৩৫ দিন বাকি

পেলের ডামি: চতুরতার নিখুঁত শিল্প

রামিন তালুকদার
রামিন তালুকদার

কেউ কেউ বলেন, সত্যিকারের জাদু দেখা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়। যে মুহূর্তে বুঝতে পারা যায় কিছু একটা ঘটে গেছে, ততক্ষণে সেটা অতীত হয়ে গেছে। হাত বাড়ালে ধরা যায় না, চোখ বন্ধ করলে দেখা যায় না। শুধু বুকের ভেতরে একটা অদ্ভুত শূন্যতা থেকে যায়, যেন কিছু একটার সাক্ষী হয়েও সেটার নাম অজানা।

মেক্সিকোর গুয়াদালাহারায় ১৯৭০ সালের সেই সন্ধ্যায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ সেই শূন্যতা অনুভব করেছিল। একসাথে। নিঃশব্দে।

জুন মাসের মেক্সিকো মানে আগুনের মতো রোদ, হালকা বাতাস, আর সেই উচ্চতায় শ্বাস নেওয়াটাই কষ্টের। জালিস্কো স্টেডিয়ামে সেমিফাইনাল ম্যাচ। একদিকে ব্রাজিল, সাম্বার দেশ, জিঙ্গার দেশ, ক্লদিনিয়ো-তোস্তাও-জাইরজিনিয়োর দেশ। অন্যদিকে উরুগুয়ে, যে দেশ ১৯৫০ সালে ব্রাজিলের বুকে ছুরি বসিয়েছিল মারাকানায়, যে পরাজয়ের কথা ব্রাজিলিয়ানরা আজও স্বপ্নে দেখে, ঘুম ভেঙে উঠে বসে।

দুই দলের মধ্যে সম্পর্কটা তাই শুধু ফুটবলের নয়। সেখানে আছে ইতিহাস, আছে পুরনো ক্ষত, আছে হিসেব-নিকেশের একটা অলিখিত খাতা।

সেই খাতায় সেদিন নতুন একটা পাতা যুক্ত হলো। তবে সেই পাতায় কোনো গোলের কথা লেখা নেই। লেখা আছে একটি মুহূর্তের কথা। যে মুহূর্তে সময় থেমে গিয়েছিল এবং পঞ্চাশ হাজার মানুষ একযোগে তাদের শ্বাস ভুলে গিয়েছিল।

ম্যাচের সত্তর মিনিট পেরিয়ে গেছে। ব্রাজিল এগিয়ে। কিন্তু উরুগুয়ে তখনও জীবিত। ক্লান্ত, রক্তাক্ত, কিন্তু জীবিত। দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলে উরুগুয়েকে মৃত ভাবাটাই সবচেয়ে বড় ভুল।

মাঠের এক প্রান্ত থেকে বল বেরিয়ে এল। দ্রুত, সরল, একটি পাস। যেভাবে হাজারবার আসে, হাজারবার আসার পরেও সেই পাসটাকে আলাদা করে মনে রাখা যায় না। কিন্তু এই পাসটা আলাদা হয়ে গেল, কারণ এটা গেল পেলের কাছে।

পেলে তখন তিরিশ বছর বয়সী। তার ক্যারিয়ারে তিনি ইতিমধ্যে এত কিছু করেছেন যে নতুন কিছু আর সম্ভব বলে মনে হয় না। কিন্তু পেলে সেই মানুষ, যিনি অসম্ভবকে নিয়মিত কাজ হিসেবে করেন, আর তারপর পরের কাজে চলে যান, ঘুরেও তাকান না।

বল পেলের পায়ে। তিনি ছুটলেন।

উরুগুয়ের গোলরক্ষক লাদিস্লাও মাজুরকিয়েউইচ। নামটা উচ্চারণ করতে কষ্ট হয়, কিন্তু ফুটবলের ইতিহাসে তার জায়গা পাকা। সেদিনের আগে পর্যন্ত তিনি ছিলেন একজন শক্তিশালী, চতুর, অভিজ্ঞ গোলরক্ষক, যাকে বোকা বানানো সহজ নয়।

পেলেকে দেখে তিনি এগিয়ে এলেন। এটাই নিয়ম, গোলরক্ষক যদি ঘরে বসে থাকেন, আক্রমণকারীর কোণ বেড়ে যায়, সুযোগ বেড়ে যায়। তাই এগিয়ে আসতে হয়, সুযোগ ছোট করতে হয়। মাজুরকিয়েউইচ সেটাই করলেন।

দুজন কাছে আসছেন। মাঝের দূরত্ব কমছে। স্টেডিয়ামের শব্দ যেন একটু কমে এল, অথবা হয়তো এটা সেই বিশেষ নীরবতা, যা বড় কিছু ঘটার ঠিক আগে নেমে আসে।

