জুলাই সনদের সঙ্গে বিএনপির ইশতেহারও গুরুত্ব পাবে
সংবিধান সংশোধন–সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি জুলাই সনদের পাশাপাশি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দেবে। কমিটিতে থাকা ক্ষমতাসীন দলের সদস্যরা এমনটি জানিয়েছেন।
বিএনপির প্রধান প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনর্বহাল করা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা থেকে বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রপতিকে বাদ দেওয়া এবং প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর নির্দিষ্ট করা।
বিএনপি প্রধানমন্ত্রীকে একইসঙ্গে দলীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার এবং উপ-রাষ্ট্রপতির পদ সৃষ্টি করার পক্ষে।
কমিটির সদস্য চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি এবং জয়নুল আবদিন দ্য ডেইলি স্টারকে দলটির এই অবস্থানের কথা নিশ্চিত করেছেন। তারা জানিয়েছেন, নির্বাচনী ইশতেহারে থাকা সাংবিধানিক বিষয়গুলো জুলাই সনদের পাশাপাশি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আবারও বলেছেন, জুলাই সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, বিএনপি তা হুবহু বাস্তবায়ন করবে।
তিনি বলেন, আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এমন বেশ কিছু প্রস্তাব রয়েছে যেগুলোর জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন। যেহেতু ওই বিষয়গুলোর ওপর ভিত্তি করেই আমরা জনগণের ম্যান্ডেট পেয়েছি, তাই সেগুলোকেও আমরা অন্তর্ভুক্ত করব।
বিএনপির ইশতেহারে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত 'জুলাই জাতীয় সনদ' সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়ন করা হবে।
পাশাপাশি, সংবিধানে 'সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস' পুনর্বহাল করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে এই ইশতেহারে।
সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম তার 'কনস্টিটিউশনাল ল অব বাংলাদেশ' বইয়ে লিখেছেন, ১৯৭৭ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এক ঘোষণার মাধ্যমে সংবিধানের প্রস্তাবনার শুরুতে 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম' যুক্ত করেন।
মাহমুদুল ইসলাম আরও উল্লেখ করেন, সে সময় 'জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা'র পরিবর্তে 'সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রের অর্থ হিসেবে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার' শব্দগুলো যুক্ত করা হয়।
পরে ১৯৭৯ সালে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে এই পরিবর্তনগুলো সংবিধানে পাকাপোক্তভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এরপর ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে 'সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস' কথাটি বাদ দেওয়া হয় এবং সংবিধানের ওই অংশটিকে ১৯৭২ সালের মূল অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়।
সালাহউদ্দিন আহমদ উল্লেখ করেন, সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর আস্থার বিষয়টি সংবিধানের ৮ নম্বর অনুচ্ছেদে মূলনীতি হিসেবেও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনি আরও জানান, এ বিষয়ে বিরোধী দলও একমত পোষণ করেছে।
প্রতিশ্রুতি ও দ্বিমত
জুলাই সনদ ও নিজস্ব নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে, বিএনপি অবাধ ও সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচনের নিশ্চয়তা দিতে এবং তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে স্থায়ী সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে একটি ‘নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখাটি জুলাই সনদের ভিত্তিতে আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করার কথা থাকলেও এই প্রক্রিয়ায় বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রপতিকে সম্পৃক্ত করা নিয়ে বিএনপির আপত্তি আছে।
জুলাই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নিয়োগের জন্য বেশ কয়েকটি ধাপের কথা বলা হয়েছে। প্রক্রিয়ার শুরুতে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা, স্পিকার, বিরোধী দলের ডেপুটি স্পিকার এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধি নিয়ে পাঁচ সদস্যের একটি প্যানেল গঠিত হবে। এই প্যানেল রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দেওয়া তালিকা থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নির্বাচন করবে।
যদি এই প্যানেল কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তবে চার্টারে দ্বিতীয় ধাপের কথা বলা হয়েছে। এই পর্যায়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের একজন করে বিচারককে প্যানেলে যুক্ত করে এটিকে সাত সদস্যের একটি বোর্ডে রূপান্তর করা হবে, যারা সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকে ভোটাভুটির মাধ্যমে প্রধান নির্বাচন করবেন।
তবে বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি দল এই বিধানের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে।
বিএনপি অঙ্গীকার করেছে, কোনো ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন—তা ধারাবাহিকভাবে হোক বা বিরতি দিয়ে।
তবে জুলাই চার্টারে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী একই সাথে দলীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না—যে বিধানটির বিরোধিতা করেছে বিএনপি ও তাদের মিত্ররা।
দলটি আরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য আনা হবে এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সুসংহত করা হবে।
বিএনপি সংসদে ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ (আপার চেম্বার) গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে আসন বণ্টন করা হবে নিম্নকক্ষে দলগুলোর প্রাপ্ত আসনের অনুপাতে।
তবে অন্য অধিকাংশ দলই মনে করে, উচ্চকক্ষটি হওয়া উচিত জাতীয় নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের শতকরা হার অনুযায়ী।
