নজরুল পরিচালিত ‘লাঙল’ পত্রিকার শতবর্ষপূর্তি

By সোমঋতা মল্লিক
28 December 2025, 12:59 PM
UPDATED 3 January 2026, 18:46 PM

শুনহ মানুষ ভাই— 

সবার উপরে মানুষ সত্য

তাহার উপরে নাই।

'লাঙল' পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যার শুরুতেই মুদ্রিত হত চণ্ডীদাসের এই অমর বাণী। শতবর্ষ আগে মানবতার জয়গান গেয়েই 'লাঙল'-এর পথচলা শুরু হয়। শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ সম্প্রদায়ের সাপ্তাহিক মুখপত্র  রূপে এই পত্রিকার আত্মপ্রকাশ।

পত্রিকার প্রধান পরিচালক ছিলেন মানবতাবাদী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। সম্পাদক, মুদ্রাকর ও প্রকাশক হিসেবে নাম ছাপা হতো করাচী সেনানিবাসে নজরুলের ফৌজি বন্ধু শ্রী মণিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের।

১৫ নং নয়ানচাঁদ দত্ত স্ট্রিট মেট্‌কাফ প্রেসে মুদ্রিত এবং ৩৭ নং হ্যারিসন রোড থেকে প্রকাশিত হতো 'লাঙল'। প্রতি সংখ্যার মূল্য এক আনা, বার্ষিক ৩ টাকা।

১৯২৫ সালের ২৫ নভেম্বর 'কালিকলম' পত্রিকার অন্যতম সম্পাদক মুরলীধর বসুকে নজরুল চিঠিতে লেখেন,

'..."লাঙলে"র ফাল আমার হাতে—লাঙলের শুধু বা কাঠেরটাই বেরোয় প্রথমবার। ...অফিসের দ্বারে একটা আস্ত লাঙল টাঙিয়ে দিতে বলেছি। ঐ হবে সাইনবোর্ড। বেশ হবে, না?'
১৩৩২ বঙ্গাব্দের পহেলা পৌষ, ১৯২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর, বুধবার—লাঙলের প্রথম খণ্ড বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। প্রথম সংখ্যায় উল্লেখ করা হয়, 'যেখানে দিন দুপুরে ফেরিওয়ালী মাথায় ক'রে মাটি বিক্রী করে, সেই আজব শহর কলিকাতায় "লাঙল" চালাবার দুঃসাহস যারা করে, তাদের সকলেই নিশ্চিত পাগল মনে করছেন। কিন্তু এই পাষাণ শহরেই আমরা "লাঙল" নিয়ে বেরুলাম। এই পাষাণের বুক চিরে আমরা সোনা ফলাতে চাই।'


লাঙলে কী কী থাকবে সেই বিষয়ে স্পষ্ট ধারনা দেওয়ার জন্য প্রথম সংখ্যাতে ছাপা হয়—

১. বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের কবিতা

২. ম্যাক্সিম গর্কীর জগৎ বিখ্যাত রোমাঞ্চকর উপন্যাস 'মা'র ধারাবাহিক অনুবাদ

৩. কার্ল মার্কসের জীবনী

৪. প্রজাস্বত্ব আইনের ধারাবাহিক আলোচনা

৫. গণআন্দোলন সম্বন্ধীয় পুস্তকের আলোচনা ও সংকলন

৬. প্রতি সংখ্যায় একটি ছবি

মানবতার পূজারী দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের অমূল্য কথা অত্যন্ত যত্ন সহকারে প্রথম সংখ্যায় মুদ্রিত হয়,

'এই যে বাঙ্গালার কৃষক সমস্ত দিন বাঙ্গালার মাঠে আপনার কাজ ও আমাদের কাজ শেষ করিয়া দিবাবসানে ঘর্মাক্ত কলেবরে বাঙ্গালার কুটীরে বাঙ্গলার গান গাহিতে গাহিতে ফিরিতেছে, তাহারা মুসলমান হউক, শূদ্র হউক, চণ্ডাল হউক, উহারা প্রত্যেকেই যে সাক্ষাৎ নারায়ণ।'

এই পত্রিকার অন্যতম আকর্ষণ ছিল নজরুলের কবিতা। সেসব কবিতায় নজরুলের কবি মানসের আশ্চর্য উত্তরণ ঘটেছিল। প্রথম সংখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছিল, 'এই সংখ্যায় লাঙলের সর্ব্ব প্রধান সম্পদ কবি নজরুল ইসলামের কবিতা সাম্যবাদী।'

