টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন

যেভাবে রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধ করে দেশে ফেরেন মুন্সিগঞ্জের মোহন

স্টার অনলাইন ডেস্ক

প্রায় বছর দুয়েক আগে ফেসবুকে রাশিয়ায় কাজের বিজ্ঞাপন দেখে লোভে পড়ে যান মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার মোহন মিয়াজী। প্রায় ৫ গুণ বেশি আয়ের অফারটি লুফে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন পেশায় ইলেকট্রিশিয়ান মোহন।

ভালো উপার্জনের আশায় খুশিমনে রাশিয়া পৌঁছালেন তিনি। প্রথমে পূর্ব রাশিয়ার সোবোডনি এলাকায় ইলেকট্রনিক্সের কাজ শুরু করেন। যদিও সেখানে তাপমাত্রা ছিল হিমাঙ্কের ২০ ডিগ্রি নিচে।

কিন্তু, এর পাঁচ মাস পর তার সামনে আসে এক নতুন বাস্তবতা। রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে তাকে সম্মুখ সমরের সৈনিক হতে বাধ্য করা হয়।

মোহনের রাশিয়া যাওয়া থেকে শুরু করে, যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশে ফিরে আসা নিয়ে আজ শনিবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ। সাংবাদিক টম পেরি গজারিয়া এসে মোহনের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন।  

মোহন
ছবি: দ্য টেলিগ্রাফের সৌজন্যে

মোহন জানান, তিনি ও তার সহকর্মীদের যখন ইউক্রেনে রাশিয়ার অধিকৃত দোনেৎস্কের একটি সেনাশিবিরে পাঠানো হয়, তখন সেখানকার কমান্ডার তাকে জানান, তিনি তাদের ব্যাটালিয়নে যোগদানের চুক্তিতে সই করেছেন।

টেলিগ্রাফকে মোহন বলেন, 'আমি কমান্ডারকে নিয়োগকারী সংস্থার দেওয়া কাগজ দেখালাম। সেখানে লেখা ছিল, আমরা কোনো যুদ্ধে জড়াব না। তখন তিনি আমাকে বললেন, আমাকে আসলে প্রতারিত করা হয়েছে।'  

তিনি জানান, দোনেৎস্কে ভয়াবহ ড্রোন হামলা হতো। তখন তাদের বরফে ঢাকা ট্রেঞ্চে আশ্রয় নিতে হতো।

মোহন বলেন, 'ধ্বংসপ্রাপ্ত ইউক্রেনীয় শহর আভদিভকাতে আমাদের পাঠানো হয়েছিল। সেখানে ভয়াবহ যুদ্ধের মধ্যে পড়ি। কামানের গোলার স্প্লিন্টারের আঘাতে আমি নিজে আহত হই। সেখানে মাইন বিস্ফোরণে বন্ধুকে নিহত হতে দেখেছি।'

মোহন
মোহনের রাশিয়া যাওয়া ও দেশে ফেরা

১। জুলাই ২০২৪: রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলের সোবোডনিতে একটি গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ প্ল্যান্টে ইলেকট্রিশিয়ান পদে নিয়োগের বিজ্ঞাপন দেখেন।
২। আগস্ট ২০২৪: আরও কয়েকজন বাংলাদেশির সঙ্গে রাশিয়ার উদ্দেশে রওনা হন।
৩। ডিসেম্বর ২০২৪: একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে চারমাস কাজ করার পর, আরেকটি রাশিয়ান সংস্থা সামরিক বাহিনীর জন্য ইলেকট্রনিক্সের কাজের প্রস্তাব নিয়ে যোগাযোগ করে। মোহনকে উড়োজাহাজে রোস্তভ-অন-ডনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনি সামরিক প্রশিক্ষণ নেন।
৪। জানুয়ারি ২০২৫: উড়োজাহাজে ধ্বংসপ্রাপ্ত ইউক্রেনীয় শহর আভদিভকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে যুদ্ধের ফ্রন্টলাইন লজিস্টিক ইউনিটে যোগ দেন মোহন। পরের আট মাস যুদ্ধের ময়দান থেকে রাশিয়ানদের মরদেহ বহন করতে বাধ্য করা হয়।
৫। অক্টোবর ২০২৫: ছুটিতে মস্কো পৌঁছাতে সক্ষম হন। বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে জরুরি ভ্রমণপত্র সংগ্রহ করেন এবং ঢাকায় ফিরতে বিমানের টিকিট কেনেন।
৬। অক্টোবর ২০২৫: উড়োজাহাজে উঠতে বাধা পেলেও শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরে আসেন।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর পরেই শোনা যায় ভাড়াটে সৈনিকের কথা। চাকরির বিজ্ঞাপনসহ নানা কৌশলে শত শত বিদেশিকে প্রলুব্ধ করে যুদ্ধের ময়দানে পাঠায় দুই দেশই।

ভালো আয়ের আশায় এবং যুদ্ধের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক থাকবে না—এমন প্রতিশ্রুতিতেই গজারিয়া থেকে সোবোডনিতে গিয়েছিলেন মোহন।

মোহন জানান, তাদের ইউনিটে আরও কয়েকজন বাংলাদেশি ছিলেন। ওই ইউনিটে রুশ যোদ্ধাও ছিল। ইউনিটটিকে প্রতিদিনই যুদ্ধ করতে হতো।

তিনি জানান, রুশ কমান্ডাররা বেতন চুরি করত এবং প্রতিবাদ করলে রাইফেলের বাট দিয়ে পেটানো হতো। ভুল করলে মাটির নিচে নিয়ে নির্যাতন করা হতো। অনেক সময় বিবস্ত্র করে সিলিং থেকে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হতো।

