বিস্ময়কর ৬ দ্বীপ: কোনোটিতে সাপের বাস, কোনোটি ঘুরছে
পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য দ্বীপ। কোনোটি স্বর্গীয় সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত, আবার কোনোটি পরিচিত রহস্য, অদ্ভুত প্রাণী কিংবা ভয়ংকর ইতিহাসের কারণে। ব্রাজিলের এমন একটি দ্বীপ আছে, যেখানে হাজার হাজার বিষধর সাপের বাস; স্কটল্যান্ডের আরেকটি দ্বীপ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জীবাণু অস্ত্র পরীক্ষার জন্য কুখ্যাত হয়েছিল। বাহামার একটি ছোট্ট নির্জন দ্বীপে নেমেই দেখা মেলে সাঁতার কাটা শূকরের, আর আর্জেন্টিনায় আছে এমন এক ভাসমান দ্বীপ, যেটি ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান বদলায়।
এখন জেনে নিন বিস্ময়কর ছয় দ্বীপ সম্পর্কে।
যে দ্বীপে কেবল সাপের বসবাস
ব্রাজিলের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৩৩ কিলোমিটার দূরে আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে অবস্থিত ইলহা দা কুইমাদা গ্রান্দে। প্রায় ৪৩ হেক্টর আয়তনের এই দ্বীপটি সারা বিশ্বে পরিচিত স্নেক আইল্যান্ড নামে। এর কারণ একটাই, এখানে হাজার হাজার বিষধর সাপের বসবাস।
দ্বীপটি নিয়ে বহুল প্রচলিত একটি দাবি হলো, এর প্রতি এক বর্গমিটারে একটি করে সাপ রয়েছে। এটি একটি বহুল উদ্ধৃত দাবি, তবে সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক হিসাব নয়। তবুও দ্বীপটির ভয়াবহ সাপের ঘনত্ব নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
নিরাপত্তার কারণে ব্রাজিল সরকার সেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে। কেবল গবেষক ও সামরিক বাহিনীর সদস্যরা বিশেষ অনুমতি নিয়ে সেখানে যেতে পারেন। ২০২৩ সালে ইউটিউবার লর্ড মাইলস কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই সেখানে পৌঁছেছিলেন। তিনি বিষধর সাপের কামড় থেকে বাঁচতে বডি আর্মার পরেছিলেন।
যুদ্ধের অন্ধকার স্মৃতি অ্যানথ্রাক্স আইল্যান্ড
স্কটল্যান্ডের দ্বীপগুলো সাধারণত পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়। কিন্তু গ্রুইনার্ড সেই তালিকার ব্যতিক্রম। একসময় জেলে ও কৃষকদের বসবাস ছিল এই দ্বীপে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এটি পরিণত হয় গোপন সামরিক পরীক্ষাগারে।
১৯৪২ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল নতুন ধরনের যুদ্ধাস্ত্র তৈরির উদ্যোগ নেন। সে সময় ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় স্কটল্যান্ডে এমন একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ খুঁজে নেয়, যেখানে জীবাণু অস্ত্র পরীক্ষা চালানো সম্ভব।
এরপর দ্বীপটি অধিগ্রহণ করা হয়, স্থানীয়দের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয় এবং পোর্টন ডাউনের জীবাণু অস্ত্র গবেষণাগারের বিজ্ঞানীরা সেখানে অ্যানথ্রাক্স ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে গোপন পরীক্ষা চালান।
এই ঘটনার পর বহু বছর গ্রুইনার্ড ‘আইল্যান্ড অব ডেথ’ বা মৃত্যুর দ্বীপ নামে পরিচিত ছিল।
অদ্ভুত পিগ আইল্যান্ড
