সরকারের সঙ্গে বৈঠকের পরও অচলাবস্থা, চুয়েটের আন্দোলন গড়াল ১৫ দিনে
সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ১৫তম দিনে গড়িয়েছে। টানা এই আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম অচল হয়ে পড়েছে। ছয়টি বিভাগের বিভিন্ন বর্ষ ও সেমিস্টারের ফাইনাল পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রয়েছে।
গত শনিবার চুয়েটের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের তিন সংগঠনের প্রতিনিধিরা এ বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তবে আজ মঙ্গলবার পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
চুয়েট শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক সামিউন বসির দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমরা শনিবার সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে বৈঠক করেছি এবং অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের এক দফা দাবি মেনে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছি। তারা আমাদের কথা শুনেছেন এবং বিষয়টি বিচার-বিশ্লেষণ করে বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন।’
তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত শাটডাউন ও কর্মবিরতি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
অন্যদিকে, নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরিফুল আলম শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের কারণে ক্যাম্পাসে যেতে পারছেন না। তিনি ভার্চুয়ালি দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
এর আগে সোমবার শিক্ষকরা ক্যাম্পাসে মানববন্ধন করেন। এ ছাড়া, আজ বিকেল ৩টায় চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনের ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষার্থী আন্দোলনের কারণে সেশনজটের আশঙ্কার কথাও জানিয়েছেন।
অধ্যাপক সামিউন বসির বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের সেশনজট ও শিক্ষাজীবন দীর্ঘায়িত হওয়া নিয়ে আমরাও উদ্বিগ্ন। সে কারণেই আমরা চাই সরকার অবিলম্বে দাবি মেনে নিক।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ক্লাসে ফিরে যেতে চাই। যত দ্রুত সরকার আমাদের দাবি মেনে নেবে, তত দ্রুত এই অচল অবস্থার নিরসন হবে।’
গত ২৭ জুলাই উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন অধ্যাপক সায়েম। তবে মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা ছাড়াই তাকে অপসারণ করা হয়। পরে অন্য একটি প্রতিষ্ঠান থেকে নতুন উপাচার্য নিয়োগের ঘটনায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, চুয়েটের ভেতরে যোগ্য শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও বাইরে থেকে উপাচার্য নিয়োগ করা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘প্রতিষ্ঠান চালানোর মতো আমাদের অনেক মেধাবী ও যোগ্য শিক্ষক রয়েছেন। বাইরে থেকে উপাচার্য নিয়োগ করা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা ও ভাবমূর্তির পরিপন্থী।’
মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী আহনাফ শাহরিয়ার অর্ণব বলেন, ‘সরকার অধ্যাপক সায়েমকে চার বছরের জন্য নিয়োগ দিয়েছিল। আমরা চাই তিনি তার মেয়াদ পূর্ণ করুক।’
আন্দোলনকারীরা নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরিফুল আলমের আগের দায়িত্বের সময়ের নানা ঘটনার কথাও তুলে ধরেন।
চুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থী শেখ শরিফুল আলম এর আগে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) উপ-উপাচার্য ছিলেন। তার দায়িত্ব পালনের সময় ছাত্রসংগঠন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের জেরে সেখানে তিন মাস একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ ছিল বলে জানান শিক্ষার্থীরা।
পরে ছাত্র আন্দোলনের মুখে গত বছরের এপ্রিলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাকে এবং কুয়েটের তৎকালীন উপাচার্যকে অব্যাহতি দেয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্প্রতি উপ-উপাচার্য পদ থেকে অব্যাহতি পাওয়া কোনো ব্যক্তিকে আমরা আমাদের উপাচার্য হিসেবে মেনে নিতে পারি না।’
এর আগে গত ২১ সেপ্টেম্বর রাতে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে উপাচার্যের কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন। এরপর থেকে লাগাতার শাটডাউন চলছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
চুয়েটের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, সিভিল, মেকানিক্যাল এবং পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংসহ ছয়টি বিভাগের বিভিন্ন বর্ষ ও সেমিস্টারের ফাইনাল পরীক্ষা স্থগিত রয়েছে।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে থাকায় নতুন পরীক্ষার সময়সূচিও দেওয়া হয়নি। এতে শিক্ষার্থীদের স্নাতক শেষ করার সময় পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও নতুন প্রশাসনের মধ্যে উত্তেজনাও বাড়ছে। সম্প্রতি এক গণমাধ্যমে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সংখ্যা নিয়ে উপাচার্য অধ্যাপক শরিফুল আলমের মন্তব্যের পর আন্দোলনকারীরা তাকে প্রতীকী লাল কার্ড দেখান।
১৯৬৮ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত চুয়েট ২০০৩ সালে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেয়। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ৩৬১ জন শিক্ষক ও ৬ হাজার ৩৫৭ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন।


