গাজ্জার অশ্রু: তুরিনের ঘাসে ঝরে পড়া এক 'শিশু'র স্বপ্ন
ইতালির তুরিন শহরের নৈশাকাশে সেদিন কোনো মেঘ ছিল না, তবু স্তাদিও দেল্লে আল্পির সবুজ গালিচায় সেদিন নেমে এসেছিল এক অদ্ভুত, অদৃশ্য বিষাদের বৃষ্টি। ১৯৯০ সালের ৪ জুলাই; বিশ্বকাপের এক স্নায়ুক্ষয়ী সেমি-ফাইনাল। স্টেডিয়ামের গ্যালারি থেকে ভেসে আসা হাজারো মানুষের গগনবিদারী চিৎকার, খেলোয়াড়দের কপালের চিবুক বেয়ে নেমে আসা বিন্দু বিন্দু ঘাম আর বাতাসের প্রতিটি কণায় মিশে থাকা বারুদের মতো উত্তেজনা, এক শ্বাসরুদ্ধকর প্রহর।
ঠিক সেই তুমুল কোলাহলের মাঝখানেই রচিত হলো এমন এক মর্মন্তুদ নীরবতার দৃশ্য, যা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে এক লহমায় গেঁথে গেল চিরকালের জন্য। সেই দৃশ্যটি ছিল এক অদম্য যোদ্ধার হঠাৎ করেই এক অসহায় শিশুতে পরিণত হওয়ার, সেই দৃশ্যটি ছিল পল গ্যাসকোয়েনের, সবার আদরের ‘গাজ্জা’র।
তেইশ বছরের এক উদ্দাম, উচ্ছল তরুণ এই গ্যাসকোয়েন। তার পায়ে যখন বল থাকত, মনে হতো যেন কোনো ছন্নছাড়া কবি আপন খেয়ালে জীবনের শ্রেষ্ঠ কবিতাটি লিখছেন। ইংল্যান্ড দলের মাঝমাঠের প্রাণভোমরা ছিলেন তিনি; বলের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ আর জাদুকরী ড্রিবলিং দেখে মুগ্ধ বিশ্ব তাকে ভালোবেসে ফেলেছিল।
তার ভেতরে কোনো জটিলতা ছিল না, ছিল নিখাদ এক বুনো আনন্দ। যেন পাড়ার মাঠে খেলতে নামা কোনো কিশোর, যে কেবল বল নিয়ে দৌড়াতে ভালোবাসে। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই তিনি খেলেছেন এমন এক ঘোরলাগা আবেশে, যেন এই বিশ্বকাপ কেবল তার শৈশবের এক রঙিন স্বপ্নেরই বাস্তবায়ন। কিন্তু কে জানত, সেই স্বপ্নের চূড়ান্ত পরিণতি লেখা হবে এমন এক নিদারুণ অশ্রুজলে!
প্রতিপক্ষ পশ্চিম জার্মানি সংগঠিত, শক্তিশালী, অভিজ্ঞ। ম্যাচের প্রতিটি মিনিট যেন ছিল একেকটি স্নায়ুযুদ্ধ। ইংল্যান্ড এগোতে চাইছে, জার্মানি প্রতিরোধ গড়ে তুলছে, আর সময় ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে এক অনিবার্য পরিণতির দিকে।
তারপর এল সেই মুহূর্ত।
ম্যাচটি তখন নির্ধারিত সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে গড়িয়েছে অতিরিক্ত সময়ে। ঘড়ির কাঁটা নিরানব্বই মিনিটের ঘরে। শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তিতে খেলোয়াড়দের প্রতিটি নিঃশ্বাস তখন আগ্নেয়গিরির উত্তাপ ছড়াচ্ছে। ফাইনালে ওঠার এক অদম্য, মরিয়া চেষ্টায় বল দখলের জন্য থমাস বার্থোল্ডের দিকে ছুটে গেলেন গাজ্জা। শরীর ছুঁড়ে দিয়ে একটি স্লাইডিং ট্যাকল করলেন। খুব যে ভয়ংকর, হিংস্র কোনো ফাউল ছিল তা নয়, কিন্তু নিয়মের কড়াকড়িতে ব্রাজিলিয়ান রেফারি হোসে রবার্তো রাইটের বাঁশি বেজে উঠল। রেফারির হাত চলে গেল পকেটে। গ্যালারির কোলাহল যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
পকেট থেকে বেরিয়ে এল সেই অভিশপ্ত হলুদ রঙের ছোট একটি কার্ড।
