আমেরিকার মাটিতেও মেসির জয়োধ্বনি
আটলান্টিকের ঢেউ পেরিয়ে যখন বিমানটি ধীরে ধীরে নামছিল মায়ামির আকাশে, তখন পৃথিবীর মহাকাব্যিক এক অধ্যায়ও যেন গতি পাচ্ছিল নতুন দিগন্তে। রোদচশমা চোখে, মুখে সহজ-নম্র হাসি, লিওনেল আন্দ্রেস মেসি তখন যেন তুচ্ছ করে দিচ্ছিলেন সব গল্প, সব পূর্বাভাস।
অনেকে ভেবেছিলেন, ইউরোপের ঝলমলে দিনগুলো পেছনে ফেলে মেসি যাচ্ছেন সাদামাটা জীবনের দিকে, ক্যারিয়ারের শেষ প্রহরে আমেরিকার মাটিতে একটু শান্তি খুঁজতে। কিন্তু মেসি কি কোনোদিনই শান্তি খুঁজেছেন? তিনি যে শান্তির সাধক নন, তিনি তো ঝড়ের সন্তান। যে ঝড় মাঠে নামে, আর প্রতিপক্ষের কাঠামো ভেঙে দেয় তার অনিবার্য জাদুতে।
আজ সেই ঝড়েরই নতুন উদযাপন। ইন্টার মায়ামির গোলাপি জার্সিতে এমএলএস কাপ উঁচিয়ে ধরে তিনি জানিয়ে দিলেন, চিরকালীন নায়করা বয়স দেখে দৌড়ায় না; তারা হৃদয়ের ইচ্ছায় চলে, আর সেই ইচ্ছা কখনো নিভে যায় না।
ফ্লোরিডার বাতাস আজ অন্যরকম। আতশবাজির রঙিন ঝলকানি থেকে শুরু করে জনতার কানফাটানো উল্লাস, সব কিছুর কেন্দ্রে একজনই মানুষ। লিওনেল মেসি। যখন তিনি মায়ামিতে প্রথম পা রাখেন, দলটি ছিল ভগ্ন আশা, ভেঙে পড়া আত্মবিশ্বাস আর অনিশ্চয়তায় ডুবে থাকা এক দল।
লিগ টেবিলের তলানিতে অবস্থান করে ইন্টার মায়ামি তখন শ্বাস নেওয়ারও শক্তি খুঁজে পাচ্ছিল না। কিন্তু একজন মানুষের যাদু কখনো কখনো ইতিহাস লিখে দেয়। তিনি এসে শুধু খেলা খেলেননি, তিনি দলকে শিখিয়েছেন আশা কী, বিশ্বাস কাকে বলে, এবং অসম্ভব শব্দটা কীভাবে শব্দকোষ থেকে মুছে দিতে হয়।
পরিবর্তনটা ছিল এতটাই নাটকীয়, এতটাই সিনেমাটিক, যেন হলিউডের কোনো পরিচালক এর চিত্রনাট্য লিখে দিয়েছেন। ধুঁকতে থাকা ইন্টার মায়ামিকে নিয়ে প্রথমে লিগস কাপ জেতানো, তারপর সাপোর্টার্স শিল্ড; আর এখন এমএলএস কাপ -এই ধারাবাহিক সাফল্য যেন আমেরিকার ফুটবলের বুকে খোদাই করে দিল একটি নতুন মিথ। যেখানে নায়ক এক ৩৯ বছর বয়সী আর্জেন্টাইন, যিনি বয়সকে কেবল সংখ্যায় পরিণত করেছেন।
ফুটবলের ইতিহাসে সর্বাধিক শিরোপা জয়ের রেকর্ডটি আগেই ছিল মেসির; দানি আলভেজকে ছাড়িয়ে তিনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন একাকী চূড়ায়। আজকের শিরোপাটি তার ক্যারিয়ারের ৪৮তম অর্জন। বার্সেলোনার হয়ে ৩৫টি, পিএসজির হয়ে ৩টি, আর্জেন্টিনার হয়ে ৬টি, আর ইন্টার মায়ামির হয়ে সম্প্রতি যোগ হয়েছে ৪টি ঝকঝকে শিরোপা। কিন্তু সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় কি একজন মানুষের মহত্ত্ব? এই সংখ্যা আসলে মেসির জীবনের গল্প -এক ছেলেকে নিয়ে, যে রোজারিওর ছোট রাস্তায় বল নিয়ে দৌড়াত এবং বিশ্বাস করত, পৃথিবীকে একদিন ফুটবলে মুগ্ধ করা যায়।
ফাইনালের রাতটিও ছিল পুরোনো এক সিম্ফনির নতুন রূপ। বল পায়ে তার প্রতিটি ছোঁয়া যেন বাতাসে তরঙ্গ তোলে। চেনা ড্রিবলিং, প্রখর গেম রিডিং, স্বচ্ছ পাস, আর সেই অতিপরিচিত স্থিরতা, সব মিলিয়ে তিনি যেন দেখিয়ে দিচ্ছিলেন, বয়স বাড়ে শরীরে, প্রতিভায় নয়। মায়ামির তিনটি গোলই এসেছে তার তৈরি মঞ্চ থেকে। জর্দি আলবা, সের্জিও বুসকেতস কিংবা রদ্রিগো দি পলরা পাশে থাকুক কিংবা না থাকুক, মেসি মাঠে থাকলে খেলার নায়ক একটাই হতে পারে।
আমেরিকার ফুটবল বরাবরই ছিল নিজের স্বকীয়তায় আলাদা, কিন্তু গত আড়াই বছর ধরে মেসি যেন তাকে নতুন অর্থ দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, জনপ্রিয়তার বৃত্ত কীভাবে পা বাড়িয়ে মহাদেশ পেরোতে পারে, যদি মাঝখানে নেতৃত্ব দেন একজন সত্যিকারের শিল্পী। এমএলএসকে তিনি শুধু বদলাননি, তিনি তাকে 'মেসি-যুগে' প্রবেশ করিয়েছেন।
তাহলে এত সাফল্যের পরও এই দৌড়ানো কেন? কেন তিনি থামেন না? হয়তো উত্তরটা খুঁজে পাওয়া যাবে তার চোখের গভীরে, ফুটবলের প্রতি অসীম ভালোবাসা। ফুটবল তার কাছে খেলা নয়, শিল্প; প্রতিযোগিতা নয়, পূর্ণতা খোঁজা; জয় নয়, নিজের সীমা ভাঙা। আজ যখন তিনি শিরোপা হাতে হাসছিলেন, সেই হাসিতে ছিল বাল্যকালের সেই নির্ভেজাল আনন্দ, যখন তিনি রোজারিওর ছোট্ট গলিতে বল নিয়ে দৌড়াতেন, আর পৃথিবী তখনো জানত না যে সেদিন একটি নতুন যুগ জন্ম নিচ্ছে।
আজকের দিনটি তাই শুধু একটি চ্যাম্পিয়নশিপ জয় নয়; এটি প্রমাণ -সময়ের স্রোত হলেও কিছু মানুষ নদীর মতো, তারা নিজের গতিপথ নিজেই তৈরি করে।
রাজত্বের দেশ বদলায়, পতাকার রং বদলায়, ক্লাবের চিহ্ন বদলায়, কিন্তু রাজা?
রাজা একজনই।
লিওনেল মেসি।
যিনি গোলাপি জার্সিকেও রূপ দিয়েছেন ইতিহাসের পাতায় অমলিন স্বাক্ষরে।