জসীম উদ্দীনের নিজস্বতা
জসীম উদ্দীনের অবিতর্কিত কাব্যপ্রতিভা দ্বিগুণ রূপে প্রতিনিধিত্ব করেছে একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক চেতনা ও পরিস্থিতির। শুধু প্রতিনিধিত্ব নয়, তিনি পরিতৃপ্তও করেছেন একটি সাংস্কৃতিক প্রয়োজনকে। তার কাব্যপাঠকালে তাই রচনার শিল্পমূল্যের সঙ্গে সাংস্কৃতিক মূল্যকেও সন্নিহিত করে নেওয়া প্রয়োজন।
পল্লীকবি বলা হয়েছে তাকে। তার পটভূমি গ্রামীণ। পল্লী থেকে সংগ্রহ করেছেন তিনি তার উপাদান ও উপকরণ। কিন্তু শুধু বিষয়বস্তুতে নয়, প্রকাশেও তিনি গ্রামীণ। বাংলার পল্লী যেমন স্বতন্ত্র শহর থেকে, তেমনি স্বতন্ত্র কবি জসীম উদ্দীন আধুনিক কবিতার ধারা থেকে—বিষয়ে এবং বিষয়ের প্রকাশে।
এমনিতেই গ্রাম থাকে উপেক্ষিত, সেই উপেক্ষিতের মধ্যে যারা সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত, দরিদ্র, প্রায় নিরন্ন মানুষ—তাদের কাহিনী জসীম উদ্দীন নিয়ে এসেছেন বাংলা কাব্যে। কাব্যের ধারাকে সমৃদ্ধতর করেছেন তিনি, কিন্তু তার কবিতা আধুনিক কবিতার ধারার অন্তর্গত হয়ে যায়নি। যেমন করে গ্রামের নব্যাগন্তুক শহরে এলেই হঠাৎ করে শহুরে হয়ে যায় না, এমনকি পোশাক বদলালেও চেতনা- অভ্যাস থাকে ভিন্নতর।
জসীম উদ্দীনের কবিতা এমনকি পোশাকও বদলায়নি, চেতনা বা অভ্যাস বদল তো দূরের কথা। সেই জন্য তাকে চিনে নিতে ভুল হয় না, বিলম্ব হয় না এক মুহূর্ত। তিনি অনুকারক নন, নিজের পরিচয়ে এসেছেন, সেই পরিচয়েই সম্মানিত, এবং প্রতিষ্ঠিত।
শত শত বছর ধরে নিশ্চল হয়ে আছে যে- গ্রাম, এদেশের প্রধান শক্তি যেখানে নিহিত, নিহিত যেখানে প্রধান দুর্বলতাও, সেই সামন্তবাদী শাসনে ও পুঁজিবাদী অবরোধে জর্জরিত, জীবনে উপেক্ষিত, সাহিত্যে অবহেলিত গ্রামের মানুষকে নিয়ে এলেন জসীম উদ্দীন অনস্বীকার্য সংবদেনশীলতা ও কাব্যশক্তির সঙ্গে।
পল্লীতে যে প্রকৃতি আছে, যে-প্রকৃতি বিজিত হয়নি, বিজয়ী যে আসলে, সেই প্রকৃতি উজ্জ্বল হয়ে আছে তার কাব্যে, কিন্তু প্রকৃতির কবি নন। তিনি, কবি মানুষেরই। এবং প্রকৃতির কাছে যে গেছেন, যতটা গেছেন, সেও কোনো তাত্ত্বিক বা দার্শনিক অনুপ্রেরণায় নয়, প্রকৃতি তার অভিজ্ঞতার অংশ বলেই। অভিজ্ঞতা, অনুভব ও কল্পনা—সবই তার পল্লীকে ঘিরে।
কিন্তু প্রকৃতির চেয়ে মানুষ বড় তার কাছে। মানুষকেই দেখছেন প্রধানত, প্রকৃতি মানুষের জীবনের অঙ্গ বলেই গুরুত্ব পাচ্ছে। সেই মানুষেরা, জসীম উদ্দীনের মানুষেরা, কৃষক, জেলে, বেদে—সাধারণ মানুষ। কবি বিশেষ করে দেখছেন তাদের আবেগকে, অত্যন্ত প্রাথমিক ও প্রবল তাদের আবেগকে।