পত্রিকার পাঠকপ্রিয়তার অন্যতম কারণ নজরুলের চিন্তাশীল লেখনী। দ্বিতীয় সংখ্যায় 'খড়কুটো' বিভাগে প্রকাশিত হয়, 'গতবার আমরা ৫ হাজার "লাঙল" ছেপেছিলাম—কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সমস্ত কাগজ ফুরিয়ে যাওয়াতে কলকাতায় অনেকে কাগজ পাননি এবং মফস্বলে একবারেই কাগজ পাঠানো হয়নি। ঐ সংখ্যার প্রধান সম্পদ কবি নজরুলের "সাম্যবাদী" গ্রাহকগণের আগ্রহাতিশয্যে পুস্তিকাকারে বের করা হ'ল, দাম করা হয়েছে মাত্র দু'আনা।'

লাঙল পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যায় নজরুলের কবিতা 'কৃষাণের গান', তৃতীয় সংখ্যায় 'সব্যসাচী', সপ্তম সংখ্যায় 'অশ্বিনীকুমার', নবম সংখ্যায় 'শ্রমিকের গান', দ্বাদশ সংখ্যায় 'জেলেদের গান', চতুর্দশ সংখ্যায় 'সর্ব্বহারা' প্রকাশিত হয়—যা প্রকৃত অর্থেই তৎকালীন সমাজকে প্রতিফলিত করে।

১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে ১৭ ও ১৮ জানুয়ারি ময়মনসিংহ শহরে ময়মনসিংহ জেলা কৃষক-শ্রমিক সম্মিলন অনুষ্ঠিত হয়; সেই উপলক্ষে কবি কৃষ্ণনগর থেকে এই পত্রখানি লেখেন। হেমন্তকুমার সরকার তা সম্মেলনে পাঠ করেন। লেখাটি 'লাঙল'-এর প্রথম খণ্ড পঞ্চম সংখ্যায় প্রকাশিত হয়—

'আমার প্রিয় ময়মনসিংহের প্রজা ও শ্রমিক ভ্রাতৃবৃন্দ!'

আপনারা আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। আমার আন্তরিক ইচ্ছা ছিল, আপনাদের এই নব জাগরিত প্রাণের স্পর্শে নিজেকে পবিত্র করিয়া লইব, ধন্য হইব। কিন্তু দৈব প্রতিকূল হওয়ায় আমার সে আশা পূর্ণ হইল না। আমার শরীর আজও রীতিমতো দুর্ব্বল, এক স্থান হইতে অন্য স্থানে যাইবার মত শক্তি আমার একবারেই নাই। আশা করি আমার এই অনিচ্ছাকৃত অক্ষমতা সকলে ক্ষমা করিবেন। ...আপনারাই দেশের প্রাণ, দেশের আশা, দেশের ভবিষ্যৎ।

মাটির মায়ায় আপনাদেরই হৃদয় কানায় কানায় ভরপুর। মাটির খাঁটি ছেলে আপনারাই। রৌদ্রে পুড়িয়া বৃষ্টির জলে ভিজিয়া-দিন নাই রাত নাই—সৃষ্টির প্রথম দিন হইতে আপনারাই তো এই মাটির পৃথিবীকে প্রিয় সন্তানের মত লালন পালন করিয়াছেন, করিতেছেন ও করিবেন। আপনাদের মাঠের এক কোদাল মাটী লইলে আপনারা আততায়ীর হয় শির লেন কিংবা তাকে শির দেন। এত ভালোবাসায় ভেজা যাদের মাটী, এত বুকের খুনে উর্ব্বর যে শস্যশ্যামল মাঠ, আপনারা আমার কৃষাণ ভাইরা ছাড়া তাহার অন্য অধিকারী কেহ নাই। আমার এই কৃষাণ ভাইদের ডাকে বর্ষায় আকাশ ভরিয়া বাদল নামে, তাদের বুকের স্নেহধারার মতই মাঠ-ঘাট পানিতে বন্যায় সয়লাব হইয়া যায়, আমার এই কৃষাণ ভাইদের আদরে সোহাগে মাঠ-ঘাট ফুলে ফলে ফসলে শ্যাম-সবুজ হইয়া উঠে। আমার কৃষাণ ভাইদের বধূদের প্রার্থনায় কাঁচা ধান সোনার রঙে রাঙিয়ে উঠে। এই মাঠকে জিজ্ঞাসা করো, মাঠে ইহার প্রতিধ্বনি শুনিতে পাইবে, এ মাঠ চাষার, এ মাটী চাষার, এর ফুল-ফল কৃষক-বধূর।


