বিশ্বকাপের ৩৬ দিন বাকি

হিগুয়াইন: একটি গোল মিসের আড়ালে ঢাকা পড়া ক্যারিয়ার

সাব্বির হোসেন
সাব্বির হোসেন

ক্লাব ফুটবলে সব মিলিয়ে খেলেছেন ৭১০ ম্যাচ, গোলসংখ্যা ৩৩৫। আর আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর্জেন্টিনার সুপরিচিত আকাশি-সাদা জার্সিতে ৭৫ ম্যাচে ৩১ গোল। জাতীয় দলের পাশাপাশি রিয়াল মাদ্রিদ, নাপোলি, জুভেন্তাস, চেলসি ও এসি মিলানের মতো ইউরোপের পরাশক্তিদের হয়ে বছরের পর বছর মাঠ কাঁপিয়েছেন গঞ্জালো হিগুয়াইন।

পরিসংখ্যানের সঙ্গে ক্লাবের এই নামগুলো দেখলে যে কাউকে সর্বকালের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকারদের কাতারে বসাতে দ্বিতীয়বার ভাবতে হবে না। অন্তত ক্লাব ফুটবলে তার অর্জন নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ ক্ষীণ। উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ থেকে শুরু করে ইতালিয়ান সিরি আ, স্প্যানিশ লা লিগা— সবখানেই তার গোলের দাপট ছিল প্রশ্নাতীত। অথচ হিগুয়াইন ফুটবল বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পরিচিত এক বুকভাঙ্গা আক্ষেপের সমার্থক হিসেবে। আরও স্পষ্ট করে বললে আর্জেন্টিনার হয়ে কয়েকটি ভুলের জন্য— বিশেষ করে ২০১৪ সালে জার্মানির বিপক্ষে সেই অবিশ্বাস্য মিস!

বিশ্বকাপের ফাইনালে সেই লক্ষ্যভ্রষ্ট শটের পর লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনাকে তাদের কাঙ্ক্ষিত তৃতীয় বিশ্বকাপটি জিততে অপেক্ষা করতে হয় আরও আটটি বছর। হিগুয়াইনের মতো একজন অসাধারণ গোলমেশিনের গল্প কীভাবে কেবল 'মিস' দিয়ে সংজ্ঞায়িত হয়ে গেল, সেটাই আধুনিক ফুটবলের অন্যতম বড় এক ট্র্যাজেডি।

২০১৪ সালের ১৩ জুলাই, মঞ্চের নাম ব্রাজিলের রিও দি জানেইরোর মারাকানা স্টেডিয়াম। বিশ্বকাপ ফাইনালের মহারণে মুখোমুখি দুই পুরনো 'শত্রু' আর্জেন্টিনা ও জার্মানি।

ম্যাচের বয়স তখন মাত্র ২০ মিনিট। তুমুল স্নায়ুযুদ্ধ চলছে, কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জায়গাও ছাড়ছে না। ঠিক তখনই মাঝমাঠে অভিজ্ঞ জার্মান মিডফিল্ডার টনি ক্রুস করে বসেন মস্ত ভুল! কোনো কিছু না ভেবেই নিজেদের গোলরক্ষক মানুয়েল নয়্যারের দিকে বল হেড করে বসেন তিনি। তিনি খেয়ালই করেননি যে, তাদের ডিফেন্স লাইনের পেছনে ওৎ পেতে আছেন হিগুয়াইন।

বলটি দুইবার মাটিতে ড্রপ খায়, হিগুয়াইন পুরোপুরি ফাঁকায়! তার সামনে কেবল নয়্যার। একজন স্ট্রাইকারের জন্য এটি আক্ষরিক অর্থেই স্বপ্নের মতো এক পরিস্থিতি। বলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কিছুটা সময় হয়তো তিনি নিতে পারতেন কিংবা এগিয়ে গিয়ে হয়তো নয়্যারকে পরাস্ত করতে পারতেন। কিন্তু তিনি করলেন তাড়াহুড়ো। ডি-বক্সের ঠিক বাইরে থেকে হিগুয়াইন যে শটটি নেন, তা ছিল কল্পনাতীতভাবে বাজে।

বুটের সঙ্গে সংযোগ ঠিকমতো না হওয়ায় বল লক্ষ্যেই থাকেনি, পোস্টের অনেক বাইরে দিয়ে মাটি ঘেঁষে চলে চলে যায়। নয়্যারকে কোনো সেভ করার চেষ্টাও করতে হয়নি। হাঁপ ছেড়ে বাঁচে জার্মানি, মাঝমাঠে হা-হুতাশ করে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েন আর্জেন্টিনার তারকা মিডফিল্ডার হাভিয়ের মাশচেরানো। যে সুবর্ণ সুযোগটি হয়তো ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিতে পারতো, তা চোখের পলকে মিলিয়ে যায়।

ঠিক ১০ মিনিট পর ডানপ্রান্ত থেকে এজেকিয়েল লাভেজ্জির দারুণ ক্রস থেকে বল জালে জড়ান হিগুয়াইন। আগের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করে ফেলেছেন ভেবে বুনো উল্লাসে মেতে ওঠেন তিনি। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরই দেখেন লাইন্সম্যানের ফ্ল্যাগ তোলা— অফসাইড! অন্তত কিছুক্ষণের জন্য হলেও বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করার আনন্দ অনুভব করেছিলেন হিগুয়াইন। কিন্তু ঠিক তার পরপরই সব হারিয়ে ফেলার নিষ্ঠুর বাস্তবতাও উপলব্ধি করতে হয় তাকে। শেষ পর্যন্ত মারিও গোৎজের অতিরিক্ত সময়ের গোলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় জার্মানি।

