দেশের অর্ধেকের বেশি কৃষকের বছরে আয় ৩৪ হাজার টাকারও কম
দেশের মোট খাদ্য উৎপাদনকারীর অর্ধেকের বেশি ক্ষুদ্র কৃষকের আয় উল্লেখযোগ্য হারে কম।
নতুন এক জরিপে দেখা গেছে, তারা জাতীয় গড় আয়—৭৮ হাজার ২৮৬ টাকার অর্ধেকেরও কম আয় করেন।
‘ইনকাম অ্যান্ড প্রোডাক্টিভিটি অব স্মল-স্কেল ফুড প্রডিউসার্স সার্ভে ২০২৫'-এ এই চিত্র উঠে এসেছে।
মোট খাদ্য উৎপাদনকারীর ৫৩ দশমিক ৬৫ শতাংশই ক্ষুদ্র উৎপাদক, আর বৃহৎ উৎপাদক ৪৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ। এই দুই শ্রেণির মধ্যে ব্যবধানও অনেক বেশি। ক্ষুদ্র উৎপাদকরা যেখানে বছরে গড়ে আয় ৩৩ হাজার ৬৩৯ টাকা আয় করেন, সেখানে বৃহৎ উৎপাদকদের গড় আয় ১ লাখ ২৯ হাজার ৯৫৬ টাকা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) গতকাল এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে দেশের ৮টি বিভাগের ১২ হাজার ৮৭৯টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এছাড়া কৃষির ৫টি খাত—অস্থায়ী ফসল, স্থায়ী ফসল, বনজ, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্যচাষ জরিপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
জরিপে ক্ষুদ্র উৎপাদক হিসেবে তাদের সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যাদের জমির পরিমাণ, প্রাণিসম্পদের মালিকানা ও বার্ষিক কৃষি আয়—এই ৩ সূচকেই জাতীয়ভাবে সর্বনিম্ন ৪০ শতাংশের মধ্যে রয়েছেন। এই শ্রেণির উৎপাদকদের গড়ে ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশ জমি রয়েছে। বৃহৎ উৎপাদকদের গড় জমির পরিমাণ ১২৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, মানুষের ধীরে ধীরে কৃষি ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। সে কারণে জমির মালিকানা ছোট হওয়ার প্রবণতা ঠেকানো সম্ভব না।
তিনি বলেন, ‘অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে মানুষ বিকল্প আয়ের উৎস পেয়েছে। দারিদ্র্য কমাতে এটি সহায়তা করেছে। তবে কৃষিকে টেকসই রাখতে হলে কৃষকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হবে।’
উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
ইউনুস আরও বলেন, ‘কৃষকরা যদি তাদের শ্রমেরও ন্যায্য প্রতিদান পান, তাহলে তারা কৃষিতেই যুক্ত থাকবেন।’
কৃষকরা যদি কৃষি খাত ছেড়ে যেতে থাকেন, তবে এর প্রভাব শুধু তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, সতর্ক করেন তিনি।
খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তের কথা উল্লেখ করেন বিআইডিএসের এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘প্রথমত, কৃষকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা কৃষি উৎপাদনে আগ্রহী থাকেন।’
‘দ্বিতীয়ত, বাজারব্যবস্থার সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে। বিশেষ করে উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম কেন এত বেড়ে যায়, সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজিসহ এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে হবে। তৃতীয়ত, কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে, যাতে কৃষকরা লাভবান হওয়ার পাশাপাশি ভোক্তারাও সাশ্রয়ী দামে খাদ্যপণ্য কিনতে পারেন।’
