প্রস্তুত করতে সহায়তা করছে। বিশেষত মাধ্যমিক-পরবর্তী এবং ব্যবসায় প্রশাসনের শিক্ষার্থীদের জন্য।
পাঠের সঙ্গে জীবনের যোগ
অন্যান্য লাইব্রেরির মতো এখানেও কার্ডের ব্যবস্থা রয়েছে। অভ্যর্থনা ডেস্কে যোগাযোগ করলেই পরিচয়পত্র দেখে নতুন লাইব্রেরি কার্ড দেওয়া হয়।
তবে থম্পসন লাইব্রেরি কেবল বই ধার দেওয়ার জায়গা নয়। শিশু-কিশোরদের কারুশিল্প, গল্প বলা, বই পড়া, জন্মদিনের অনুষ্ঠানসহ নানা আয়োজনের কেন্দ্র এটি। লেখকদের বই প্রকাশনা অনুষ্ঠান, শিল্পীদের কর্মশালা কিংবা ব্যক্তিগত অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্যও রয়েছে মাল্টিপারপাস রুম।
কচিকাঁচাদের জন্য আলাদা সেকশন, কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধা, বিভিন্ন ডিভিডি, সিডি ও সফটওয়্যার ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। সুলভ মূল্যে বই কেনার সুযোগসহ বছরজুড়ে নানা আয়োজনে ব্যস্ত সময় কাটে লাইব্রেরির কর্মকর্তাদের।
রাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস, বিশ্বসাহিত্য, ভূগোল, ফিকশন ও নন-ফিকশন—প্রতিটি বিভাগের আলাদা সংগ্রহ বেশ গোছানো ও পরিপাটি। সাহিত্যচর্চায় মনোযোগী পাঠকের জন্য এখানে বইয়ের পাশাপাশি রয়েছে নানা ধরনের কর্মসূচি। গ্রীষ্মকালে শিশুদের বই পড়ার ক্লাব, যোগব্যায়াম, ব্রেসলেট বানানো, পাথরে রং করা, সেলাই, ফটোগ্রাফি, গল্প বলার ক্লাব, ফুলের টব রং করাসহ নানা আয়োজন থাকে।
শীতেও থেমে থাকে না কার্যক্রম। ক্রুশ-কাঠি বুননের ক্লাস, গেমিং ক্লাব, নেইলপলিশ ক্লাব, হাঁটাহাঁটি, জুয়েলারি বাক্সে রং করা, কাপড়ে রংতুলির কাজ, গল্প বলার ক্লাব, বিজ্ঞানের জগত, নার্ফ টুর্নামেন্ট—কত কী!
একটি লাইব্রেরি কীভাবে একটি শহরের সামাজিক জীবনের অংশ হয়ে উঠতে পারে, থম্পসন পাবলিক লাইব্রেরি তার একটি চমৎকার উদাহরণ।
প্রতিষ্ঠাকাল থেকে আজ পর্যন্ত নানাবিধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে লাইব্রেরিটি হাজারো মানুষের আস্থার জায়গায় পরিণত হয়েছে। এর পেছনে কর্মকর্তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের পাশাপাশি শুরু থেকেই ছিল সাধারণ মানুষের অকুণ্ঠ সহায়তা। সময়ের সঙ্গে এর ব্যাপ্তি শুধু বিস্তৃতই হয়নি, সমৃদ্ধও হয়েছে।
তবে কিছু সুযোগ-সুবিধা সীমিত। বিনামূল্যে ফটোকপি করা যায় না, পৃষ্ঠা-প্রতি দামও কিছুটা বেশি। লাইব্রেরি কার্ড দিয়ে বই ধার করা ছাড়া তেমন কিছু করা যায় না। তবে কম্পিউটার ব্যবহার ও ইন্টারনেট সুবিধা বিনামূল্যে।
বাংলাদেশ কী শিখতে পারে
থম্পসন পাবলিক লাইব্রেরি থেকে আমাদের দেশের লাইব্রেরিগুলোর শেখার মতো অনেক কিছুই আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, লাইব্রেরিকে তারা শুধু বই রাখার জায়গা হিসেবে দেখেনি। সারা বছর ধরে শিশু-কিশোরদের জন্য নানা আয়োজন করা যায়। আঁকাআঁকি, শব্দজট মেলানো, গল্প শোনা, কবিতা আবৃত্তিসহ নানা কর্মসূচির জন্য লাইব্রেরিতে আলাদা জায়গা তৈরি করা সম্ভব।
এসব কর্মকাণ্ড শুধু শিশুদের মানসিক বিকাশে সহায়ক হবে না, তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে বলব, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিসহ দেশের অন্যান্য লাইব্রেরিতে পাঠকের উপস্থিতি ছাড়া তেমন কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ে না। পাঠক আসেন, পড়েন, চলে যান। এই চিত্রের সঙ্গে আরও কিছু যোগ করা যায়। লাইব্রেরির উদ্যোগে বিষয়ভিত্তিক বিভিন্ন দিনে বিভিন্ন বিষয়ের বই পড়ার আয়োজন করা যেতে পারে। ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পাঠক্রম বাদ রাখাই ভালো। এতে অংশগ্রহণে ভিন্নতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
পাঠক নিজেদের ইচ্ছায় অংশ নেবেন। কাগজ-কলম রাখা থাকবে। পড়া শেষে যে যার মতামত লিখে জমা দেবেন। পরবর্তী সপ্তাহে তাদের মন্তব্যের ভিত্তিতে উত্তর, পরামর্শ বা আলোচনা করা যেতে পারে। এতে একদিকে পড়ার আগ্রহ বাড়বে, অন্যদিকে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানের চর্চাও হবে।
তা না হলে আমাদের দেশের লাইব্রেরিগুলো শুধু চাকরিপ্রত্যাশীদের সোনার হরিণ খোঁজার বিচরণক্ষেত্র হয়েই থেকে যাবে!
কানাডার প্রত্যন্ত এক শহরে শুরু হওয়া একটি লাইব্রেরি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার শাখা-প্রশাখা মেলে আজ মানুষের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তার দীর্ঘ যাত্রার গল্প শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের গল্প নয়, একটি শহরের মানুষের সম্মিলিত স্বপ্নের গল্প। আর সেই গল্প আমাদেরও একটি কথা শেখায়—একটি ছোট ঘর, কয়েকশো বই আর কিছু মানুষের আন্তরিকতা থেকেই শুরু হতে পারে বড় কোনো স্বপ্ন।
থম্পসন পাবলিক লাইব্রেরির ইতিহাস তাই শুধু বইয়ের ইতিহাস নয়। এটি মানুষের অংশগ্রহণের ইতিহাস, একটি শহরের বেড়ে ওঠার ইতিহাস। সবচেয়ে বড় কথা, এটি আমাদের স্বপ্ন দেখতে শেখায় এবং নিত্যনতুন স্বপ্নের বীজ বুনতে শেখায়।