ফুটবল বড্ড নিষ্ঠুর! অথচ ২০১৪ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে হিগুয়াইনের করা একমাত্র গোলেই আর্জেন্টিনা ২৪ বছর পর সেমিফাইনালে উঠেছিল। আর শিরোপার লড়াইয়ের আগে তৎকালীন কোচ আলেসান্দ্রো সাবেয়া তার অক্লান্ত পরিশ্রম এবং দলের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার দারুণ প্রশংসা করেছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, 'সে দলের জন্য চমৎকার ভূমিকা পালন করছেন। তার প্রতি আমাদের আস্থা কখনোই টলেনি।'

কিন্তু বেলজিয়ামের বিপক্ষে সেই গোল কেউ মনে রাখেনি। আর হিগুয়াইনের দুর্ভাগ্যও থেমে থাকেনি— যেন এক অভিশাপের মতো তাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে পরের দুটি বছরও।

ক্ষতে প্রলেপ দেওয়ার সুযোগ এসেছিল ২০১৫ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে, প্রতিপক্ষ চিলি। গোলশূন্য থাকা অবস্থায় নির্ধারিত সময়ের একদম শেষ মুহূর্তে লাভেজ্জির দুর্দান্ত ক্রস থেকে দূরের পোস্টে ফাঁকায় বল পান হিগুয়াইন। কিন্তু দুরূহ কোণ থেকে তার নেওয়া শটটি জালের বাইরের দিকে আঘাত হানে। ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানেও পেনাল্টি নিতে গিয়ে স্নায়ুর চাপ ধরে রাখতে পারেননি। বল ক্রসবারের অনেক ওপর দিয়ে উড়িয়ে মারেন তিনি।

পরের বছর ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকা সেন্টেনারিওর ফাইনালেও ঠিক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। আবারও প্রতিপক্ষ সেই চিলি। প্রথমার্ধে তাদের ডিফেন্ডার গ্যারি মেদেলের ভুলে বল পেয়ে যান হিগুয়াইন। ডি-বক্সের ভেতরে তখন কেবল গোলরক্ষক ক্লদিও ব্রাভো। কিন্তু ওয়ান-অন-ওয়ান পজিশনে থেকে ফের দুই বছর আগের দুঃসহ স্মৃতি ফিরিয়ে আনেন তিনি। ব্রাভোর গায়ের ওপর দিয়ে চিপ করে জালে জড়াতে চাইলেও বল চলে যায় গোলপোস্টের সামান্য বাইরে দিয়ে।

সেই বিশ্বকাপ ফাইনালের পর হিগুয়াইন পরিণত হন আর্জেন্টাইন ভক্ত-সমর্থকদের বড় একটি অংশের চক্ষুশূলে। টানা ব্যর্থতায় তার ওপর সমালোচনার জোয়ার এতটাই প্রবল ছিল যে, তিনি কিছু সময়ের জন্য জনসমক্ষে বের না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এমনকি এই ফুটবলার খেলা থেকে পুরোপুরি অবসর নেওয়ার কথাও গুরুত্ব সহকারে ভেবেছিলেন। তবে মায়ের কথায় আশ্বস্ত হয়ে মাঠে বিচরণ চালিয়ে যান।

২০১৯ সালের মার্চে যখন হিগুয়াইন আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের ঘোষণা দেন, তখন তার কণ্ঠে ছিল গভীর অভিমান। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, 'মানুষ আমার করা গোলগুলোর চেয়ে আমার মিস করা গোলগুলোই বেশি মনে রাখে। আমি নিশ্চিত, সবাই বেলজিয়ামের বিপক্ষের গোলটি উদযাপন করেছিল।'

আত্মপক্ষ সমর্থন করে যোগ করেছিলেন, 'এটা সত্যি যে, ওই টুর্নামেন্টগুলোতে জেতার যে লক্ষ্য আমাদের ছিল, তা আমরা অর্জন করতে পারিনি। কিন্তু আমরা কি ব্যর্থ হয়েছি? তিনটি ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছানো কোনোভাবেই ব্যর্থতা নয়।'

সমালোচনা কীভাবে তাকে ও তার পরিবারকে ক্ষতবিক্ষত করেছে, তা লুকাতে পারেননি হিগুয়াইন, 'যখন আপনি কাউকে নেতিবাচক উদ্দেশ্য নিয়ে সমালোচনা করেন, তখন সেটি সবাইকে আঘাত করে। আমি দেখেছি, আমার পরিবার কতটা কষ্ট পেয়েছে। অথচ আমি জাতীয় দলের জন্য আমার সবকিছু উজাড় করে দিয়েছিলাম। আমাদের লক্ষ্য অর্জিত হয়নি— এটা বলা এক বিষয়। কিন্তু মানুষ যখন একে ব্যর্থতা হিসেবে আখ্যা দেয়, তখন সেটি মেনে নেওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়ে।'

হিগুয়াইন তার প্রজন্মের অন্যতম সেরা গোলস্কোরার ছিলেন ঠিকই, কিন্তু বিশ্বকাপের পাতায় তার নাম লেখা থাকবে এমন একজন স্ট্রাইকার হিসেবে, যার পুরো ক্যারিয়ারকে আড়াল করে দিয়েছে ফাইনালের মঞ্চে করা সেই অভাবনীয় মিস।