বানরও জ্যামিতি বোঝে, বলছে গবেষণা
ধরে নিলাম, একটি জঙ্গলের পথে হাঁটছি। হঠাৎ রাস্তা দুটি দিকে ভাগ হয়ে গেল। সামনে দুটি ত্রিভুজের মতো চিহ্ন। একটি ডান দিকে, আরেকটি বাঁ দিক নির্দেশ করছে।
এটা দেখে আমরা নিশ্চয়ই বুঝব, দুটোর দিক আলাদা হলেও আসলে তারা একই আকৃতির ত্রিভুজ। শুধু ঘুরিয়ে রাখা হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন সেখানে নয়। প্রশ্ন হলো, আমাদের মতো বানরও কি এটা বুঝতে পারে?
অবিশ্বাস্য হলেও বিজ্ঞানীরা বলছেন, হ্যাঁ, বানরও আমাদের মতো টুকটাক জ্যামিতি বুঝতে পারে!
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক এমন একটি গবেষণা করেছেন, যা শুনলে যে কেউ অবাক হবে। তারা জানতে চেয়েছিলেন, মানুষ ও অন্য প্রাইমেট, যেমন বানর ও বাবুন জ্যামিতিক আকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে কতটা আলাদা।
গবেষণার নেতৃত্ব দেন বিশ্ববিদ্যালয়টির ডেভেলপমেন্টাল নিউরোসায়েন্টিস্ট জেসিকা ক্যান্টলন ও তার সহকর্মীরা। এই গবেষণাটি প্রকাশ করেছে গবেষণা সাময়িকী ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস (পিএনএনএস)।
গবেষণায় অংশ নিয়েছিল দুটি ভিন্ন জাতের আটটি পূর্ণবয়স্ক বানর। পাশাপাশি অংশ নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ৩ থেকে ৬ বছর বয়সী ৫৫ জন শিশু এবং দক্ষিণ আমেরিকার বলিভিয়ার ৭৭ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ, যাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা একেবারেই ছিল না।
গবেষকরা সবাইকে একটি মজার খেলা খেলতে দেন।
একটি টাচস্ক্রিনে অনেক রকম জ্যামিতিক আকৃতি দেখানো হয়। সেখানে ত্রিভুজ, আয়তক্ষেত্র, বর্গক্ষেত্রসহ নানা আকৃতি এলোমেলোভাবে সাজানো ছিল। তাদের কাজ ছিল, একই ধরনের দুটি আকৃতি খুঁজে বের করা।
মজার বিষয় হলো, দুটি আকৃতির আকার এক রকম নাও হতে পারে। একটি বড়, অন্যটি ছোট হতে পারে। আবার একটি সোজা থাকলেও অন্যটি ঘুরিয়ে রাখা হতে পারে।
তারপরও যদি তারা বুঝতে পারে, ‘আরে! দুটিই তো একই আকৃতি!’ তাহলেই মিলবে পুরস্কার।
কেউ আগে থেকে বিশেষ কোনো নিয়ম শেখেনি। সবাইকে বলা হয়েছিল, চেষ্টা করতে করতে নিজেরাই নিয়ম বুঝে নিতে। যখন সঠিক উত্তর পাওয়া যেত, তখন একটি ছোট্ট একটি ‘বিং’ শব্দ শোনা যেত।
তারপর?
শিশুরা পেত রঙিন স্টিকার। আর বানরদের জন্য থাকত ছোট্ট দানাজাতীয় খাবার।
গবেষণার সবচেয়ে চমকপ্রদ ফল ছিল, ছোট শিশুরা যেভাবে আকৃতি চিনতে চেষ্টা করেছে, বানররাও প্রায় একইভাবে করেছে। অর্থাৎ, স্কুলে জ্যামিতি শেখার আগের শিশু ও বানরের চিন্তার মধ্যে আশ্চর্য মিল পেয়েছেন গবেষকরা।
কেন এমন হয়?
বিজ্ঞানীরা বলছেন, ছোট শিশু ও বানর মূলত চোখে দেখে এবং অভিজ্ঞতার সাহায্যে আকৃতি চিনে। তারা বুঝতে পারে, দুটি আকৃতি দেখতে ভিন্ন হলেও আসলে একই।
অন্যদিকে বড়রা শুধু চোখে দেখে না। তারা অজান্তেই নানা নিয়ম ব্যবহার করে। যেমন—দুই পাশ সমান কি না, কোনাগুলোর পরিমাপ কত, রেখাগুলো সমান্তরাল কি না, আকৃতিটি প্রতিসম কি না।
এসব বিষয় মাথায় রেখে বড়রা খুব দ্রুত বুঝে ফেলে কোন দুটি আকৃতি একই।
গবেষকদের মতে, এই বাড়তি দক্ষতার বড় একটি কারণ হলো বিদ্যালয়ের শিক্ষা।
অর্থাৎ, মানুষ জন্মগতভাবে কিছু জ্যামিতিক ধারণা নিয়ে পৃথিবীতে আসে। পরে পড়ালেখা সেই ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
ভাবতে অবাক লাগলেও হয়তো একটি ছোট্ট বানর যদি স্কুলে গিয়ে জ্যামিতি পড়তে পারত, তাহলে হয়তো সেও আরও কঠিন আকৃতি সহজেই চিনে ফেলতে পারত!
এই গবেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সামনে এনেছে। সেটি হলো, আমরা মানুষ বলে সবকিছু একেবারে নতুন করে শিখি না। প্রকৃতি আমাদের মস্তিষ্কে অনেক ক্ষমতার বীজ আগেই দিয়ে রেখেছে। প্রাণীদের মধ্যেও সেই বীজের অনেকটাই আছে। মূলত বিদ্যালয়, শিক্ষক, বই ও অনুশীলন সেই বীজকে বড় গাছে পরিণত করে।
তাই জ্যামিতি কেবল বইয়ের একটি বিষয় নয়। এটি পৃথিবীকে নতুন চোখে দেখার এক দারুণ উপায়।
হয়তো পরেরবার তুমি কোনো ত্রিভুজ, বৃত্ত বা আয়তক্ষেত্র দেখলে মনে হবে, ‘এই আকৃতিটা আমি যেমন বুঝতে পারছি, হয়তো কোনো বুদ্ধিমান বানরও ঠিক সেভাবেই বুঝতে পারছে!’ৎ
বিজ্ঞানীদের এই গবেষণা আমাদের জানিয়ে দেয়, মানুষ ও অন্য প্রাইমেটদের মধ্যে পার্থক্য যতটা ভাবি, ততটা হয়তো নয়। শেখার সুযোগ, শিক্ষা ও চর্চাই আমাদের অনেক দূর এগিয়ে দেয়। আর এ কারণেই প্রতিদিন নতুন কিছু শেখা এত আনন্দের, এত গুরুত্বপূর্ণ।



