রাবিতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা: গ্রেপ্তার নেই, ভুক্তভোগীদের সঙ্গেও কথা বলেনি পুলিশ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা হওয়ার একদিন পরও তদন্তে পুলিশের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। এমনকি এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার বা আহত কোনো সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলেনি পুলিশ।
আহত সাংবাদিকরা জানান, হামলার ভিডিও ফুটেজ থাকার পরও পুলিশ জড়িতদের শনাক্ত করতে পারেনি।
গত ৪ অক্টোবর রাতে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে রাবি ছাত্রদল নেতাকর্মীদের হামলায় ৪ সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হন।
আহত সাংবাদিকরা হলেন—দ্য ডেইলি স্টারের রাবি প্রতিনিধি নূর আহসান মৃদুল, আগামীর সময়ের জাহিদুল ইসলাম, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আরিফ উজ জামান কোরবান ও সমকালের মাইনুল ইসলাম রাজু।
ওই হামলার ঘটনার ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, সাংবাদিকদের মারধর করছেন ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি আহসান হাবিব, ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম হাসিব এবং ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী বিশাল চক্রবর্তী সাংবাদিকদের মারধর করছেন।
এছাড়াও ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থী ও রাবি ছাত্রদলের সহকারী দপ্তর সম্পাদক শাহরিয়ার আলম অথি, ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ও রাবি ছাত্রদলের সহসভাপতি শরিফুল ইসলাম, ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের শিক্ষার্থী ও রাবি ছাত্রদলের সহসভাপতি তকবীর হাসান ইমন এবং ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী ও রাবি ছাত্রদলের সহকারী সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাজহারুল ইসলামকে মারধর করতে দেখা গেছে। রাবি ছাত্রদলের সহসভাপতি তাকবীর আহমেদ ইমনকেও ঘটনাস্থলে দেখা যায়।
হামলার ঘটনায় ৫ অক্টোবর নগরের মতিহার থানায় মামলাটি করেন শহীদ জিয়াউর রহমান হলের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মনির হোসেন।
মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ডেইলি স্টারকে জানান, মামলার বিস্তারিত বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। জোর করে তাকে অভিযোগপত্রে সই করানো হয়েছে।
মনির হোসেন বলেন, প্রভোস্ট মাহবুবর রহমান ৫ অক্টোবর সহকারী রেজিস্ট্রার আব্দুস সাত্তার ভাই ও আমাকে থানায় যেতে বলেন। আমাদের বলা হয়েছিল, কিছুই করতে হবে না, শুধু মতিহার থানায় গিয়ে সই করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জোর করে আমাকে দিয়ে এটি করানো হয়েছে। মামলা সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। সেখানে সই করতে গিয়ে দেখি, আসামিদের অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
হামলার ভিডিও ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও কেন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে, জানতে চাইলে মুনির বলেন, হল প্রভোস্ট আমাকে জানিয়েছেন, তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চাপে রয়েছেন।
হামলায় আহত আগামীর সময়ের রাবি প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলাম ডেইলি স্টারকে বলেন, আমার কাছে মনে হচ্ছে, শুধু আনুষ্ঠানিকতার জন্য প্রশাসন মামলাটি করেছে। এখন পর্যন্ত পুলিশ প্রশাসনের কেউ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ বা দেখা করেনি।
তিনি আরও বলেন, সবকিছু দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। তারপরও কেন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হলো, তা বুঝতে পারছি না। হামলাকারীদের বিচারের আওতায় আনা না হলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা খারাপ হয়েছে, তা আরও স্পষ্ট হবে।
বিডিনিউজের রাবি প্রতিনিধি আরিফ উজ জামান কোরবান বলেন, হল প্রশাসন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করলেও যারা সেদিন আমাদের মারধর করেছে, তারা নিয়মিত ফেসবুকে পোস্ট দিচ্ছেন। তাদের মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই, বরং তারা আমাদের শিবিরের সদস্য ও ‘গুপ্ত’ বলে আখ্যা দিচ্ছে। তাদের কয়েকজনকে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে ছাত্রদল থেকেও বহিষ্কার করা হয়েছে। তারপরও প্রশাসন বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে। তারা আবার আমাদের ওপর হামলা করবে না, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। অর্থাৎ, একবার হামলার শিকার হওয়ার পর এখন আবার হামলার আশঙ্কায় দিন কাটাতে হচ্ছে আমাদের।
যোগাযোগ করা হলে মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. অর্জুন ইসলাম ডেইলি স্টারকে বলেন, ২ অক্টোবর থেকে আমি রাজশাহীর বাইরে ছিলাম। গতকাল শহরে ফিরেছি। তদন্তের বিষয়ে আমি এখনো কিছু জানি না। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলতে তদন্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছি। তিনি তা করেছেন কি না, তা আমি খতিয়ে দেখব।
এ বিষয়ে জানতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোস্তাক আহমেদকে একাধিকবার ফোন করা হলেও ধরেননি।