'আমি বুঝতে পারছিলাম, আটকা পড়ে গেছি। পালানোর কোনো পথ ছিল না। প্রতিটা সেকেন্ড আতঙ্কে থাকতাম, মনে হতো কখন যে প্রাণ চলে যায়,' টেলিগ্রাফকে বলেন তিনি।

তিনি জানান, রাশিয়া পৌঁছানোর পর কমান্ডারদের পক্ষে এক রুশ এজেন্ট প্রথমে তাকে উন্নত জায়গায় কাজের প্রলোভন দেখান। কর্মস্থলটি যুদ্ধের ময়দান থেকে দূরে বলেও জানানো হয়েছে।

কিন্তু, তাদের রোস্তভ-অন-ডনের একটি সামরিক ঘাঁটিতে ৩ সপ্তাহের মৌলিক প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়।

'যদিও আমাকে বলা হয়েছিল সম্মুখ সমরে থাকব না। কিন্তু আমাকে অ্যাসল্ট রাইফেল ব্যবহার, আরপিজি ফায়ার ও গ্রেনেড নিক্ষেপের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। তারা যখন বলেছিল এটা প্রশিক্ষণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আমি তখন তাদের বিশ্বাস করেছিলাম,' বলছিলেন মোহন।

পরে মোহনকে আভদিভকার একটি ঘাঁটিতে নেওয়া হয়। ২০২৪ সালে যুদ্ধের অন্যতম রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর শহরটি রাশিয়ার দখলে আসে। পুতিনের যুদ্ধ কৌশলের চরম পর্যায়ে সেখানে হাজারো রুশ সেনা নিহত হয়েছিল।

মোহন দ্রুতই পরিস্থিতির বাস্তবতা বুঝতে পারেন। তাকে ‘লজিস্টিক ইউনিটের’ অংশ হিসেবে সম্মুখ সমরের সৈন্যদের কাছে গোলাবারুদ, অস্ত্র ও জ্বালানি পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি মরদেহ উদ্ধারের কাজ করতে হতো।

তিনি বলেন, 'যতবার আমাকে ট্রেঞ্চ থেকে বের হতে হতো, আমি খুব ভয়ে থাকতাম। ফ্রন্টলাইনে তৃতীয় দিনেই স্প্লিন্টারের আঘাতে আমি আহত হই। এর কয়েকদিন পর আমার সাথে শুরু থেকে থাকা আরেক বাংলাদেশি মাইন বিস্ফোরণে প্রাণ হারান।'

মোহন দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, 'রাশিয়ার দখল করা অঞ্চল থেকে যখন আমরা লাশ সংগ্রহ করতাম, তখন অবিরাম ড্রোন ও মিসাইল হামলা হতো, গোলাবর্ষণ চলত। মাত্র কয়েক মিটার দূরে বিস্ফোরণ দেখছি, ভেবেছি হয়ত মারা যাচ্ছি।'

মোহনের সঙ্গে যুদ্ধের ময়দানে বাংলাদেশি ছাড়াও নাইজেরিয়া, নেপাল, উগান্ডা, মিশর ও ইরাক, উত্তর কোরিয়ার নাগরিক ছিল। মোহনের মতে, রাশিয়া তাদের সস্তা ও অপচয়যোগ্য ‘রিক্রুট’ হিসেবে ধরে নিয়েছিল।

দীর্ঘ প্রায় আট মাসের দুঃসহ যন্ত্রণার পর ২০২৫ সালের শেষে সংক্ষিপ্ত ছুটি পেয়ে মোহন মস্কোতে পৌঁছাতে সক্ষম হন। সেখানে থাকাকালে তিনি বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে অস্থায়ী ভ্রমণ নথিপত্র (ট্রাভেল পারমিট) সংগ্রহ করেন। তার পাসপোর্ট আগেই সামরিক বাহিনী কেড়ে নিয়েছিল।

স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, 'বিমানবন্দরে আমাকে নিরাপত্তা কর্মীরা আলাদা করে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমি শেষ পর্যন্ত উড়োজাহাজে উঠতে পারি। আমি ভেবেছিলাম তারা আমাকে আটকে দেবে।'

'শেষ পর্যন্ত যখন দেশে পরিবারের কাছে ফিরে এলাম, আমার মা নির্বাক হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, আমাকে হয়ত আর কোনোদিন দেখতে পাবেন না। দুজন-দুজনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলাম,' বলেন তিনি।

বর্তমানে মুন্সিগঞ্জে ভাইয়ের বাড়িতে থাকেন মোহন। টেলিগ্রাফের কাছে তিনি স্বীকার করেন, রাশিয়া যাওয়াটা তার বোকামি ছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন প্রলোভন দেখে এজেন্টদের শিকার না হওয়ার বিষয়ে তিনি সবাইকে সতর্ক করেন।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের গত বছরের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, রাশিয়ায় ভালো বেতন ও নিরাপদ চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। তারা ভাবছেন বৈধভাবে কাজের জন্য রাশিয়ায় যাচ্ছেন, কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর জোর করে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে।

এতে আরও বলা হয়, অন্তত ১০ বাংলাদেশিকে প্রলোভনে ফেলে যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। অনেকে সেখানে মারাও গেছেন।

তারা সবাই বৈধ ভিসা নিয়েই রাশিয়া গিয়েছিলেন বলছে প্রতিবেদনটি। এই বাংলাদেশিদের কেউ ভেবেছিলেন তেল কোম্পানিতে, কেউ নির্মাণ কাজ বা লজিস্টিকস সেক্টরে ভালো বেতনের চাকরি পাবেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়। পরে জোর করে সামরিক প্রশিক্ষণ শিবিরে পাঠানো হয়, যেখান থেকে তারা যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে পৌঁছে যান।