জসীম উদ্দীনের দেখার দৃষ্টি একদিকে সহানুভূতিতে পরিপূর্ণ, অন্যদিকে ইহজাগতিকতার দ্বারা চিহ্নিত। তিনি অসাম্প্রদায়িক ও লৌকিক। মানুষের জাগতিক দুঃখের কবি তিনি, মানুষে মানুষে তফাৎ করেন না, যে দৃষ্টিতে দেখেন নমশুদ্রকে, সেই একই দৃষ্টিতে মুসলমানকে।
বিশেষ করে দেখেছেন জসীম উদ্দীন মেয়েদেরকে। দুঃখীদের মধ্যেও দুঃখী তারা। জীবনের ও সমাজের ঝড়-ঝাপটা তাদের ওপর দিয়েই যায় প্রথমে, যায় সবচেয়ে প্রচণ্ড শক্তিতে। নারীর অনুভব তাই গভীরতর। সে অনুভব পথ পায় না প্রকাশের, আপনার চারদিকে অস্থির হয়ে বৃত্তাকারে ঘোরে। জসীম উদ্দীন এই অপ্রকাশিতকে পথ দিয়েছেন প্রকাশের। নারীতে-প্রকৃতিতে নৈকট্য উজ্জ্বল হয়ে প্রকাশ পেয়েছে তার লেখায়।
পল্লী বাংলা যেন অপেক্ষা করছিল এই কবির জন্য, তার এই মুখপাত্রের জন্য, যিনি কথা বলবেন পল্লীর আবেগ ও কল্পনা নিয়ে। জসীম উদ্দীনের অভিজ্ঞতার মতো তার আবেগ ও কল্পনা উভয়েই গ্রামীণ। এখানে তিনি স্বতন্ত্র আধুনিক কবিদের থেকে, এমনকি তাদের থেকেও যারা কবিতা লিখেছেন গ্রামকে নিয়ে। যেমন লিখেছেন জীবনানন্দ, যিনি গ্রামীণ নন, আধুনিক। বহু যুগের ও দেশের ইতিহাসে আগ্রহ তার, মন ও দৃষ্টি পরিশীলিত। জীবনানন্দ আসলে বিপ্রতীক।
জসীম উদ্দীন গ্রামকে দেখেন গ্রামের মানুষের মতো। তার আবেগ প্রবল, থরথর করে কাঁপেন তিনি সেই আবেগে। আর এ আবেগ যেন ব্যক্তিগত নয়, তার একার নয়—সমষ্টিগত, সমূহ আবেগ যেন একটি, যেন সে নিজেকে ব্যক্ত করছে তার মধ্য দিয়ে, যেন মাধ্যম তিনি।
তার কল্পনাও তাই। তার কল্পনায় মৌলিকত্ব আছে, কিন্তু তবু সে কল্পনা যেন পল্লী-গ্রামের সম্মিলিত সম্পত্তি, তার অর্জন নয় ব্যক্তিগত। স্বতস্ফূর্ততা এই কল্পনার অন্যতম চরিত্র-লক্ষণ, আপনা থেকে এসেছে, আপনি নিয়মে ও স্বভাবে।
অনুশীলনের যেন আবশ্যকতা নেই। এই কল্পনায় কোনো ফাঁক নেই কোথাও, স্বয়ংসম্পূর্ণ সে, অকৃত্রিম ও অখণ্ড। সেই সঙ্গে তেজস্বী তিনি, তার ভঙ্গি দরাজ গলায় উচু স্বরে গান গাইবার।
তেজস্বিতা নজরুলের বৈশিষ্ট্য। কিন্তু নজরুল বহুদিকে গেছেন, জসীম উদ্দীন যাননি, তার সংস্কৃতি তাকে নিষেধ করেছে যেতে। এই সংস্কৃতি পল্লীর সামন্তবাদী সংস্কৃতি, যার মধ্যে তার লালন, যার তিনি মুখপাত্র। নজরুল এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে গেছেন নিজের শক্তিতে ও অভিজ্ঞতার ঘাত-প্রতিঘাতময় বৈচিত্র্যে।
সেই যে নজরুলের বন্ধন ছিল না শৈশবে, পারিবারিক কোনো আশ্রয় ছিল না, সেটা ব্যক্তি নজরুলের পক্ষে বেদনাদায়ক ছিল যতটা কবি নজরুলের জন্য সহায়ক হয়েছিল প্রায় ততটাই। নজরুল বিদ্রোহী ছিলেন, বিপ্লবও চেয়েছেন, জসীম উদ্দীন চাননি। তিনি নিজেই বলেছেন এই পার্থক্যের কথা, বলেছেন, 'আমি ধ্বংস চাইনি, আমি বলিতাম আমাদের যা কিছু আছে তার ওপর নতুন সৃষ্টি করিতে হইবে।' কিন্তু গড়তে হলে তো ভাঙতেও হয়!
