আদিম আক্রোশের কাছে শিল্পের পরাজয়: রাইকার্ড-ভোলারের নিকৃষ্টতম দ্বৈরথ
সভ্যতার রেশমি চাদরে মোড়ানো মানুষের ভেতরকার আদিম পশুটা কখন যে ফণা তুলে দাঁড়ায়, তা বোধহয় কেউ হলফ করে বলতে পারে না। সবুজ ঘাসের গালিচায় যখন স্নায়ুর চূড়ান্ত পরীক্ষা চলে, তখন আভিজাত্য, শিষ্টাচার আর গৌরবের অহংকার মুহূর্তেই খসে পড়ে। ক্ষোভের অন্ধ দাবানলে পুড়ে কীভাবে শিল্পের পূজারিরাও এক লহমায় নেমে আসতে পারেন ঘৃণ্যতম প্রবৃত্তির অতল গহ্বরে, তার এক জীবন্ত আর বীভৎস উপাখ্যান হয়ে আছে বিশ্বকাপের একটি অবিশ্বাস্য দৃশ্য। চোখের পলকে ঘটে যাওয়া এক নোংরা আক্রোশ, যা চিরকালের জন্য সেঁটে গেছে ইতিহাসের গায়ে এক দগদগে ক্ষতের মতো।
সময়টা ১৯৯০ সাল, ইতালির মিলান শহরের বিখ্যাত সান সিরো স্টেডিয়াম।
বিশ্বকাপ ফুটবলের শেষ ষোলোর মহারণ। মুখোমুখি দুই চিরশত্রু। পশ্চিম জার্মানি বনাম নেদারল্যান্ডস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বারুদমাখা অতীত আর ফুটবল মাঠের রাজত্ব দখলের লড়াই মিলিয়ে এই দুই দলের দ্বৈরথ সবসময়ই ছিল এক ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি। সেদিনও সান সিরোর গ্যালারিতে, বাতাসে, এমনকি প্রতিটি ঘাসের ডগায় ভাসছিল এক দমবন্ধ করা উত্তেজনা। যেন এক মহাবিস্ফোরণের প্রহর গুনছিল পুরো বিশ্ব। এ লড়াই ছিল শুধু খেলার নয়, আত্মমর্যাদারও।
একদিকে ডাচ রূপকথার বরপুত্র ফ্রাঙ্ক রাইকার্ড। যার পায়ে যেন কবিতার ছন্দ আর মস্তিষ্কে নিখুঁত জ্যামিতির ছোঁয়া। অন্যদিকে জার্মান যন্ত্রের অন্যতম প্রাণভোমরা রুডি ভোলার, যার বিখ্যাত কোঁকড়া সোনালী চুল আর গোলপোস্টের সামনে চিতার মতো হিংস্রতা প্রতিপক্ষের রক্ষণের জন্য ছিল এক মূর্তিমান আতঙ্ক। কে জানত, বিধাতা সেদিন এই দুই কিংবদন্তির তুলিতে কোনো অমর শিল্প নয়, বরং রচনা করবেন এক চরম কুৎসিত আর বিষাদময় অধ্যায়!