বাহামার বিগ মেজর কে পৌঁছানোর সবচেয়ে সহজ উপায় নৌকা। দ্বীপটিতে মানুষের কোনো স্থায়ী বসতি নেই। কিন্তু নৌকা ভেড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই অদ্ভুত এক দৃশ্য চোখে পড়ে। ঝোপঝাড় থেকে দৌড়ে বেরিয়ে আসে কয়েক ডজন শূকর, তারপর সোজা সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাঁতরে নৌকার দিকে এগিয়ে আসে।
এই শূকরগুলো বন্য নয়; তারা ফেরাল অর্থাৎ একসময় গৃহপালিত ছিল। পরে বুনো পরিবেশে বসবাস শুরু করেছে।
তারা কীভাবে এখানে এল, তার নির্ভরযোগ্য উত্তর নেই। একটি প্রচলিত ধারণা হলো, বহু বছর আগে নাবিকেরা শূকরগুলো এখানে রেখে গিয়েছিল, পরে আর ফিরে আসেনি। আরেকটি মতে, কোনো জাহাজডুবির পর বেঁচে যাওয়া শূকরগুলোর বংশধর এরা।
ঘুরতে থাকা রহস্যময় দ্বীপ এল ওহো
আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আইরেসের উত্তরে পারানা বদ্বীপের জলাভূমিতে অবস্থিত এক বিস্ময়কর দ্বীপ হলো এল ওহো। স্প্যানিশ ভাষার শব্দটির অর্থ ‘চোখ’।
দ্বীপটির সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো এটি ভাসমান। শুধু তাই নয়, এটি প্রায় বৃত্তাকার এবং একটি বৃত্তাকার হ্রদের মধ্যে অবস্থান করে। সময়ের সঙ্গে এটি ধীরে ধীরে ঘোরে এবং নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে।
আকাশ থেকে দেখলে পুরো দৃশ্যটি একটি বিশাল চোখের মতো মনে হয়। এ কারণেই এর নাম রাখা হয়েছে ‘এল ওহো’ বা ‘চোখ’।
বিচ্ছিন্ন প্রাণবৈচিত্র্যের দ্বীপ মাদাগাস্কার
আফ্রিকার পূর্ব উপকূল থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরে ভারত মহাসাগরে অবস্থিত মাদাগাস্কার পৃথিবীর অন্যতম বৈচিত্র্যময় বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। দীর্ঘ সময় ধরে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে এখানে এমন অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর বিকাশ ঘটেছে, যাদের পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না।
এই দ্বীপের সবচেয়ে পরিচিত প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে অদ্ভুত চেহারার আয়-আয়, বিভিন্ন প্রজাতির লেমুর ও শিকারি স্তন্যপায়ী ফোসা। এদের অনেককেই বিশ্বের সবচেয়ে বিচিত্র প্রাণীদের তালিকায় রাখা হয়।
মাদাগাস্কার ও আফ্রিকার পূর্ব উপকূলের মাঝখানের সমুদ্রপথটির নাম মোজাম্বিক চ্যানেল। এই প্রাকৃতিক বিচ্ছিন্নতাই লাখো বছর ধরে দ্বীপটির অনন্য জীববৈচিত্র্য গড়ে উঠতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
যেন অন্য গ্রহের ভূখণ্ড সোকোত্রা
ইয়েমেন ও আফ্রিকার শিং অঞ্চলের উপকূলের কাছে অবস্থিত সোকোত্রা পৃথিবীর সবচেয়ে বিচিত্র দ্বীপগুলোর একটি। এখানে বৃষ্টিপাত কম হয় এবং পরিবেশ বেশ শুষ্ক। তবু এই কঠিন পরিবেশেই গড়ে উঠেছে অসাধারণ জীববৈচিত্র্য।
দ্বীপটির সবচেয়ে বিখ্যাত উদ্ভিদ ড্রাগনস ব্লাড ট্রি। এই গাছটির ছাতার মতো আকৃতি পৃথিবীর আর কোথাও খুব কমই দেখা যায়। এছাড়া এখানে রয়েছে বহু স্থানিক সরীসৃপ। স্থানিক সরীসৃপ বলতে বোঝায় এমন সরীসৃপকে বোঝায় যেগুলো পৃথিবীর নির্দিষ্ট একটি অঞ্চল বা স্থানে পাওয়া যায় এবং অন্য কোথাও স্বাভাবিকভাবে বাস করে না।
অসাধারণ জীববৈচিত্র্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৮ সালে ইউনেসকো সোকোত্রাকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে।
সূত্র: ডিসকভার ওয়াল্ডলাইফ