ফিফা নাকি উয়েফা—বিশ্ব ফুটবলের আসল ক্ষমতা কার হাতে?
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় কর্তৃপক্ষ ফিফা। বিশ্বকাপ আয়োজন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়ম-কানুন নির্ধারণ, সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু এই সংস্থাই। তবে বাস্তবতা হলো, ফুটবলের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তি কিন্তু ফিফার হাতে নয়। সেই ক্ষমতার বড় অংশ রয়েছে ইউরোপিয়ান ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফার কাছে। সম্প্রতি বিশ্বকাপ পরিচালনার জন্য ২০ বিলিয়ন ডলারের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠন এবং বাইরের বিনিয়োগকারীদের কাছে এর কিছু মালিকানা বিক্রির পরিকল্পনা সামনে আসার পর আবারও আলোচনায় এসেছে বিশ্ব ফুটবলের ক্ষমতার এই ভারসাম্য।
১৯০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত সুইজারল্যান্ডের জুরিখভিত্তিক ফিফা বর্তমানে বিশ্বের সর্বোচ্চ ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এর সদস্যসংখ্যা ২১১টি জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। ফিফা কংগ্রেসে প্রতিটি সদস্য দেশের ভোটের মূল্য সমান, দেশটি ফুটবলে যত শক্তিশালী বা দুর্বলই হোক না কেন। এই কংগ্রেসই ফিফা সভাপতি নির্বাচন করে এবং সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন অনুমোদন দেয়। কংগ্রেসের মধ্যবর্তী সময়ে ৩৭ সদস্যের ফিফা কাউন্সিল সংস্থাটির প্রধান সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে কাজ করে।
বিশ্বের প্রতিটি জাতীয় ফুটবল সংস্থা আবার ফিফার অধীনে থাকা ছয়টি মহাদেশীয় কনফেডারেশনের একটির সদস্য। ইউরোপে উয়েফা, দক্ষিণ আমেরিকায় কনমেবল, উত্তর ও মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে কনকাকাফ, এশিয়ায় এএফসি, আফ্রিকায় সিএএফ এবং ওশেনিয়ায় ওএফসি নিজ নিজ অঞ্চলের ফুটবল পরিচালনা করে। জাতীয় সংস্থাগুলো নিজেদের দেশের ফুটবল পরিচালনা করলেও মহাদেশীয় প্রতিযোগিতা আয়োজন ও আঞ্চলিক প্রশাসনের দায়িত্ব পালন করে এসব কনফেডারেশন।
ফিফার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো বিশ্ব ফুটবলের বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাগুলো আয়োজন করা। পুরুষ ও নারী বিশ্বকাপ, ক্লাব বিশ্বকাপ এবং বিভিন্ন বয়সভিত্তিক বিশ্ব আসরের আয়োজক সংস্থাও ফিফা। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ সূচি নির্ধারণ, খেলোয়াড়দের জাতীয় দলে ছাড়ার নিয়ম, খেলোয়াড় স্থানান্তর, যোগ্যতা এবং শৃঙ্খলাবিষয়ক বৈশ্বিক নীতিমালাও নির্ধারণ করে ফিফা। এছাড়া ‘ফিফা ফরওয়ার্ড’ কর্মসূচির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে ফুটবল উন্নয়নের জন্য আর্থিক সহায়তাও দিয়ে থাকে সংস্থাটি।
তবে মহাদেশীয় কনফেডারেশনগুলো শুধু ফিফার আঞ্চলিক অফিস নয়। তারা নিজস্ব কংগ্রেস, নির্বাহী কমিটি, বাণিজ্যিক কার্যক্রম এবং প্রতিযোগিতা পরিচালনা করে। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, কোপা আমেরিকা, আফ্রিকা কাপ অব নেশনস, এশিয়ান কাপ, গোল্ড কাপ এবং ওশেনিয়া নেশনস কাপের মতো মহাদেশীয় জাতীয় দলের টুর্নামেন্টের পাশাপাশি ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতাগুলোরও আয়োজক তারাই।
সব কনফেডারেশনের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী হলো উয়েফা। সদস্যসংখ্যা মাত্র ৫৫টি হলেও বাণিজ্যিক দিক থেকে অন্য সব কনফেডারেশনকে অনেকটাই ছাড়িয়ে গেছে ইউরোপের এই সংস্থা। উয়েফার আয়োজনে অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ইউরোপা লিগ, কনফারেন্স লিগ এবং ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে লাভজনক প্রতিযোগিতাগুলোর মধ্যে রয়েছে। সম্প্রচারস্বত্ব, স্পন্সরশিপ এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব থেকে প্রতিবছর এসব প্রতিযোগিতা বিলিয়ন বিলিয়ন ইউরো আয় করে। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্লাব, শক্তিশালী লিগ, বড় সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান এবং শীর্ষ স্পন্সরদের অধিকাংশই ইউরোপভিত্তিক হওয়ায় উয়েফার অর্থনৈতিক শক্তিও অনেক বেশি।
এই অর্থনৈতিক সামর্থ্য শুধু প্রতিযোগিতা আয়োজনেই সীমাবদ্ধ নয়। উয়েফা পুরস্কার অর্থ, সংহতি তহবিল এবং উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে ইউরোপের ক্লাব, লিগ ও জাতীয় ফুটবল সংস্থাগুলোর মধ্যে বিপুল অর্থ বিতরণ করে। ফলে ইউরোপীয় ফুটবলের প্রতিটি স্তরেই উয়েফার প্রভাব গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা হলেও ফিফার অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে উয়েফার মতামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ, বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক ক্লাব ও জাতীয় দলের প্রতিযোগিতাগুলোর নিয়ন্ত্রণ উয়েফার হাতে। আন্তর্জাতিক ম্যাচ সূচি, নতুন প্রতিযোগিতা চালু কিংবা বাণিজ্যিক কাঠামো পরিবর্তনের মতো যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত ইউরোপীয় ফুটবলের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। ফলে এসব বিষয়ে উয়েফা প্রায়ই ফিফার সঙ্গে আলোচনায় কিংবা মতবিরোধে জড়িয়ে পড়ে।
তবে দুই সংস্থার সম্পর্ক মূলত পারস্পরিক নির্ভরশীলতার। ফিফার বিশ্বকাপ বা ক্লাব বিশ্বকাপের মতো আসরের সর্বোচ্চ বাণিজ্যিক সাফল্যের জন্য ইউরোপের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। অন্যদিকে উয়েফাও ফিফার নির্ধারিত বৈশ্বিক নিয়ম ও কাঠামোর মধ্যেই নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। তাই বিশ্ব ফুটবলে ফিফা ও উয়েফার মধ্যকার সম্পর্ক কখনো সহযোগিতার, কখনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার। আর সেই সূক্ষ্ম ক্ষমতার ভারসাম্যই আজকের বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা।