দুই কিংবদন্তি, দুই বিদায়: মেসির গল্পে পূর্ণতা, রোনালদোরটা অনিশ্চয়তায়

স্পোর্টস ডেস্ক

প্রায় দুই দশক ধরে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন লিওনেল মেসি ও ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো। কে সর্বকালের সেরা, কে ‘গোট’? দুজনের ক্যারিয়ার এতটাই পাশাপাশি এগিয়েছে যে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের সময়টাও যেন একই সময়ে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু শেষ অধ্যায়ে এসে দুই মহাতারকার গল্পটা আর এক পথে এগোচ্ছে না।

একজনের বিদায় হতে যাচ্ছে উৎসবের, অন্যজনের বিদায় ঘিরে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। মেসি আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষ ম্যাচ খেলতে যাচ্ছেন প্রায় ৮৫ হাজার দর্শকের সামনে। তাকে ঘিরে থাকছে আবেগঘন বিদায়ী আয়োজন। অন্যদিকে রোনালদো পর্তুগালের ক্যাম্প ছেড়ে বেরিয়ে গেছেন দলের একাদশে নিজের জায়গা নিয়ে তৈরি হওয়া বিরোধের পর। তার আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ এখনো ঝুলে আছে অনিশ্চয়তায়।

মঙ্গলবার বুয়েনস এইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্তালে বেনিনের বিপক্ষে শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার হয়ে মাঠে নামবেন ৩৯ বছর বয়সী মেসি। যে দেশ একসময় তার কাছে শুধু ট্রফি চাইত, সেই দেশকেই শেষ পর্যন্ত দুটি কোপা আমেরিকা, ২০২২ বিশ্বকাপ ও ফিনালিসিমা এনে দিয়ে বিদায় নিতে যাচ্ছেন তিনি।

আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল ও ৬৮ অ্যাসিস্ট নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে পৌঁছেছেন মেসি। জাতীয় দলের হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ এবং সবচেয়ে বেশি গোল, দুই রেকর্ডই তার দখলে।

রোনালদোর গল্পটা সেখানে অনেক বেশি অগোছালো। ৪১ বছর বয়সী এই তারকা নরওয়ের বিপক্ষে নেশন্স লিগের ম্যাচে বেঞ্চে ছিলেন। এরপর ডেনমার্কের বিপক্ষে শুরু থেকে খেলবেন না জানতে পেরে পর্তুগালের ক্যাম্প ছেড়ে চলে যান তিনি। পরে জানিয়েছেন, সময়মতো নিজের সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করবেন।

অবসর অবশ্য ঘোষণা করেননি রোনালদো। বরং কোচ জর্জ জেসুস পরিষ্কার করে দিয়েছেন, তিনি চাইলে আবারও জাতীয় দলে ফিরতে পারেন। অর্থাৎ ঘটনাটিকে এখনই তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে পর্তুগালের সামনে বড় প্রশ্নটা ইতিমধ্যেই উঠে গেছে, দেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় যখন আর নিশ্চিত একাদশের সদস্য নন, তখন তার ভূমিকা কী হবে?

জেসুসের অবস্থান পরিষ্কার। রোনালদোর নাম কিংবা অতীতের অর্জন একাদশ নির্ধারণ করবে না। নরওয়ের ম্যাচের আগে কোচ জানিয়েছিলেন, রোনালদোও মেনে নিয়েছেন, তিনি শুরু থেকে খেলবেন, নাকি পরে মাঠে নামবেন, সেটি দলের প্রয়োজন অনুযায়ী ঠিক করা হবে। ম্যাচের একপর্যায়ে রোনালদোকে নামানোর কথাও ভেবেছিলেন জেসুস। কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাকে মাঠে নামাননি।

কোচের দৃষ্টিকোণ থেকে সিদ্ধান্তটি তাই অযৌক্তিক নয়। কিন্তু রোনালদোর জায়গা থেকে দেখলে ছবিটা ভিন্ন। বছরের পর বছর নিজেকে দলের সর্বোচ্চ মানদণ্ডে রেখেছেন তিনি। পর্তুগালের সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনি, ইউরো ২০১৬-তে দেশের প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জয়ে ছিলেন অন্যতম প্রধান নায়ক। এত দীর্ঘ সময় দলের অবিসংবাদিত কেন্দ্রবিন্দু থাকার পর হঠাৎ নিশ্চিত একাদশের বাইরে চলে যাওয়া তার জন্য যে বড় পরিবর্তন, সেটি অস্বীকার করার উপায় নেই।

আর এখানেই মেসির সঙ্গে তুলনাটা সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

আর্জেন্টিনাকেও একসময় বুঝতে হয়েছিল, বয়সের সঙ্গে বদলাচ্ছেন তাদের মহাতারকা। কিন্তু কোচ লিওনেল স্কালোনি মেসির ভূমিকা এমনভাবে বদলেছেন, যাতে সেটিকে তার প্রতি অবমূল্যায়ন বলে মনে হয়নি। মেসিকে আর বার্সেলোনার সময়কার সেই খেলোয়াড় হয়ে থাকতে হয়নি। বরং তার যেসব সামর্থ্য তখনও অন্যদের চেয়ে আলাদা, আর্জেন্টিনা দলকে সেগুলোকে কেন্দ্র করেই গড়ে তোলা হয়েছে।

সঙ্গে সতীর্থরাও ধীরে ধীরে ভাগ করে নিয়েছেন সেই দায়িত্ব, যা বছরের পর বছর একাই বহন করতে হয়েছে মেসিকে।

ফলাফলও এসেছে অবিশ্বাস্যভাবে। ২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ কোপা আমেরিকা, মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ই হয়ে উঠেছে আর্জেন্টিনার সোনালি সময়।

তবে এর অর্থ এই নয় যে মেসির পথটা সবসময় মসৃণ ছিল। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে তাকে ঘিরে ছিল হতাশা ও সমালোচনা। কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপের ফাইনালে হার, এমনকি একপর্যায়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি। পরের সাফল্যগুলো তাই শুধু ট্রফির গল্প নয়; দীর্ঘ অপেক্ষা, ব্যর্থতা ও সমালোচনা পেরিয়ে পাওয়া এক পরিণতিও।

রোনালদোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতিটা কিছুটা ভিন্ন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্তুগালকে ঘিরে স্থির কোনো কাঠামো তৈরি হয়নি। ফার্নান্দো সান্তোস থেকে রবার্তো মার্তিনেজ, কোচরা দীর্ঘদিন রোনালদোর ওপর আস্থা রেখেছেন। কিন্তু তার কার্যকারিতা এবং দলের মধ্যে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নও ধীরে ধীরে বড় হয়েছে।

শেষ দুটি বিশ্বকাপেও পর্তুগাল সেমিফাইনালে উঠতে পারেনি। একই সময়ে রোনালদোর ভূমিকা হয়ে উঠেছে ক্রমেই জটিল।

জেসুস এখন সেই বাস্তবতাই পরীক্ষা করছেন, রোনালদোকে সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে না রেখেও পর্তুগাল কতটা এগোতে পারে।

তবে এর অর্থ রোনালদো শেষ হয়ে গেছেন, এমনটা বলারও সুযোগ নেই। বয়স ৪১ হলেও তার ফিটনেস এখনো বিস্ময় জাগায়, গোল করার সামর্থ্যও হারাননি। তিনি নভেম্বরে আবার ফিরতে পারেন এবং দলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাতেও থাকতে পারেন। সেক্ষেত্রে আজকের এই বিরোধ হয়তো ভবিষ্যতে তার ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ের একটি সাময়িক অস্বস্তিকর ঘটনা হিসেবেই থেকে যাবে।

আর যদি তিনি আর না ফেরেন, তাহলেও তার প্রাপ্য একটি যথাযথ বিদায়। পর্তুগালের ফুটবলে তার অবদান সেই সম্মান পাওয়ার মতোই।

মেসির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তার বর্তমান বিদায় যতটা সুন্দর ও আবেগঘন, সেখানে পৌঁছানোর পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না।

এ কারণেই দুই কিংবদন্তির শেষ অধ্যায়ের পার্থক্যটা এত আকর্ষণীয়।

মেসির বিদায় যেন একটি সম্পূর্ণ গল্পের শেষ অধ্যায়। আর্জেন্টিনা তার সঙ্গে বদলেছে, তাকে ছাড়াই এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতিও নিয়েছে, কিন্তু সেই পরিবর্তনের মধ্যেও মেসির মর্যাদা অক্ষুণ্ন থেকেছে।

রোনালদোর ক্ষেত্রে গল্পটা এখনো শেষ হয়নি। পর্তুগাল তাকে ছাড়িয়ে এগোনোর পথ খুঁজছে, আর রোনালদোকেও সেই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হচ্ছে। তিনি সেই পরিবর্তন নীরবে মেনে নেননি, পর্তুগালের ক্যাম্প ছেড়ে চলে যাওয়ার ঘটনাই সেটি স্পষ্ট করে দিয়েছে।

প্রায় দুই দশক ধরে প্রশ্ন ছিল, মেসি নাকি রোনালদো, কে সেরা?

ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে হয়তো সেই প্রশ্নের চেয়েও বড় আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে, একজন কিংবদন্তি যখন আর আগের মতো থাকেন না, তখন একটি দল কীভাবে তাকে বিদায় জানাবে?

আর্জেন্টিনা মেসির চারপাশে দলটাকে বদলে সেই উত্তর দিয়েছে। পর্তুগাল এখন রোনালদোর ভূমিকা বদলে সেই উত্তর খুঁজছে।

তাই মেসির বিদায় এখন সমাপ্তির গল্প, আর রোনালদোর বিদায় এখনো আলোচনার গল্প। প্রায় ২০ বছরের দুই কিংবদন্তির শেষ অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় পার্থক্য সম্ভবত এটাই।