সাধু ভাষা ব্যবহার করেছেন জসীম উদ্দীন। এই ভাষা চলিত ভাষার তুলনায় অধিকতর গ্রামীণ। চলিত ভাষায় যে চলমানতা থাকে, ক্ষিপ্রতা, বিদ্যুচ্ছটা থাকে কৌতুকের, পরিহাসের, বুদ্ধির, সংশয়ের—এই কবির সাধু ভাষায় তা নেই। তার ভাষা চলে ধীরে ধীরে, গ্রামের জীবনের মতোই, শাসন মেনে চলে অন্ত্যমিলের পদে পদে। অপ্রত্যাশিত বা দুঃসাহসিক কোনো পদক্ষেপ নেয় না এ ভাষা।
উপজীব্য জীবনের সঙ্গে এর সঙ্গতি পুরোপুরি। নিরাভরণ সে, সরল, স্বচ্ছন্দ, স্বতঃস্ফূর্ত। তার গায়ে নেই প্রসাধনের চিহ্ন, নেই পরিশীলনের মার্জনা। ধীর, স্থির, অচঞ্চল এই ভাষা না থাকলে এত সার্থক হতো না জসীম উদ্দীনের কবিতা।
দুই
কিন্তু জসীম উদ্দীন তাৎপর্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক কারণেও। তার পাঠক সমাজের রুচিগত সমাজতত্ত্বটি গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গি।
কেন এত জনপ্রিয় ছিলেন এই কবি?
প্রথম কারণ শহরবাসী শিক্ষিত পাঠকের কাছে, যে পাঠক আধুনিক সাহিত্য পড়েছে তার কাছে তিনি ভিন্ন এক ধরনের জীবনের কথা নিয়ে এসেছেন, যে জীবন অনেক পাঠকের অপরিচিত। জসীম উদ্দীনের কবিতার নতুনত্বটা আকর্ষণ করেছে তাদের।
অন্য এক শ্রেণীর পাঠকের কাছে তিনি আকর্ষণীয় সম্পূর্ণ বিপরীত কারণে, প্রাচীনত্বের জন্য। তুলনায় কম শিক্ষিত পাঠক যারা, যাদের চিত্তভূমির ভিত প্রোথিত গ্রামে, আধুনিক কবিতা পাঠে যারা স্বস্তি পান না, দেখেন সেখানে অপরিচিত অনুভব, কৌশল দক্ষ হাতের, সংশয় ও বক্রোক্তি নানা প্রকারের, তারা প্রভূত আনন্দ পান জসীম উদ্দীনের কবিতা পড়ে।
এই কবিতায় একদিকে তারা ফিরে পান তাদের লুপ্ত অথবা অপসৃয়মাণ ছেলেবেলাকে, অন্যদিকে স্বস্তি পান এর পরিচিত ও বিশ্বস্ত ভঙ্গিতে। মনে করেন গভীর কিছু, নির্ভরযোগ্য কিছু পেলেন। অর্থাৎ শহরের যে মধ্যবিত্ত পুঁজিবাদী সভ্যতার অনুরাগী, উদারনীতির সেবক—তিনিও পড়েন জসীম উদ্দীন, কম পরিমাণে পড়েন যদিও।
আবার শহরের নিম্ন মধ্যবিত্ত, সামন্তবাদশাসিত মানুষও পড়েন, অধিক পরিমাণে, অধিকতর আনন্দের সঙ্গে। গ্রামের শিক্ষিত মানুষ তো পড়েনই। শুধু পড়া নয়, শোনাও যায়, যেন সকলের মিলিত সম্পত্তি এই কবিতা।
আরও একটা ঐতিহাসিক কারণ ছিল জনপ্রিয়তার। মুসলমান সমাজে নাম করা যায় এমন কবি তেমন ছিলেন না তার যুগে। এক নজরুল ছিলেন। সেখানে আরও একজন কবি এলেন, জসীম উদ্দীন। যাকে নিয়ে গর্ব করা চলে। বলা যায়, আমরাও সামান্য নই, আমাদেরও কবি আছেন, একজন নন, একাধিক।