এ ছাড়া, বিএনপি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর আওতায় সংসদ সদস্যরা নিজ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিতে পারবেন।
অনাস্থা প্রস্তাব, অর্থ বিল, সংবিধান সংশোধন এবং যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি ও জাতীয় নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়া যাবে না।
তবে জুলাই সনদে সংবিধান সংশোধন ও জাতীয় নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোকে এই ব্যতিক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
বিএনপি সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়ে নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের অঙ্গীকার করেছে। এ ছাড়া, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য খাতে নিয়োগের জন্য পিএসসিকে আরও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের প্রস্তাবও দিয়েছে দলটি।
বিএনপির প্রস্তাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হবে আইন অনুযায়ী সরকারের মাধ্যমে।
তবে জুলাই সনদের সঙ্গে একমত পোষণকারী অধিকাংশ দল মনে করে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের প্রধান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি।
অন্যদিকে, বিএনপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী আপিল বিভাগের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ দুই বিচারকের মধ্য থেকে একজনকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি।
তবে জুলাই চার্টারের পক্ষ নেওয়া অধিকাংশ দল একমত যে আপিল বিভাগের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ বিচারককেই প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া উচিত।
বিএনপি একজন ওম্বুডসম্যান নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। উল্লেখ্য, বিএনপির আগের শাসনামলে চালু হওয়া 'ট্যাক্স ওম্বুডসম্যান' ব্যবস্থাটি বেশ কার্যকর বলে বিবেচিত হয়েছিল। জুলাই সনদে প্রস্তাব করা হয়েছে, স্পিকারের নেতৃত্বে একটি সার্চ কমিটি রাষ্ট্রপতির কাছে ওম্বুডসম্যান হিসেবে নিয়োগের জন্য নাম সুপারিশ করবে।
বিএনপির অন্যান্য প্রতিশ্রুতি
বিএনপির ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সংসদের প্রতিটি কক্ষের একজন ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে মনোনীত করা হবে।
দলটি আরও প্রতিশ্রুতি ছিল, জাতীয় সংসদের পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি, প্রিভিলেজ কমিটি, এস্টিমেটস কমিটি এবং পাবলিক আন্ডারটেকিংস কমিটির প্রধান হিসেবে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন।
এ ছাড়া, সংসদে বিরোধী দলের আসন সংখ্যার অনুপাতে অন্যান্য সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদেও তাদের নিয়োগ দেওয়া হবে।
বিএনপির প্রতিশ্রুতি ছিল, সুপ্রিম কোর্টের স্থায়ী আসন রাজধানীতে থাকবে এবং প্রধান বিচারপতি প্রয়োজনে প্রতিটি বিভাগে স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপন করতে পারবেন। এ ছাড়া, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে আরও শক্তিশালী করা এবং এর আওতা বাড়ানোর প্রস্তাবও দিয়েছে দলটি।
নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শর্তাবলি ও নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের অধীনে ন্যস্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংশোধনী আনা হবে।
পাশাপাশি, আইনের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে জেলা পর্যায়ে একটি স্থায়ী প্রসিকিউশন বা অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠন করা হবে।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতার বিষয়ে বিএনপির প্রস্তাব, সংবিধানে এমন একটি বিধান যুক্ত করা হবে—যার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি যে কোনো দণ্ড মার্জনা, স্থগিত বা হ্রাস করতে পারবেন।
তবে এই ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে অবশ্যই আইন অনুযায়ী নির্ধারিত মানদণ্ড, নীতিমালা ও পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সরাসরি নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হবে এবং এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে তাদের আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিষয়টি যথাযথ আইনের অধীনে পরিচালিত হবে। এ ছাড়া, স্থানীয় সরকারের সঙ্গে দায়িত্বরত সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সম্পর্কের বিষয়টিও আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
পুলিশের পেশাদারত্ব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে সেটিকে আরও জনবান্ধব করার লক্ষ্যে একটি ‘পুলিশ কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে বিএনপি। এই লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশ পর্যালোচনা ও সংস্কার করে তা যথাযথ আইনে রূপান্তর করা হবে।
এ ছাড়া, একটি স্বতন্ত্র অপরাধ তদন্ত সংস্থা (ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন সার্ভিস) গঠনের বিষয়টি সংসদে পর্যালোচনার প্রস্তাবও দিয়েছে দলটি।
বেসরকারি খাতে দুর্নীতি তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনগুলোর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করবে বিএনপি। এ ছাড়া, সংসদের অনুমোদন সাপেক্ষে বাংলাদেশ ওপেন গভর্নমেন্ট পার্টনারশিপের সদস্য হবে।
যদিও আয়কর রিটার্ন গোপনীয় নথির অন্তর্ভুক্ত, তবুও বিএনপি প্রস্তাব করেছে, দুর্নীতি দমন কমিশন বা অন্য কোনো অনুমোদিত সংস্থা আদালতের মাধ্যমে প্রয়োজনে সেগুলো তলব করতে পারবে।
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও দমন-পীড়নের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করতে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি।
সেই সঙ্গে, ভোট কারচুপি ও দুর্নীতির জন্য দায়ী কর্মকর্তাদের শাস্তির আওতায় আনার অঙ্গীকার করেছে তারা।
এ ছাড়া, ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে বিএনপি।