সাধারণত একটি হলুদ কার্ড খেলার মাঠে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। কিন্তু গাজ্জার জন্য ওই এক টুকরো হলুদ কাগজ কেবল একটি সতর্কবাণী ছিল না; সেটি ছিল তার আজীবনের লালিত স্বপ্নের মৃত্যু পরোয়ানা, তার অন্তরাত্মাকে ছিঁড়ে ফেলা এক ধারালো বর্শা। টুর্নামেন্টের নির্মম নিয়ম অনুযায়ী, এটি ছিল তার দ্বিতীয় হলুদ কার্ড। যার সরল ও নিষ্ঠুর অর্থ, ইংল্যান্ড যদি এই ম্যাচ জিতে ফাইনালেও ওঠে, তবু পল গ্যাসকোয়েন সেই স্বপ্নের বিশ্বমঞ্চে মাঠে নামতে পারবেন না। তাকে বসে থাকতে হবে মাঠের বাইরে, দর্শক হয়ে।
কার্ডটি চোখের সামনে ভেসে ওঠার ঠিক পরের মুহূর্তটি ইতিহাসের পাতায় এক অবিস্মরণীয় ট্র্যাজেডি হয়ে আছে। গাজ্জার মুখের পেশিগুলো হঠাৎ যেন পাথরের মতো শক্ত হয়ে এল। তার ডাগর চোখের দৃষ্টিতে তখন এক অবিশ্বাস্য শূন্যতা। এরপরই সেই শূন্যতা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল চরম এক হাহাকারে। মুহূর্তের মধ্যে তার নিচের ঠোঁটটি থরথর করে কাঁপতে শুরু করল, ঠিক যেমন করে গভীর অভিমানে কেঁদে ওঠার আগে কোনো অবুঝ শিশুর ঠোঁট কাঁপে।
বিশাল ওই স্টেডিয়ামের হাজার হাজার দর্শক, বিপক্ষ দলের বাঘা বাঘা খেলোয়াড়, আর অসংখ্য ক্যামেরার লেন্স, সবকিছুর অস্তিত্ব যেন তার কাছে মিথ্যে হয়ে গেল। তিনি ভুলে গেলেন তিনি একজন পেশাদার ফুটবলার, ভুলে গেলেন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের লোকদেখানো কাঠিন্য।
প্রথম অশ্রুবিন্দুটি ছিল খুবই নিঃশব্দ, প্রায় অদৃশ্য। কিন্তু সেটি যেন ভেঙে দিল তার ভেতরের সব বাঁধ। চোখের কোণ বেয়ে অঝোরে নামতে শুরু করল নোনা জল।
জার্সি দিয়ে মুখ ঢেকে, বারবার চোখ মুছে সেই কান্না লুকোনোর এক ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলেন গাজ্জা। কিন্তু সেই বাঁধভাঙা চোখের জল যেন কোনোভাবেই থামার নয়। সেই কান্নায় মিশে ছিল চূড়ান্ত প্রাপ্তির ঠিক আগমুহূর্তে সবকিছু হারিয়ে ফেলার তীব্র যন্ত্রণা। যেন এক তৃষ্ণার্ত পথিকের ঠোঁট ছুঁয়ে যাওয়ার ঠিক আগেই কেউ এক আঁজলা জল নির্মমভাবে মাটিতে ফেলে দিয়েছে।
কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলেন সতীর্থ গ্যারি লিনেকার। গাজ্জার সেই ভগ্নদশা, সেই বুকফাটা আর্তনাদ দেখে তিনি যেন স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তিনি ডাগআউটের দিকে তাকিয়ে ম্যানেজার ববি রবসনের উদ্দেশ্যে তার সেই বিখ্যাত ইশারাটি করলেন, চোখের দিকে আঙুল তুলে বোঝালেন, 'ওর দিকে একটু নজর রাখুন, ও সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।'
অশ্রুসিক্ত ঝাপসা চোখ নিয়েই গাজ্জা বাকি খেলাটুকু চালিয়ে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। পা চলছিল ঠিকই, কিন্তু তার মন পড়ে ছিল ওই তুরিনের ঘাসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ভাঙা স্বপ্নের টুকরোগুলোর মাঝে।
শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে ইংল্যান্ড হেরে বিদায় নেয়, কিন্তু ম্যাচের ফলাফলের চেয়েও মানুষের মনে চিরস্থায়ী দাগ কেটে যায় গাজ্জার সেই শিশুর মতো কান্না।