তার কবিতার ক্রম-বিকাশ নেই। যেন একই সময়ে বসে সব কবিতা লিখেছেন, একের পর এক। সময় চলছে না তার কবিতায়, যেমন চলে না বাংলার গ্রামে। স্থির জীবনের চিত্রকর তিনি। কিন্তু সমাজ জীবন স্থির হলেও, ব্যক্তির জীবন অচল নয়, হতে পারে না, সে জীবনের বিকাশ ও লয় আছে। জসীম উদ্দীনের নিজের জীবনেও বিকাশ আছে। গ্রামের ছেলে শিক্ষিত হয়েছেন, হয়ে চলে এসেছেন শহরে, বিদেশের বড় বড় শহর ভ্রমণ করেছেন। শহর প্রশংসা করল তার শক্তির। তার নিজস্ব পাঠক খুশি হলো, শহরের সুশিক্ষিত পাঠকও পছন্দ করল। বলল, তুমি গুণী।
গ্রামের জীবন বন্দি। বহুতর বন্ধন তার, নানাভাবে, নানাদিক থেকে বন্ধন এসেছে। কিন্তু শহরও বন্দি, শহরেও কারারক্ষক আছে, আছে সাম্রাজ্যবাদ। সামন্তবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ একত্র করেছে এদেশ। মিলেমিশে, দুই ষড়যন্ত্রকারীর পারস্পরিক সহযোগিতায়।
জসীম উদ্দীন শহরে এসেছিলেন মুক্তির খোঁজে, বন্দি গ্রাম থেকে তিনি এসেছেন অবরুদ্ধ শহরে। একজন সমালোচক বলেছেন, জসীম উদ্দীনের কবিতা গ্রামে প্রত্যাবর্তন আন্দোলনের সাহিত্যিক প্রতিরূপ। যে কথা ঠিক নয়, প্রত্যাবর্তনের নয়, পরিত্যাগের সঙ্গেই বরং যোগ আছে এই লেখার। এই লেখায় স্মৃতি আছে, আসলে স্মৃতিরই কবি জসীম উদ্দীন, যে স্মৃতি অভিজ্ঞতার মতোই জীবন্ত, অথবা বলা যায় স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা একই বস্তু তার কাব্যিক চরিত্রে।
শহরে এসেছেন, না এসে উপায় ছিল না তার, অনিবার্য হাতে শহর টেনে আনে গ্রামের শিক্ষিত মানুষকে। কিন্তু শহরে এসে আটক হয়েছেন তিনি, আর ফিরে যেতে পারেননি গ্রামে। কবি যেহেতু অকৃত্রিম, তাই শহরের হওয়ার চেষ্টা করলেন না, অনুকরণ করলেন না, কবিতা লিখলেন না আধুনিক। কবিতাই লিখলেন না আর একটা সময়ের পরে।
কেননা, তার কণ্ঠস্বর ভিন্ন ধরনের, সেই স্বরে আধুনিক গান গাওয়া যায় না, পল্লীসঙ্গীত গাওয়া যায়। কবিতা লেখাও ক্রমে থেমে গেল, কেননা যে জীবনের তিনি কবি, সেই জীবন থেকে ক্রমে দূরে সরে এসেছেন তিনি। যত সরে এসেছেন তত কম লিখেছেন। যে স্মৃতির ওপর তার ভরসা তার পক্ষে তো আর সম্ভব ছিল না নতুন উপাদান সরবরাহ করা। কখনো হয়তো লিখেছেন তথাকথিত গ্রামীণ বিষয়ে, পরিস্থিতির চাপে পড়ে, কিন্তু লিখে বুঝতে পেরেছেন, হচ্ছে না। অক্ষম চেষ্টার দ্বারা নিজের যথার্থ শক্তিকে ব্যঙ্গ করেননি তিনি। প্রকৃত কবি বলেই অভিজ্ঞতা, আবেগ ও কল্পনার রহস্যময় ও রাসায়নিক একত্রীকরণ কোথায় ঘটছে, কোথায় ঘটছে না—তা ঠিক বুঝে নিয়েছেন, আপন সংবিধানে।