তারপর পেলে বাঁদিকে গেলেন।

অন্তত সেটাই মনে হলো।

মাজুরকিয়েউইচ ঝাঁপ দিলেন বাঁদিকে। পুরো শরীর, পুরো অভিজ্ঞতা, পুরো প্রতিভা, সব নিয়ে। কারণ বল সেদিকেই যাচ্ছিল। সে কথা তার চোখ বলছিল, তার মস্তিষ্ক বলছিল, তার হাত-পা-শরীর সব একসাথে বিশ্বাস করছিল।

কিন্তু বল সেদিকে যায়নি।

বল কোথাও যায়নি। বল রয়ে গেছে পেলের পায়ের কাছে। আর পেলে, অত্যন্ত শান্তভাবে, যেন একটি রোববারের সকালে পার্কে হাঁটছেন এমনভাবে, ডানদিক দিয়ে ঘুরে গেলেন।

মাজুরকিয়েউইচ মাটিতে। পেলে সামনে। গোল ফাঁকা।

স্টেডিয়াম তখনও বুঝছে কী ঘটল।

পেলে শট নিলেন। বল পোস্টের সামান্য বাইরে দিয়ে চলে গেল।

গোল হয়নি।

এবং এটাই সেই গল্পের সবচেয়ে বিস্ময়কর অধ্যায়। গোল না হওয়া সত্ত্বেও পৃথিবী থেমে গেল। কারণ মানুষ বুঝে গিয়েছিল, তারা সবে যা দেখল সেটা কোনো ফুটবলীয় কৌশল নয়। সেটা অন্য কিছু। অনেক বড় কিছু।

কী সেটা? তখন কেউ বলতে পারেনি। আজও হয়তো পুরোপুরি বলা যায় না।

ফুটবলে ডামি একটি পরিচিত কৌশল। পাঠ্যবইয়ে আছে, প্র্যাকটিস সেশনে শেখানো হয়, প্রতি মৌসুমে হাজার হাজারবার মাঠে ঘটে। কিন্তু পেলের সেই ডামি পাঠ্যবইয়ের সংজ্ঞায় আঁটে না।
কারণ পেলে সেদিন শুধু একজন গোলরক্ষককে বোকা বানাননি। তিনি একটি মানুষের বাস্তবতাকে মুহূর্তের জন্য বদলে দিয়েছিলেন। মাজুরকিয়েউইচ যা দেখেননি, যা ঘটেনি, যা কখনো ছিল না, সেটাকে সত্যি বলে বিশ্বাস করে ঝাঁপ দিয়েছিলেন।

এই ক্ষমতার নাম কী? কবিরা বলবেন সম্মোহন। দার্শনিকরা বলবেন উপলব্ধির কারসাজি। বিজ্ঞানীরা বলবেন মিরর নিউরনের বিভ্রম। কিন্তু জালিস্কো স্টেডিয়ামে সেদিন যারা ছিলেন, তারা জানেন, এসব শব্দে সেই মুহূর্তের গভীরতা ধরা যায় না।

পেলে সেদিন আসলে একটি গল্প বলেছিলেন। একটি কাল্পনিক গল্প, এক সেকেন্ডের, যেখানে বল বাঁদিকে যাচ্ছে। আর মাজুরকিয়েউইচ সেই গল্পে এতটাই মগ্ন হয়ে গেলেন যে, গল্পের ভেতরেই ঝাঁপ দিলেন।

সেই রাতে সাংবাদিকরা মাজুরকিয়েউইচের কাছে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছিল? কেন ঝাঁপ দিলেন?

গোলরক্ষক অনেকক্ষণ চুপ থাকলেন। তারপর বললেন, আমি জানি না। মনে হয়েছিল বল সেদিকে যাচ্ছে।

'মনে হয়েছিল।'

দুটো শব্দ। কিন্তু এই দুটো শব্দের ভেতরে লুকিয়ে আছে পেলের সেই মুহূর্তের আসল পরিচয়। পেলে বাস্তব পরিবর্তন করেননি। তিনি একজন মানুষের অনুভূতি পরিবর্তন করেছিলেন। আর অনুভূতি যখন বাস্তবের চেয়ে শক্তিশালী হয়, তখন শরীর অনুভূতির পেছনে যায়।

মাজুরকিয়েউইচের শরীর সেদিন তার চোখকে বিশ্বাস করেনি, বিশ্বাস করেছিল তার অনুভূতিকে। আর সেই অনুভূতি ছিল পেলের তৈরি।

ব্রাজিল সেই ম্যাচ জিতল ৩-১ গোলে। ফাইনালে ইতালিকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলো তৃতীয়বারের মতো। জুলে রিমে ট্রফি চিরতরে ব্রাজিলের হয়ে যায়। সোনার সেই ট্রফির ওজন কতটুকু ছিল জানা নেই, কিন্তু সেই বিশ্বকাপ জুড়ে ব্রাজিল যে ফুটবল খেলেছিল তার ওজন আজও কমেনি।

বল না ছুঁয়ে, গোল না করে, একটি ডামিতে, তিনি পঞ্চাশ হাজার মানুষের বুকে এমন একটি অনুভূতি ঢেলে দিয়েছিলেন, যা আজও সেখানে আছে। মৃদু, নিঃশব্দ, অমলিন।

জাদু এভাবেই কাজ করে।