আর আমার শ্রমিক ভাইরা, যাহারা আপনাদের বিন্দু বিন্দু রক্ত দান করিয়া হুজুরদের অট্টালিকা লালে লাল করিয়া তুলিতেছে, যাহাদের অস্থি মজ্জা ছাঁচে ঢালিয়া রৌপ্য মুদ্রা তৈরি হইতেছে, যাহাদের চোখের জল, সাগরে পড়িয়া মুক্তামাণিক ফলাইতেছে, তাহারা আজ অবহেলিত, নিষ্পেষিত, বুভুক্ষু। তাহাদের শিক্ষা নাই, দীক্ষা নাই, ক্ষুধায় পেট পুরিয়া আহার পায় না, পরনে বস্ত্র নাই।


হায় রে স্বার্থ! হায় রে লোভী দানব-প্রকৃতির মানব! আজ কৃষাণের দুঃখে শ্রমিকের কাৎরাণীতে আল্লার আরশ কাঁপিয়া উঠিয়াছে। দিন আসিয়াছে, বহু যন্ত্রণা পাইয়াছ ভাই, এইবার তাহার প্রতিকারের ফেরেশতা দেবতা আসিতেছেন। তোমাদের লাঙল,  তোমাদের শাবল তাঁহার অস্ত্র, তোমাদের কুটির তাঁহার গৃহ! তোমাদের ছিন্ন মলিন বস্ত্র তাঁহার পতাকা। তোমরাই তাঁহার পিতা-মাতা। আমি আপনাদের মাঝে সেই অনাগত মহাপুরুষের শুভ আগমন প্রতীক্ষা করিয়া আপনাদের নবজাগরণকে সালাম করিয়া নির্নিমিষ দৃষ্টিতে তাকাইয়া আছি, ঐ বুঝি নব দিনমণির উদয় হইল!'

'নতুন ভারত' সম্পর্কে স্বামী বিবেকানন্দের ভাবনা লাঙলের তৃতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। 'তোমরা শূন্যে বিলীন হও, আর নূতন ভারত বেরুক। বেরুক লাঙ্গল ধরে, চাষার কুটীর ভেদ করে, জেলে মালো, মুচি, মেথরের ঝুপড়ির মধ্য হতে। বেরুক মুদীর দোকান থেকে, ভুনাওয়ালার উনুনের পাশ থেকে।'

লাঙল পত্রিকার পঞ্চম সংখ্যা বাংলা মায়ের কৃতী সন্তান সুভাষচন্দ্র বসুকে নিবেদন করা হয়েছিল।

চতুর্থ সংখ্যায় লেখা হয়েছিল, 'আগামী বারে জনৈক কারারুদ্ধ আদর্শ দেশ ভক্তের পুণ্য-চরিত্র চিত্রনে লাঙলের বিশেষ সংখ্যা বাহির হইবে।'

পঞ্চম সংখ্যায় সুভাষচন্দ্রকে আসন্ন জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে লেখা হয়, 'আগামী ২৩শে জানুয়ারী সুভাষচন্দ্র ত্রিংশৎ বর্ষে পদার্পণ করবেন। তিনি শীঘ্র কারামুক্ত হয়ে এসে সহায়হীন শ্রমিক ও কৃষকদের মুক্তিপথে অভিযানের সেনাপতিত্ব গ্রহণ করুন এবং সফলকাম হয়ে শত বর্ষ পরমায়ু লাভ করুন, তাঁর ত্রিংশ জন্মদিনে আমাদের এই শুভেচ্ছা।'

পত্রিকার শুরুতে সুভাষকে নিয়ে 'জন্মোৎসবে' শিরোনামে কবিতা লেখেন শ্রী নরেন্দ্র দেব। সুভাষের বাল্যকথা, সুভাষচন্দ্রের পত্রাবলী, দেশবন্ধু সম্বন্ধে কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে লিখিত সুভাষচন্দ্রের চিঠি, এমনকি সুভাষের রাশিচক্রও প্রকাশিত হয়। সুভাষকে নিবেদিত এই বিশেষ সংখ্যায় কবিগুরুর লেখা প্রকাশিত হয়—