শেষ জীবনে গদ্য লিখেছেন কবি। স্মৃতিমূলক গদ্য রচনা। এও স্বাভাবিক ছিল, স্বাভাবিক ছিল যে তিনি লিখবেন স্মৃতিকে উন্মোচিত করে, কেননা স্মৃতিরই লেখক তিনি—প্রধানত। কিন্তু গদ্য তিনি গ্রামকে নিয়ে লিখলেন না। লেখা সম্ভব ছিল না। সম্ভব ছিল না গদ্য ও পল্লীকে একত্র করতে পারা।
একত্র করতে পারেন ঔপন্যাসিক, বাংলা সাহিত্যের প্রধান প্রধান ঔপন্যাসিকেরা পেরেছেন। কিন্তু ঔপন্যাসিকের বস্তুবাদী ও বাস্তববাদী দৃষ্টি তার ছিল না। আবেগের মাপে মানুষের বিচার করেছেন তিনি, ফলে মানুষের ব্যক্তিত্বটা বেরিয়ে আসেনি। একজন মানুষের কথাই যেন লিখেছেন তিনি কবিতায়, একজন গ্রামীণ মানুষ, যে মানুষটি আবেগের মাপে গ্রামের অন্যসব মানুষের মতোই।
অথবা বলা যায় চিরন্তন এটি, চিরকালের দুঃখ তার মনে, চিরকালের ভালবাসাও। কিন্তু চিরন্তনেরও একটি স্থানীয় ভিত্তি আছে। এই ভিত্তিটিকে তিনি তেমন গুরুত্ব দেন না, সমাজকে দেখেন না, দেখেন না মানুষের জটিল সামাজিক বন্ধনকে। জীবনকে দেখেছেন তিনি চিত্রের মধ্য দিয়ে, সামাজিক বাস্তবতা ও জটিলতাকে প্রায় উপেক্ষা করেই।
তার দৃষ্টিভঙ্গি অসম্প্রদায়িক, যদিও তা বিশেষভাবে সামন্ততান্ত্রিক। অর্থাৎ আবেগপ্রবণ, ভাবালু। তিনি লক্ষণ দেখেন, কারণ দেখেন না। সেই জন্য দুঃখকে দেখলেন, দেখলেন না দুঃখ কেন আসে। দুঃখের প্রধান কারণ দারিদ্র ও নিপীড়ন। নিপীড়িত বলেই এদেশের পল্লীর মানুষ দরিদ্র।
'এ যে অন্যায়, এ যে অবিচার, কে রুখে দাঁড়াবে আজ/কার হুঙ্কার আকাশ হইতে নামিয়া আসিবে বাজ/কে পোড়াবে এই অসাম্য ভরা মিথ্যা সমাজ বাঁধ/তার তরে আজ লিখিয়া গেলাম আমার আর্তনাদ।' এ ধরনের পংক্তি তার কবিতায় আছে। কিন্তু এরা প্রতিনিধিত্বমূলক নয়। শ্রেষ্ঠ অংশও নয় তার কবিতার।
না, তিনি নজরুল নন কোনো মতেই। আর্তনাদ পর্যন্ত যান, বিদ্রোহ নয়, বিপ্লব তো নয়ই। জসীম উদ্দীনের গদ্যে কাব্যের গুণ আছে। এ গদ্য নিরাভরণ, সরল, আবেগপ্রবণ। কবিতায় যেমন গদ্যেও তেমনি, সমাজের কথা লেখেন না। তিনি লেখেন ব্যক্তির কথা। গদ্যে এই ব্যক্তি তিনি নিজে, ঘৃণাহীন ভালবাসা শক্তিহীন হতে বাধ্য। ঘৃণা থাকবেই মানুষের মনে। ঘৃণা আছেও। মানুষ মানুষের শত্রুতা করছে দেখি তার কাব্যে। কিন্তু মানুষ চিনতে পারছে না প্রকৃত শত্রু কে, চিনতে পারছে না রাষ্ট্র ও সমাজকে—শত্রুপক্ষ হিসাবে।