জরিপে আরও দেখা গেছে, ক্ষুদ্র উৎপাদকদের মোট আয়ের ৮৪ দশমিক ৫ শতাংশ বা ২৮ হাজার ৪২১ টাকা আসে প্রাণিসম্পদ খাত থেকে। এরপর রয়েছে মৎস্য খাত। মৎস্যচাষ থেকে ১২ হাজার ৬৭০ টাকা, বনজ খাত থেকে ১০ হাজার ৮৯২ টাকা, অস্থায়ী ফসল থেকে ৪ হাজার ৫৯১ টাকা ও স্থায়ী ফসল থেকে ২ হাজার ৩৩১ টাকা।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এম এ সাত্তার মণ্ডল বলেন, এটি ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারের প্রাণিসম্পদ খাতে উচ্চ শ্রম অংশগ্রহণের প্রতিফলন।
তিনি বলেন, প্রাণিসম্পদ খাতের মধ্যে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি উভয়ই অন্তর্ভুক্ত। ফলে এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং পারিবারিক উদ্যোগ হিসেবে পরিবারের পুষ্টি নিশ্চিত করতেও ভূমিকা রাখে। তবে আয় কম হওয়ায় ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারের হাতে বিনিয়োগযোগ্য উদ্বৃত্ত থাকে না। যে কারণে তাদের উৎপাদনশীলতাও কম থাকে।
জরিপে প্রতি শ্রম দিবসে উৎপাদনশীলতাও আলাদাভাবে তুলে আনা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ক্ষুদ্র উৎপাদকরা প্রতি শ্রম দিবসে নিট ১ হাজার ৪৯৪ টাকার মূল্য সংযোজন করেছেন, যেখানে বৃহৎ উৎপাদকদের ক্ষেত্রে তা ২ হাজার ৩০১ টাকা।
খাতভিত্তিক হিসাবে স্থায়ী ফসল (৯ হাজার ১৮২ টাকা বনাম ৪ হাজার ৬০৩ টাকা) এবং বনজ খাতে (৬ হাজার ৫১৮ টাকা বনাম ৪ হাজার ৬৫৬ টাকা) ক্ষুদ্র উৎপাদকদের উৎপাদনশীলতা বৃহৎ উৎপাদকদের চেয়ে বেশি। অন্যদিকে মৎস্য চাষে (১৩ হাজার ৭৪ টাকা বনাম ৭ হাজার ৪২৯ টাকা) এবং অস্থায়ী ফসলে (২ হাজার ৭২৮ টাকা বনাম ২ হাজার ৩৭৪ টাকা) বৃহৎ উৎপাদকদের উৎপাদনশীলতা বেশি।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে রাজশাহীর ক্ষুদ্র উৎপাদকদের গড় বার্ষিক আয় সবচেয়ে বেশি—৪৪ হাজার ৭০৭ টাকা। আর সবচেয়ে কম সিলেটে, ২৪ হাজার ৬৩৬ টাকা। সিলেটই একমাত্র বিভাগ, যেখানে বৃহৎ উৎপাদকরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ—মোট খাদ্য উৎপাদনকারীর ৬০ দশমিক ০১ শতাংশ। অন্যদিকে চট্টগ্রাম ও রংপুরে ক্ষুদ্র উৎপাদকদের হার সবচেয়ে বেশি, যথাক্রমে ৫৯ দশমিক ৮১ শতাংশ ও ৫৯ দশমিক ২৯ শতাংশ।
জরিপে আরও দেখা গেছে, ক্ষুদ্র উৎপাদক পরিবারের ১০ দশমিক ৭ শতাংশের প্রধান নারী, যেখানে বৃহৎ উৎপাদক পরিবারের ক্ষেত্রে এই হার ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। নারীপ্রধান ক্ষুদ্র উৎপাদক পরিবারের গড় বার্ষিক আয় ২৭ হাজার ৯০১ টাকা, যা পুরুষপ্রধান ক্ষুদ্র উৎপাদক পরিবারের ৩৪ হাজার ৩৫৯ টাকার তুলনায় কম।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) দুটি সূচকের জন্য বাংলাদেশের ভিত্তিগত তথ্য নির্ধারণে এই জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। এগুলো হলো এসডিজি ২.৩.১, যা প্রতি শ্রম দিবস কৃষি উৎপাদনশীলতা পরিমাপ করে এবং এসডিজি ২.৩.২, যা ক্ষুদ্র খাদ্য উৎপাদকদের গড় বার্ষিক আয় পরিমাপ করে।
উভয় সূচকই এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা ২.৩ অর্জনের অগ্রগতি পরিমাপ করে, যার লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুদ্র খাদ্য উৎপাদকদের উৎপাদনশীলতা ও আয় দ্বিগুণ করা। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) কারিগরি সহায়তায় বিবিএসের 'সাসটেইনেবল এগ্রিকালচার স্ট্যাটিসটিকস প্রজেক্ট'-এর আওতায় এটি দ্বিতীয় জরিপ।