ম্যাচের বয়স তখন সবে বিশ মিনিট ছুঁয়েছে। রাইকার্ডের এক হিংস্র ট্যাকলে মাটিতে আছড়ে পড়লেন ভোলার। রেফারির কড়া বাঁশি বাজল, রাইকার্ডের চোখের সামনে ভেসে উঠল একটি হলুদ কার্ড। এই এক টুকরো হলুদ কাগজের অর্থ ছিল ভয়ংকর, দল জিতলেও পরের ম্যাচে মাঠের বাইরে থাকতে হবে ডাচ তারকাকে। হতাশা, আক্ষেপ আর অন্ধ রাগের এক তীব্র ঘূর্ণি সম্ভবত তখন তোলপাড় করে দিচ্ছিল রাইকার্ডের ভেতরটা। কিন্তু সেই রাগের লাভা যে এমন বীভৎসরূপে বেরিয়ে আসবে, তা উপস্থিত হাজারো দর্শক ঘুণাক্ষরেও টের পাননি।
ভোলারকে পাশ কাটিয়ে নিজের পজিশনে ফেরার পথে হঠাৎ করেই যেন হিতাহিত জ্ঞান হারালেন রাইকার্ড। সভ্যতার সব আবরণ ছুড়ে ফেলে সশব্দে এক দলা থুতু ছিটিয়ে দিলেন ভোলারের সেই বিখ্যাত সোনালী কোঁকড়া চুলে। হতভম্ব, অপমানিত ভোলার তার জবাব দিতে রাইকার্ডের মুখোমুখি হয়ে উত্তেজিত কণ্ঠে কিছু একটা বলেন। কিন্তু তা পছন্দ হয়নি আর্জেন্টাইন রেফারি হুয়ান কার্লোস লুস্তুর। নিজের চুলে লেপ্টে থাকা অপমানের সেই জঘন্য তরল চিহ্ন দেখালেন ভোলার। কিন্তু তাতে মন গলেনি রেফারির। উল্টো ভোলারকে হলুদ কার্ড দেখিয়ে বসলেন! জার্মান তারকার চোখেমুখে তখন অবিশ্বাস আর চরম অসহায়ত্বের এক করুণ প্রতিচ্ছবি।
কিন্তু বিষাদসিন্ধুর তখনো অনেক অঙ্ক বাকি। মিনিট খানেক পরেই জার্মানদের একটি ফ্রি-কিক ডাচ ডি-বক্সে উড়ে এল। বলের দখল নিতে শূন্যে লাফিয়ে উঠলেন ডাচ গোলরক্ষক ভ্যান ব্রেকেলেন। তাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন ভোলার। রাইকার্ড যেন ঠিক এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ওত পেতে ছিলেন। শিকারি বাঘের মতো ছুটে এসে ভোলারের কান ধরে হ্যাঁচকা টান মারলেন, বুট দিয়ে দিলেন এক নির্মম গুঁতো। দুজনেই স্প্রিংয়ের মতো উঠে দাঁড়ালেন, চোখে চোখ রেখে শুরু হলো তীব্র বাক্যবাণ। বিপদ বুঝে ভোলারকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন ইউর্গেন ক্লিন্সম্যান। ততোক্ষণে রেফারির ধৈর্যের বাঁধ পুরোপুরি ভেঙে গেছে।
লাল কার্ড, দু’জনের জন্যই।
কিন্তু এরপর রচিত হলো ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্ট আর লজ্জাজনক দৃশ্য। মাঠ থেকে টানেলের দিকে হেঁটে যাওয়ার পথে রাগে উন্মত্ত ডাচ তারকা দ্বিতীয়বারের মতো থুতু ছুড়লেন ভোলারের মাথায়। এবার আরও তীব্র, আরও দৃশ্যমান। এটি আর মুহূর্তের উত্তেজনা নয়, বরং একপ্রকার অব্যাহত ক্ষোভের প্রকাশ।
অপমানিত, ক্ষুব্ধ ভোলার নিজেকে সামলে নিলেন অভাবনীয় এক মানসিক দৃঢ়তায়। তিনি হয়তো সেদিনই বুঝেছিলেন, এই নোংরা কলঙ্কের কালশিটে রাইকার্ডের গায়েই চিরকাল লেগে থাকবে। ক্যামেরার লেন্সে ধরা পড়া সেই দৃশ্য মুহূর্তেই ইথারে ইথারে ছড়িয়ে পড়ল বিশ্বজুড়ে, স্তব্ধ আর বাকরুদ্ধ করে দিল কোটি কোটি ফুটবল ভক্তকে।
সময়ের প্রলেপে ক্ষতের দাগও শুকিয়েছে। পরবর্তীতে একে অপরের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন, নব্বইয়ের দশকের শেষে এক টেবিলে বসে প্রাতঃরাশ করেছেন, এমনকি এক ডাচ মাখনের বিজ্ঞাপনে হাসিমুখে ক্যামেরাবন্দিও হয়েছেন। কিন্তু সবুজ ঘাসের ওপর শিল্পের বদলে সেদিনের সেই আদিম ক্ষোভ, পৈশাচিক আক্রোশ আর থুতুর ছিটকিনি আজও ইতিহাসের কুৎসিত আর বিষণ্ণ উপাখ্যান হয়েই বেঁচে আছে।