কেউ কেউ বলেছেন, এই কবি লুপ্তপ্রায় লোকসংস্কৃতির কাব্যিক সংরক্ষণাগার। সেই হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তিনি এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। তার কাব্য একটি মূল্যবান সমাজতাত্ত্বিক দলিল, বিশেষ করে একটি দৃষ্টিভঙ্গি, গ্রাম-বাংলার প্রতিনিধিত্বশীল দৃষ্টিভঙ্গি সেখানে বিধৃত। কিন্তু লোকসংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বলে দুঃখ করার কোন কারণ নেই, যদিও দুঃখ করা হচ্ছে। স্থবির সংস্কৃতি ধ্বংস হবেই। দুঃখের কারণ আছে অন্যত্র, আছে এই মর্মান্তিক সত্যে যে, পুরাতনের ধ্বংসস্তুপের ওপর নতুন একটি মানবিক, তথা গণতান্ত্রিক, সংস্কৃতি গড়ে উঠছে না।
আক্ষেপ হওয়া উচিত সেই সত্য নিয়ে। গ্রামীণ সংস্কৃতিও ভীষণভাবে শহরনির্ভর। সেই জন্যই তো জসীম উদ্দীনকে শহরে চলে আসতে হয়েছে, 'তুমি যাবে ভাই, যাবে আমাদের গাঁয়ে'—বলে গভীর আন্তরিকতায় অনুরোধ করতে হয়েছে শহরের বন্ধুকে। কিন্তু কেন এই অনুরোধ? এ তো জানা কথা যে, শহরের বন্ধু গ্রামে যাবে না, যেতে চাইবে না, গেলেও থাকবে না, পালিয়ে আসবে। তবু অনুরোধ করতে হয়, কেননা, গ্রাম শহরের স্বীকৃতিকে মূল্য দেয়, স্বীকৃতি না হলে তার চলে না। ওদিকে কবি নিজেও যাচ্ছেন না চলে, যেন বলেছেন, তুমি গেলে আমিও যেতাম। চলো না যাই আমরা দুজনে। উভয়ত শহর নির্ভরতাই বেরিয়ে আসছে।
জসীম উদ্দীনের গ্রাম ইতোমধ্যে আরও খারাপ হয়েছে। দুর্ভিক্ষ এসেছে সেখানে, মড়ক এসেছে ব্যাপক হারে। সেই মর্মান্তিক সত্যকে ধরে রেখে যেতে পারেননি কবি তার কাব্যে, কেননা তার কাব্য প্রেমের, ঘৃণার নয়; চিত্তের যতটা সমাজের ততটা নয়। সংস্কৃতির প্রধান কথা হচ্ছে সৃজনশীলতা। যে-সাজু নকশী কাঁথার শিল্প সৃষ্টি করতে পারে সে আরও অনেক বড় কাজ করতে পারতো—সুযোগ পেলে। সেই সুযোগটা পায়নি সে। পেত যদি এমন ব্যবস্থা থাকত যে, তার স্বামীকে লাঠি নিয়ে লড়াই করতে যেতে হতো না, ধানক্ষেত যদি সমবায়ী উদ্যমে চাষ হতো, বিরোধের স্থানে যদি থাকত মৈত্রী।
তার জন্য পরিবর্তন প্রয়োজন সমাজ ব্যবস্থার। তিরিশ বছর নয়, তিনশ বছরও নয়, শত শত বছর ধরে যে কৃষক ভিজিয়ে রেখেছে বাংলার মাটি নিজের চোখের জলে, সেই কৃষকের জীবনে পরিবর্তন আনতে হলে নতুন সমাজ চাই। সেই সমাজের কথা জসীম উদ্দীন লেখেননি। অধিকাংশ লেখকই লেখেননি এদেশের।