বন্ধন, পীড়ন, দুঃখ, অসম্মান মাঝে
হেরিয়া তোমার মূর্ত্তি কর্ণে মোর বাজে
আত্মার বন্ধনহীন আনন্দের গান,
মহাতীর্থ যাত্রীর সঙ্গীত, চিরপ্রাণ
আশার উল্লাস, গম্ভীর নির্ভয় বাণী
উদার মৃত্যুর।

পরবর্তী সংখ্যায় সুভাষচন্দ্রের বিলাতের পত্রাবলী প্রকাশিত হয়। 'লাঙল' পত্রিকার ত্রয়োদশ সংখ্যায় 'রবীন্দ্রনাথের আশীর্ব্বচন' সর্বাগ্রে মুদ্রিত হয়—

জাগো জাগো বলরাম
ধরো তব মরুভাঙা হল।
বল দাও ফল দাও
স্তব্ধ কর ব্যর্থ কোলাহল।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

এ ছাড়া, বিভিন্ন সংখ্যায় শ্রী নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় কৃত ম্যাক্সিম গর্কীর জগৎ বিখ্যাত উপন্যাস 'মা'র বাংলা অনুবাদ, শ্রী দেবব্রত বসুর লেখা 'লেনিন ও সোভিয়েট রুষিয়া', শ্রী সুকুমার চক্রবর্ত্তী ও শ্রী সুরেশ বিশ্বাসের লেখা 'চীনের নবজন্ম' ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। শ্রী হেমন্ত কুমার সরকার, সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, মুজফ্‌ফর আহ্‌মদসহ অনেকের লেখাই 'লাঙল' পত্রিকায় ছাপা হয়। ভারতীয় প্রথম কমিউনিস্ট কনফারেন্স, বগুড়া জেলা প্রজা কনফারেন্স, ময়মনসিংহ জেলা কৃষক শ্রমিক সম্মিলন, নিখিল বঙ্গীয় প্রজা সম্মিলনসহ তৎকালীন সময়ে অনুষ্ঠিত বহু সম্মেলনের খবর প্রকাশিত হতো 'লাঙল' পত্রিকায়।

পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপন বিশেষ গবেষণার দাবি রাখে। পরাধীন ভারতবর্ষে স্বদেশি ব্যবসার খবর অতি যত্নে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হতো।

১৯২৬ সালের ৬ মার্চ বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিক দলের সাহায্যের জন্য কলকাতার এলবার্ট হলে (বর্তমান কফি হাউস) অনুষ্ঠিত বসন্ত-উৎসবের বিজ্ঞাপন ছাপা হয় 'লাঙল' পত্রিকায়। অপর একটি বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে, 'শ্রমিক-সাহিত্য, সমাজ-বিজ্ঞান ও রাষ্ট্র-বিজ্ঞান বিষয়ক যাবতীয় পুস্তক সরবরাহ করার জন্যে লেবার বুক এজেন্সী শীঘ্রই খোলা হবে।'

স্বাধীনতা সংগ্রামের মহান বিপ্লবী, অধ্যাত্ম সাধক, সঙ্ঘগুরু শ্রীশ্রী মতিলাল রায় ছিলেন প্রবর্ত্তক সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা। নজরুলের সঙ্গে প্রবর্ত্তক সঙ্ঘের ভালোই যোগাযোগ ছিল। মতিলাল রায়কে লেখা নজরুলের চিঠি, চন্দননগরে প্রবর্ত্তক সঙ্ঘে 'বিদ্রোহী' কবির একাধিকবার যাওয়া—এসবই প্রমাণ করে মতিলাল রায়ের সঙ্গে নজরুলের ঘনিষ্ঠতার কথা।

৬৬ নং মাণিকতলা স্ট্রিট, কলকাতা—এই ঠিকানায় অবস্থিত প্রবর্ত্তক পাবলিশিং হাউজ থেকে প্রকাশিত 'প্রবর্ত্তক'-এর বিবেকানন্দ সংখ্যার বিজ্ঞাপনও 'লাঙল' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

এভাবেই শতবর্ষ আগে প্রণম্য বাঙালিদের প্রজ্ঞাকে সঙ্গী করে সমাজের কৃষক ও শ্রমিক দলের কল্যাণার্থে চেতনার কবি কাজী নজরুল ইসলামের পরিচালনায় 'লাঙল' পত্রিকা তৎকালীন সমাজে এক অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করে।

সোমঋতা মল্লিক, নজরুল সঙ্গীতশিল্পী এবং সভাপতি, ছায়ানট (কলকাতা)